ফ্ল্যাটের স্বপ্নে করের কাঁটা

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ০২:১২ এএম

প্রায় এক যুগ আগে চার বন্ধু মিলে রাজধানীর ত্রিমোহনী এলাকায় ৬ কাঠার একটি ছোট জমি কিনেছিলেন। ইচ্ছা ছিল নিজেরাই বাড়ি তৈরি করে ভাগাভাগি করে নেবেন। কিন্তু সামর্থ্যরে বাইরে থাকায় তা হয়ে ওঠেনি। অবশেষে বন্ধুরা মিলে সিদ্ধান্ত নেন কোনো ডেভেলপার কোম্পানিকে দিয়ে ভবন তৈরি করবেন। চুক্তি অনুযায়ী পাওয়া নিজেদের ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে অন্তত শেষ বয়সটা কাটিয়ে দিতে পারবেন।

বছর দুয়েক আগে পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিও করেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় ড্যাপের উচ্চতা খড়্গ। রাজউক থেকে জানানো হয়, এ জমিতে ৭ তলার ওপর ভবন করা যাবে না। এতে জমির মালিক ও ডেভেলপার কোম্পানি উভয়ে বিপদে পড়ে। পরে আইনি নানা ঝামেলা পার করে ১০ তলা পর্যন্ত নকশা অনুমোদন করিয়ে নেন। এরপর বেড়ে যায় রড, সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রীর দাম। সব জটিলতা কাটিয়ে ভবন নির্মাণ শুরু হলেও জমির মালিকদের কপালে নতুন চিন্তার ভাঁজ। এবার নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি বা আইনি কোনো জটিলতা নয়, বাজেটে নতুন করে আরোপ করা করের বোঝা যেন বয়সের শেষ প্রান্তে আসা মানুষগুলোকে ন্যুব্জ করে দিয়েছে।

আলাপকালে অবসরপ্রাপ্ত এক সরকারি কর্মকর্তা হামিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই বছর ধরে বিল্ডিং নির্মাণের জন্য নানা জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে। একের পর এক সমস্যা এসে সামনে দাঁড়ায়। একটি ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পর ভেবেছিলাম সারাজীবনের স্বপ্ন অন্তত মৃত্যুর আগে হলেও পূরণ হচ্ছে। কিন্তু এ বাজেটে জমির মালিককেও ১৫ শতাংশ ট্যাক্স দিতে হবে। এত টাকা কোথায় পাব?’

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, এটা স্রেফ জুলুম। আমরা একটা করে ফ্ল্যাট পাব। ফ্ল্যাটগুলো নিজে ব্যবহার করব। এরপরও যদি ট্যাক্স দিতে হয়, তাহলে আর কোথায় যাব? শুধু হামিদুর রহমান বা তার তিন বন্ধু-ই নয়, করের বোঝার চাপে পড়েছেন এমন হাজারো জমির মালিক। যারা এখনো চুক্তি করেননি তাদের ভাবনা আরও বেশি।

আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন কর প্রস্তাব ভাবনায় ফেলেছে এমন হাজারো জমির মালিককে। নির্মাণকাজ শুরুর আগেই সাইনিং মানি বা ফ্ল্যাটের মূল্যের বিপরীতে বড় অঙ্কের করের বোঝা বহনের হিসাব কষতে হচ্ছে। এমন হিসাবের জালে আটকে যাচ্ছে অনেক মানুষের স্বপ্নের আবাসন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্থাবর সম্পত্তি লেনদেনে কর কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, ডেভেলপারকে জমি দেওয়ার বিনিময়ে জমির মালিক নগদ অর্থ, সাইনিং মানি, ফ্ল্যাট হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত ভাড়া সুবিধা বা আর্থিক মূল্যসম্পন্ন অন্য যেকোনো সুবিধা পেলে তা ‘মূলধনী মুনাফা’ হিসেবে বিবেচিত হবে। জমির আদি অর্জনমূল্য বাদ দিয়ে অবশিষ্ট মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।

অর্থ বিলের সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী, কোনো জমির মালিক যদি ডেভেলপারের সঙ্গে যৌথ চুক্তিতে যান, তবে তার প্রাপ্ত সব সুবিধাকেই মুনাফা হিসেবে গণ্য করা হবে।

একজন জমির মালিক জমি দেওয়ার বিনিময়ে ৬০ লাখ টাকা নগদ (সাইনিং মানি) এবং দুই কোটি টাকা দামের দুটি ফ্ল্যাট পেলেন। অর্থাৎ তিনি মোট দুই কোটি ৬০ লাখ টাকার সুবিধা পেলেন। এখন তার জমিটি যদি আগের কেনা থাকে ৬০ লাখ টাকায়, তবে তার লাভ বা মুনাফা হলো ১ কোটি টাকা। নতুন নিয়মানুযায়ী, এ লাভের ওপর তাকে ১৫ লাখ টাকা কর দিতে হবে।

