প্রতিশ্রুতি-অঙ্গীকারের বাজেট

বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৫৩ এএম

১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট  উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দেশের পরিবর্তিত ও বৈশি^ক টালমাটাল পরিস্থিতিতে উপস্থাপিত বাজেটে যে অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত হয়েছে এর বাস্তবায়নই হলো মূল চ্যালেঞ্জ। গত অর্থবছরে বাজেট পেশ করেছিল অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু এবার নির্বাচিত সরকারের বাজেটের দিকে সচেতন মানুষের সংগতই বাড়তি নজর ছিল। সার্বিকভাবে বলা যায়, নতুন সরকার ক্রান্তিকালে বাজেট পেশ করেছে এবং সাধ ও সাধ্যের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর প্রয়াস চালিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। সরকার ইতিমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড,

কৃষক কার্ড, ই-হেলথ কার্ড ইত্যাদি চালু করেছে, দরিদ্র ও নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলোকে একক ডেটাবেজের আওতায় এনে সরাসরি আর্থিক, খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা সহায়তা প্রদান এক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য।  

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, সুষম উন্নয়ন, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা-স্থিতিশীলতা, জ¦ালানি নিরাপত্তা, বৈশি^ক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনজীবনের স্বস্তি নিশ্চিত করাসহ বিদ্যমান বহুমাত্রিক সংকট কাটানোর যে রূপরেখা বাজেটে তুলে ধরা হয়েছে, এসব বাস্তবায়নে সর্বাগ্রে জরুরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরাতে ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্য, যেমন ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্য তেল, বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১ শতাংশ হারে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, বাজার নিত্যবিড়ম্বনার একটি অন্যতম ক্ষেত্র এবং সেখানে অতিমুনাফাখোদের দাপট বরাবরই দেখা যায়। একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এ পর্যন্ত গৃহীত নানা কর্মসূচির সুফল কেন কাক্সিক্ষত মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়নি এর উৎসে নজর দিয়ে প্রতিবিধান করা চাই। তা না হলে কর কমানোর সুফল অধরাই থেকে যাবে।   

দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ইউনিফর্ম, জুতা ও ব্যাগ সরবরাহের উদ্যোগ এবং প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা সাধুবাদযোগ্য। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যেসব পরিকল্পনা রয়েছে, এসব বাস্তবায়িত হলে শিক্ষাব্যবস্থা দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতির দিকে আরও এগিয়ে যাবে। তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায় তা নিশ্চিত করাও চ্যালেঞ্জ। কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব যথোপযুক্ত মনে করি। কৃষি খাত আমাদের অর্থনীতির অন্যতম জোগানদার। কৃষি ও কৃষকের জন্য যা কিছু কল্যাণকর সেগুলোর দিকে বাড়তি নজরের দাবি রাখে। নজর বাড়াতে হবে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানায় উৎপাদনের পথ কুসুমাস্তীর্ণ করাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের

প্রস্তাবিত বাজেটে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক স্তরে জোরালো আইনি সমন্বয়ের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এর বাস্তবায়ন চাই।     

অর্থনীতিতে আবাসন খাতের অবদান কম নয়। কিন্তু অসত্য নয় যে, এ খাতের পথটি আশানুরূপ মসৃণ নয়। এই খাতটি জাতীয় অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিতে অন্যতম ভূমিকা পালনের পাশাপাশি সিমেন্ট, রড ও ইটসহ প্রায় ২৫০টি সহযোগী শিল্পেরও বিকাশ ঘটিয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে এ খাতের দিকে সুষ্ঠু নজর দেওয়া হয়নি বলে আমরা মনে করি। আশা করি বাজেট পাসের আগে অর্থমন্ত্রী এ ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবেন।

আমরা স্মরণ করি চীনা নেতা দেং জিয়াওপিংয়ের সেই বিখ্যাত প্রবাদ , ‘বিড়াল সাদা না কালো সেটি কোনো মুখ্য বিষয় নয়, মূল বিষয় হলো বিড়ালটি ঠিকমতো ইঁদুর ধরতে পারছে কিনা।’ তাত্ত্বিক বা বাহ্যিক বিষয়ের চেয়ে কাজের ফলাফলই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, বাজেট বড় না ছোট সেটা বড় কথা নয়, বাস্তবায়নই হলো মূল কথা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত