সীমান্তের বিভিন্ন স্থান দিয়ে ‘বাংলায় কথা বলে’ এমন কিছু মানুষকে বাংলাদেশে জোর করে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে ভারত। দেশটির সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) মাধ্যমে তারা এ চেষ্টা করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পুশইন প্রতিহত করে চলেছে।
বাংলাদেশ সরকার মনে করে, পুশইন সমস্যাটি প্রাথমিকভাবে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা উচিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল রবিবার রাজধানীর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা জানান।
পুশইন বিষয়ে সরকার কূটনৈতিক চ্যানেলে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, এমনটি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার সব ধরনের অবৈধ পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করতে প্রস্তুত। তবে এসব সমস্যা প্রাথমিকভাবে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা উচিত।’
তিনি বলেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ চলমান আছে। দুই সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর (বিজিবি ও বিএসএফ) মহাপরিচালক পর্যায়ে যে বৈঠক শুরু হচ্ছে, সেখানে সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ পুশইন ও সীমান্ত হত্যাসহ সব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সীমান্তে বিজিবি অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
আজ সোমবার থেকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে চার দিনব্যাপী এ বৈঠক শুরু হচ্ছে। বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের এমন বৈঠক বছরে দুবার নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়। একবার বাংলাদেশে হলে পরেরবার ভারতে অনুষ্ঠিত হয়। এবারের আয়োজক ভারত। কারণ এর আগের বৈঠক বাংলাদেশে বিডিআর সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশের তিন দিকে ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দিল্লিতে সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশে ২ হাজার ৮৬০ জনের নাগরিকত্ব যাচাই করতে অনুরোধ করা হয়েছে। তাদের ফেরত পাঠাতে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলা থেকে দেশ রূপান্তর প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, বিজিবি ভারতের সঙ্গে সীমান্তের প্রায় সর্বত্র নজরদারি বাড়িয়েছে; সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে গ্রামপুলিশ সদস্য ও স্থানীয় গ্রামবাসীকে নজরদারিতে সম্পৃক্ত করেছে। অনেক স্থানে বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে লাঠি হাতে রাতভর পাহারায় রয়েছেন স্থানীয় গ্রামবাসী।
হাকিমপুর (দিনাজপুর) : হিলির ঘাসুড়িয়া সীমান্তে গতকাল রবিবার ভোরে পাঁচ ভারতীয় নাগরিককে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। বিজিবি পুশইনের এ চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে। এ সময় বিজিবি টহল ও নজরদারি জোরদার করেছে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন গ্রামপুলিশ সদস্যরা। স্থানীয়রাও লাঠি হাতে রাত জেগে পাহারায় বসেছেন। এতে স্বস্তি ফেরেছে সীমান্তে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের মাঝে।
জয়পুরহাট ২০ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল লতিফুল বারী জানান, ভিডিপি, আনসার ও রিজার্ভড আনসার সদস্যদের নিয়ে দল গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামের মানুষকেও সঙ্গে রাখা হয়েছে। সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত রয়েছে।
গ্রামপুলিশ সদস্য নবিনুর ইসলাম বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সীমান্ত এলাকায় পুশইন প্রতিরোধে আমরা বিজিবির সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছি। ভারত থেকে অবৈধভাবে যে কাউকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর বিষয়ে আমরা সতর্ক।’
মেহেরপুর : গাংনীর তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্তে অবৈধভাবে ঠেলে দেওয়ার জন্য ছয় ব্যক্তিকে বিএসএফ শনিবার নিয়ে এসেছিল। বাহিনীটি শেষ পর্যন্ত তাদের শূন্যরেখা থেকে সরিয়ে নিয়েছে। বিজিবি ও গ্রামবাসীর প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ এ পদক্ষেপ নিয়েছে বলে বিজিবি মনে করে।
তেঁতুলবাড়িয়া বিজিবি ক্যাম্পের কমান্ডার সুবেদার হাবিবুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মেহেরপুরের ৮৬ কিলোমিটার সীমান্তে বিজিবির সঙ্গে সীমান্তবাসীও লাঠিসোটা নিয়ে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন।
জামালপুর : পুশইন ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে জামালপুরে বিজিবি স্থানীয় জনসাধারণের সহযোগিতা নিচ্ছে। জামালপুর ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল হাসানুর রহমান এ কথা জানান। মাইকিং করে স্থানীয়দের শূন্যরেখায় প্রবেশ না করতে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ : বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় টহলের পাশাপাশি স্থানীয় জনসাধারণকে সতর্ক ও সচেতন করতে মাইকিং করছে বিজিবি। সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের তথ্য অনুযায়ী, তাদের আওতাধীন ৯০ কিলোমিটার সীমান্তের ৬টি স্থানে কাঁটাতারের বেড়া নেই। এ কারণে এলাকাগুলো তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এসব অরক্ষিত পয়েন্টে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল এ কে এম জাকারিয়া কাদির।
ঠাকুরগাঁও : মশালগাঁও সীমান্ত দিয়ে পুশইনের জন্য আনা ১১ নারী, পুরুষ ও শিশুকে বিএসএফ টানা প্রায় ৪০ ঘণ্টা সীমান্তে শূন্যরেখার কাছে খোলা আকাশের নিচে অপেক্ষায় রেখেছে। তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ, চারজন নারী ও চারজন শিশু। প্রচ- রোদ, বৃষ্টি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে তারা। স্থানীয়রা জানান, মানবিক কারণে আশপাশের গ্রাম থেকে শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়া হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল।
বিজিবির সঙ্গে দুই দফা পতাকা বৈঠকেও এ সমস্যাটির সমাধান হয়নি।
৪২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ আল মঈন হাসান বলেন, আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী যথাযথ প্রমাণসহ বাংলাদেশের নাগরিকদের হস্তান্তর করা হলে বিজিবি তাদের গ্রহণ করবে। এর বাইরে অবৈধভাবে পুশইন করা কাউকে গ্রহণ করা হবে না।
অস্ত্র দেখিয়ে বাংলাদেশে ঢোকাচ্ছে বিএসএফ : পশ্চিমবঙ্গের প্রধান এক মানবাধিকার সংগঠন অভিযোগ করেছে যে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশি সন্দেহে বহু মানুষকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। গতকাল রবিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমন দাবি করেছে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব ডেমোক্র্যাটিক রাইটস (এপিডিআর)।
এই ঘটনার জেরে এপিডিআর ১১ জুন পশ্চিমবঙ্গের মালদা শহরে একটি প্রতিবাদ মিছিল আহ্বান করে বলে সংগঠনের সহসভাপতি রঞ্জিত শূর জানিয়েছেন। তারা ‘নো ম্যানস ল্যান্ড বা জিরো পয়েন্টে বিএসএফের ফেলে আসা সব মানুষকে অবিলম্বে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান।’