নতুন ভবন তৈরি হওয়ার সময় (ধরা যাক ৩ বছর) জমির মালিক যদি প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা করে বাড়িভাড়া পান এবং পরে আড়াই কোটি টাকা দামের ৫টি ফ্ল্যাট বুঝে নেন, তবে তাকে কয়েক ধাপে কর দিতে হবে। প্রথমত প্রতি বছর ওই ভাড়া বাবদ আয়ের ওপর নিয়মিত ট্যাক্স দিতে হবে। দ্বিতীয়ত ফ্ল্যাটগুলো বুঝে পাওয়ার সময় বড় অঙ্কের কর দিতে হবে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে যদি তিনি ওই ফ্ল্যাটগুলো আরও বেশি দামে বিক্রি করেন, তখন বাড়তি লাভের ওপর আবারও কর দিতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের এমন নীতির কারণে মানুষ বাড়ি বানানোর আগ্রহ হারাবে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, যাদের সারাজীবনের স্বপ্ন থাকে একটি নিজের ফ্ল্যাটের। সেই মানুষরা আশাহত হবেন। এতে আবাসন তৈরি কমে যাওয়ার শঙ্কা আছে। ফলে মানুষের এই মৌলিক চাহিদার সংকট আরও বাড়বে। এতে ফ্ল্যাটের দাম বাড়বে, বাড়বে বাড়িভাড়াও। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় জনসংখ্যা এখন প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ। বৃহৎ এ জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশের নিজস্ব আবাসন নেই, ভাড়া বাড়িতে বসবাস করছেন।

আবাসন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত ক্রেতাদের বড় অংশ বাজার থেকে ছিটকে পড়েছে। একই সঙ্গে সিমেন্ট, রডসহ নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে, যার প্রভাব সরাসরি ফ্ল্যাটের দামে পড়ছে। ফলে ক্রেতা সংকট আরও তীব্র হচ্ছে এবং বিক্রি না হওয়া ফ্ল্যাটের সংখ্যা বাড়ছে।

কর কাঠামোকেও এ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। একাধিক স্তরে কর, উচ্চ রেজিস্ট্রেশন ফি এবং অন্যান্য চার্জ বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে আবাসন খাতে করহার প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ করবৃদ্ধির ফলে ফ্ল্যাটের দাম আরও বেড়েছে, যা সরাসরি ক্রেতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং লেনদেন কমিয়ে দিচ্ছে। আবাসন খাতের এ স্থবিরতা শুধু ডেভেলপারদের নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত প্রায় ২০০টির বেশি সহায়ক শিল্পকে প্রভাবিত করছে। ফলে কর্মসংস্থান হ্রাসের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আবাসন ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা, কর হ্রাস এবং স্বল্প সুদের ঋণ সুবিধা চালুর দাবি জানিয়েছেন। তারা একটি বিশেষ আবাসন তহবিল গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছেন, যার মাধ্যমে সহজ শর্তে ক্রেতাদের ঋণ দেওয়া সম্ভব হবে এবং বাজারে চাহিদা বাড়বে।

রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং আরমা গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন করে করারোপ করার ফলে ১ জুলাইয়ের পর অনেক প্রকল্পে নতুন ধরনের প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে। কর নির্ধারণের ভিত্তি কী হবে? বাজারমূল্য, নাকি চুক্তিমূল্য? ফ্ল্যাটের মূল্য কে নির্ধারণ করবে? মূল্যায়ন নিয়ে আপত্তি উঠলে তার নিষ্পত্তি কোথায় হবে? এ প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। এর ফলে কর আদায়ের আগে কর বাস্তবায়নের কাঠামো নিয়েই নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে যৌথ উন্নয়ন পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর মডেল। পুরান ঢাকা, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার পুরনো ভবন এ মডেলের মাধ্যমে আধুনিক ও নিরাপদ ভবনে রূপান্তরিত হয়েছে। যদি জমির মালিকরা মনে করেন, উন্নয়ন চুক্তি শেষে তাদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা আসবে, তাহলে তারা পুনঃউন্নয়ন কার্যক্রম থেকে সরে যেতে পারেন। এর ফলে শুধু আবাসন খাত নয়, নগর নিরাপত্তা ও পরিকল্পিত নগর উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের রাজস্ব প্রয়োজন আছে। কিন্তু রাজস্ব আহরণের পদ্ধতি এমন হওয়া উচিত, যাতে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নিরুৎসাহিত না হয়। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিকল্প সমাধান বিবেচনা করা যেতে পারে।

রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট এবং গ্লোরিয়াস ল্যান্ডস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টসের চেয়ারম্যান ড. আলী আফজাল মনে করেন, দেশের আবাসন খাত বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের মুখোমুখি। আগামী ১ জুলাই থেকে প্রস্তাবিত কর কাঠামো বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে খাতটির ভবিষ্যৎ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের আবাসন ব্যয়ের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জমি নিবন্ধন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে আবাসন ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। জমি ও ফ্ল্যাটের দাম বাড়বে, ক্রেতাদের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের নিজস্ব আবাসনের স্বপ্ন আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

তিনি বলেন, জমি নিবন্ধন ব্যয় ১৪ শতাংশে উন্নীত করা হলে বাজারে লেনদেন কমে যেতে পারে এবং আবাসন খাতে স্থবিরতা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে সরকারের রাজস্ব আদায়ও প্রত্যাশিত মাত্রায় না হতে পারে। বরং করের হার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখলে লেনদেন বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজস্বও বাড়বে।

তিনি বলেন, আবাসন খাতকে শক্তিশালী করা মানে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। পরিকল্পিত নগরায়ণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণের জন্য এ খাতের ধারাবাহিক বিকাশ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকার, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত