শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারকাজ অধস্তন বিচারিক আদালতে চার কার্যদিবস শুনানি শেষে রায় হয়েছে। উচ্চ আদালতেও (হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ) এ মামলার বিচারকাজ দ্রুত নিষ্পত্তি হতে পারে গতকাল রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ও রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের বক্তব্যে এমন আভাস পাওয়া গেছে। তারা এ মামলার বিচারকাজ অধস্তন আদালতের মতো উচ্চ আদালতেও দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বিচারিক আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদ-ের রায় হলে সেটি অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদ- অনুমোদন) শুনানি হতে হয়। আসামিরাও আপিল কিংবা জেল আপিলের সুযোগ পান। হাইকোর্টে দ- বহাল থাকলে আপিল বিভাগে আপিল করতে পারে আসামিপক্ষ। সেখানে মৃত্যুদ-ের সাজা বহাল থাকলে রায় রিভিউয়ের (রায় পুনর্বিবেচনা) সুযোগ পান আসামি। রিভিউতে সাজা বহাল থাকলে শেষ সুযোগ হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে দোষ স্বীকার করে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারে আসামি। প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হলে কারা কর্তৃপক্ষ কারাবিধি অনুযায়ী ফাঁসি কার্যকর করে থাকে।
গতকাল সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইনমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আইনি সব প্রক্রিয়া (ডেথ রেফারেন্স ও আপিল) শেষে আগামী তিন মাসের মধ্যে আসামিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা সম্ভব হবে।’ তিনি বলেন, ‘রামিসাকে আমরা বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারব না, কিন্তু যতটুকু করা যায় সেটুকু করেছি। আইনি সব প্রক্রিয়া মেনেই দ্রুত বিচার করতে সক্ষম হয়েছি। আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী ৭ দিনের মধ্যে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে যাবে। সেখানে পেপারবুক (মামলার রায়সহ যাবতীয় নথি) তৈরি ও শুনানির বিষয় রয়েছে। হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ যদি অগ্রাধিকার দিয়ে এ মামলার শুনানি করে, তবে আমার আশা আগামী তিন মাসের মধ্যে রায় কার্যকর করা সম্ভব।’
সিলেটে শিশু রাজন, খুলনার রাকিব ও মাগুরার আছিয়া হত্যার রায় উচ্চ আদালতে দীর্ঘ দিন আটকে থাকার বিষয়ে এক প্রশ্নে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিষয়টি হতাশার এবং আপনাদের প্রশ্নটি যৌক্তিক। আমি অ্যাটর্নি জেনারেল থাকাকালে মেজর সিনহা (কক্সবাজারে নিহত) ও বুয়েটের আবরার হত্যা মামলা বিশেষ আদেশে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়েছিলাম। এখন রামিসার পাশাপাশি আটকে থাকা অন্য মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা হয়েছে। এ বিষয়ে সলিসিটর উইং এবং অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস যৌথভাবে উদ্যোগ নেবে।’
ফাঁসির রায় দ্রুত কার্যকর না হওয়াই সমাজে অপরাধ বাড়ার একমাত্র কারণ নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘অপরাধীরা মানসিকভাবে অসুস্থ। আসামি সোহেল রানা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দেওয়ার পরও বিচারকাজ বিলম্বিত করতে মামলার রেকর্ডে নেই এমন একজনের নাম (ডলার) টেনে এনেছে। শুধু আইন দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, সমাজব্যবস্থা থেকে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ দূর করতে সামাজিক সচেতনতা ও সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’
অন্যদিকে বিচারিক আদালতের নথি পাওয়ার পর হাইকোর্টে দ্রুততম সময়ে শিশু রামিসা হত্যা মামলার শুনানির ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবেন বলে সাংবাদিকদের জানান অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। রামিসা হত্যা মামলার রায়ের পর তিনি তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘রেকর্ড (মামলার যাবতীয় নথি) প্রাপ্তির পরে দ্রুততম সময়ে আমরা মামলাটির শুনানির ব্যবস্থা করব। সেক্ষেত্রে পেপারবুক করতে হবে। প্রধান বিচারপতির অনুমোদন শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করার পর দ্রুত আপিল নিষ্পত্তির চেষ্টা করব।’
এদিকে গতকাল জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া দেওয়া বিবৃতিতে আইনমন্ত্রী বলেছেন, রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকা-ের ঘটনায় মাত্র কয়েক কার্যদিবসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করে দেশের বিচার ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনার পর যেখানে ভিক্টিমের পরিবার বিচার পাওয়া নিয়ে চরম সংশয় প্রকাশ করে বলেছিল যে তারা বিচার চায় না, সেখানে সরকারের বিশেষ তৎপরতা, পুলিশের দ্রুততম তদন্ত এবং আদালতের ছুটি বাতিলের অভূতপূর্ব সমন্বয়ে এই দৃষ্টান্তমূলক রায় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ১ জুন থেকে নিম্ন আদালতগুলোর ১৫ দিনের গ্রীষ্মকালীন ছুটি। তবে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালকে সচল রাখতে সরকারের অনুরোধে প্রধান বিচারপতি এই ট্রাইবুনালগুলোকে ছুটির আওতাবহির্ভূত রাখার সিদ্ধান্ত নেন। মামলার নিরপেক্ষতা নিশ্চিতে এবং আসামি পক্ষ যাতে বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে, সেজন্য রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ২৪ মে আসামিদের জন্য ‘স্টেট ডিফেন্স ল ইয়ার’ বা সরকারি আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর ঈদের ছুটি শেষে ১ জুন আদালত খোলার দিনই মামলার অভিযোগ গঠন, পরদিন দ্রুততার সঙ্গে ১৬ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করা এবং পরবর্তী দুই দিনে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয়। শুক্র ও শনিবার আদালত বন্ধ থাকার পর ৭ জুন মাত্র ৪১ মিনিটের রায় পর্যালোচনা ও আদেশ পাঠের মধ্য দিয়ে আদালত মূল আসামি সোহেল এবং তার সহযোগিতাকারী স্ত্রীকে মৃত্যুদ-ের আদেশ দেয়। এই যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে রামিসার পরিবারের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে রামিসা হত্যাকা- ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া অন্য গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ তদারকি অব্যাহত রয়েছে।
