সিপিডির সেমিনার

অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা লাগে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বরাদ্দ

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৬, ০৩:২৭ এএম

দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে স্বল্প বরাদ্দ ও উচ্চ শুল্কের সমালোচনা করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি জানায়, জীবাশ্ম জ্বালানির জন্য এ খাতের পাঁচ ভাগের চার ভাগ বরাদ্দ রাখা হয়। সে তুলনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যে বরাদ্দ রাখা হয়, তা অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে হচ্ছে। গতকাল রবিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে রাজস্ব বৈষম্য : জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প সমাধান’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধে এ কথা বলা হয়। প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন সংস্থার গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সিনিয়র গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তি, আতিকুজ্জামান সাজিদসহ অনেকে।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, প্রস্তাবিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে মাত্র তিনটি প্রকল্পের জন্য ৭৯৫ দশমিক ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে গ্রিড আধুনিকায়নের ছয়টি প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২২৮ দশমিক ২ কোটি টাকা এবং স্মার্ট মিটারিং সংক্রান্ত পাঁচটি প্রকল্পে ৫৭৪ দশমিক ৩ কোটি টাকা।

তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭৯ শতাংশ ফসিল ফুয়েল (জীবাশ্ম জ্বালানি), নবায়ন যোগ্য জ্বালানির সাড়ে পাঁচ শতাংশ, গ্রিড ১৩ শতাংশ এবং স্মাট মিটারের জন্য ৩ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ফলে বাজেটে বরাদ্দের ক্ষেত্রে বৈষম্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে স্বল্প বরাদ্দ প্রসঙ্গে সিপিডির তথ্যচিত্র দেখিয়ে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এই গ্রাফটিতে ২০১৬ থেকে ২০২৬-এ জ্বালানি খাতে  বরাদ্দের একটি সামারি আমরা তুলে ধরেছি। এটি একেবারেই একপেশে দেখা যাচ্ছে। গ্রাফটিতে অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য কী পরিমাণ বরাদ্দ রয়েছে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বের অনেক দেশ সবুজমুখী রাজস্ব নীতি গ্রহণ করলেও বাংলাদেশ এখনো এমন একটি কাঠামো অনুসরণ করছে, যা জীবাশ্ম জ্বালানিকে তুলনামূলক সুবিধা দিচ্ছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর প্রভাব জ্বালানি মিশ্রণ, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং পরিবহন খাতে জ্বালানি ব্যবহারের ওপরও পড়ছে।

তিনি জানান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ৫০টি পণ্য ও প্রযুক্তির ওপর পরিচালিত সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অধিকাংশ পণ্যের ওপর মোট করের হার ২৭ থেকে ২৮ শতাংশ। ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এ হার ৬২ থেকে ৯৩ শতাংশ এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি, মোটরসাইকেল ও তিন চাকার যানবাহনের ক্ষেত্রে ৬১ থেকে ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিকায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ট্রান্সফরমার, কন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন সরঞ্জামের ওপরও উচ্চ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিপরীতে, এলএনজির মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর মোট শুল্ক মাত্র ৯ দশমিক ৫ শতাংশ, যা এ ধরনের জ্বালানিকে তুলনামূলকভাবে সস্তা রাখছে।

সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন বাজেটের ৯৫ শতাংশের বেশি দীর্ঘদিন ধরে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে। অন্যদিকে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পগুলো পেয়েছে ৫ শতাংশেরও কম বরাদ্দ।

সেমিনারে সংস্থাটি জানায়, বিদ্যমান রাজস্ব বৈষম্য ইউটিলিটি পর্যায়ের নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, কৃষিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এর ফলে জ্বালানি খাতের কাক্সিক্ষত রূপান্তর বিলম্বিত হচ্ছে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর কর ও শুল্ক কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিদ্যমান প্রণোদনা ও সুবিধা পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করেছে সিপিডি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত