লক্ষ্য কি গালফ দেশগুলো?

ইরাকজুড়ে ইরানের গোপন নেটওয়ার্ক

আপডেট : ২০ জুন ২০২৬, ০৩:০০ এএম

মার্কিন বাহিনী অবস্থান করছে- এমন উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইরাকের অভ্যন্তরে নতুন গোপন ‘সেল’ বা ছোট দল তৈরি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ইরাকের ৮ জন ঊর্ধ্বতন সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং মিলিশিয়া কমান্ডারের বরাতে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য প্রকাশ করেছে। মূলত, আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত মিলিশিয়া নেটওয়ার্কগুলোকে এড়িয়ে নিজেদের কর্মকাণ্ড গোপন রাখতেই ইরান এই নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসি ইরাকের ভেতরে তিন বা চারটি সেল গঠন করেছে। প্রতিটি সেলে প্রায় ১০ জন করে অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজাত শিয়া যোদ্ধা রয়েছেন। এই সেলগুলো গত ২০ এপ্রিল থেকে ১৭ মে-র মধ্যে কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্তত সাতটি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। দক্ষিণ ইরাকের বসরা ও সামাওয়া শহরের নির্জন মরুভূমি এলাকা থেকে এসব হামলা চালানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই সেলগুলোর সদস্যদের একটি বড় অংশকে ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ নামক শক্তিশালী শিয়া মিলিশিয়া জোট থেকে নেওয়া হয়েছে। তবে এই নতুন গ্রুপগুলো ওই জোটের কমান্ড কাঠামোর অধীনে নয়; বরং তারা সরাসরি আইআরজিসি-এর নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছে।

নিরাপত্তা সূত্রগুলোর দাবি, এই গ্রুপগুলো অস্পষ্ট নাম ব্যবহার করে কুয়েতে তিনটি, সৌদি আরবে দুটি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে দুটি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে কুয়েতের ‘আলী আল সালেম’ বিমানঘাঁটি- যেখানে মার্কিন বাহিনী মোতায়েন রয়েছে এবং দেশটির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি সামরিক টার্মিনালকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। এছাড়া সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ধেয়ে আসা ড্রোনগুলো মাঝপথেই বাধা দেওয়া হয়েছিল। তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে এই হামলার লক্ষ্যবস্তু বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করতে পারেনি।

আইআরজিসি-এর এই কৌশল পরিবর্তনের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে বলে ধারণা করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা। ইরাকি সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, ইরান এই গোপন কৌশল নিয়েছে মূলত দুটি কারণে: প্রথমত, দায় অস্বীকার করার সুযোগ তৈরি করা, যাতে ইরাকের প্রধান ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে অভিযুক্ত করা না যায়। দ্বিতীয়ত, ইরাকের মাটি থেকে সব ধরনের সশস্ত্র গোষ্ঠী বিলুপ্ত করার জন্য মার্কিন চাপ হ্রাস করা। আইআরজিসি এখন স্বল্প সংখ্যক কিন্তু অত্যন্ত অনুগত ও বিশেষজ্ঞ যোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করছে, যারা ড্রোন পরিচালনা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় দক্ষ।

ইরাকি অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ও শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী বিশেষজ্ঞ জাসিম আল-বাহাদলি জানিয়েছেন, ইরান বর্তমানে সীমিত সম্পদের ওপর ভিত্তি করে কাজ করছে। তেহরানের কৌশল এখন বড় কোনো বাহিনী নয়, বরং এমন সব কট্টরপন্থী গ্রুপ তৈরি করা যারা নামমাত্র আর্থিক সহায়তায় কাজ করবে এবং যাদের মূল লক্ষ্য হবে আনুগত্য ও গোপনীয়তা বজায় রেখে আঞ্চলিক প্রভাব টিকিয়ে রাখা। বিশেষ করে গত বছরের ৭ অক্টোবর হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান তার আঞ্চলিক জোটগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করেছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতন এবং লেবানন ও ইয়েমেনে হামলার শিকার হওয়ার পর তেহরান এখন ইরাককে নতুনভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে।

ইরাকের বর্তমান সরকারের জন্য এই পরিস্থিতি একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরাকের নতুন প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি গত মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মার্কিন চাপের মুখে রয়েছেন। মার্কিন সরকার বারবার ইরাকের মাটি থেকে আইআরজিসি ও ইরান-সমর্থিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে উপড়ে ফেলার জন্য বাগদাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সম্প্রতি ইরাকের শিয়া রাজনৈতিক জোটের অনেক প্রভাবশালী অংশ, যেমন ‘আসাইব আহল আল-হাক’ ও ‘ইমাম আলী ব্রিগেড’, মার্কিন ও ইরাকি সরকারের চাপের মুখে নিজেদের অস্ত্র সমর্পণ করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে আইআরজিসি-এর এই নতুন সেলগুলো সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় তা বাগদাদের জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যদিও গত বুধবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তবে এই চুক্তির মাধ্যমে তেহরান তার প্রক্সি গ্রুপগুলোর সহায়তা বন্ধ করবে এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, তাদের আঞ্চলিক ‘প্রতিরোধ গ্রুপ’ বা প্রক্সি শক্তির বিষয়টি কোনো আলোচনার বিষয় নয়। এ পরিস্থিতিতে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি গত সোমবার মার্কিন প্রতিনিধি টম বারাকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে ইরাকের মাটি যেন কোনোভাবেই আঞ্চলিক শান্তি বিঘ্নিত করতে ব্যবহৃত না হয়, তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জাইদি।

ইরাকি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা গত ১৭ মে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘বারাকাহ’ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ঘটা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এই নতুন গ্রুপগুলোর সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে। একই দিনে সৌদি আরব তাদের আকাশসীমায় ইরাক থেকে আসা তিনটি ড্রোন গুলি করে নামানোর কথা জানিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি এই হামলাগুলোকে ‘অপরাধমূলক’ আখ্যা দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে যৌথ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এছাড়া কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত গত এপ্রিলে ইরাকি দূতকে তলব করে এই হামলার ঘটনায় কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে।

বাগদাদ এখন একদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ভারসাম্য রক্ষার জটিল খেলায় লিপ্ত, অন্যদিকে প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সম্পর্কের উন্নয়নকেও হুমকির মুখে দেখছে। ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী এখন এই গোপন গ্রুপগুলোর চেইন অব কমান্ড খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে যাতে ভবিষ্যৎ হামলা রোধ করা সম্ভব হয়। তবে রয়টার্সের প্রশ্নের উত্তরে ইরান ও সংশ্লিষ্ট উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকারি কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

সূত্র: রয়টার্স

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত