জার্মানির লক্ষ্য শতভাগ জয়

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ০২:০৯ এএম

১৯৫৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ ফাইনালে অপ্রতিরোধ্য হাঙ্গেরির মুখোমুখি হয় পশ্চিম জার্মানি। ম্যাচের আগে হাঙ্গেরির জয়ে বাজি ধরেছিল গোটা ইউরোপ। জার্মানদের সম্ভাবনা এতটাই কম ছিল যে, অনেক সংবাদমাধ্যম ম্যাচের আগেই হাঙ্গেরির শিরোপা উদযাপনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। কিন্তু ফুটবল যে ভবিষ্যদ্বাণী মানে না, তা প্রমাণ করে দেয় জার্মানি। ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ ব্যবধানে জেতে দলটি। ইতিহাসে যা পরিচিত হয়ে আছে ‘মিরাকল অব বার্ন’ নামে। তারপর থেকেই ফুটবলবিশ্বে একটি বিশ্বাস জন্ম নেয়, জার্মানিকে কখনোই শেষ বাঁশি বাজার আগে হারিয়ে দেওয়া যায় না। এ নিয়ে একটি পুরনো রসিকতাও আছে। বলা হয়, ফুটবল এমন এক খেলা যেখানে দুই দল মাঠে নামে, ৯০ মিনিট লড়াই করে, দর্শকরা শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনা উপভোগ করে, আর শেষে দেখা যায় জার্মানি জিতে গেছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে জার্মানদের ধারাবাহিকতা, ঠান্ডা মাথা আর কঠিন মুহূর্তে ম্যাচের ফল নিজেদের পক্ষে আনার ক্ষমতা এমনই যে এই লোককথার প্রচলন আজও আছে।

অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার অন্যতম শক্তিশালী দল ইকুয়েডরকে নিয়েও একটি মজার গল্প আছে। দেশটি নাকি ফুটবলে বড় দলগুলোর পার্টিতে আমন্ত্রণপত্র ছাড়াই ঢুকে পড়ে। সবাই যখন ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা উরুগুয়েকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন ইকুয়েডর নীরবে নিজের কাজটা করে যায়, আর সুযোগ পেলেই কোনো বড় দলকে বিব্রত করে। বিশ্বকাপের ‘ই’ গ্রুপে জার্মানি ও ইকুয়েডরের লড়াই তাই শুধু দুদলের মুখোমুখি হওয়া নয়, বরং দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের লড়াইও বটে। একদিকে ইতিহাসের ভার, অন্যদিকে স্বপ্নের বিরুদ্ধে বাস্তবতার লড়াই।

বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচে জার্মানি নামবে টানা তৃতীয় জয়, টানা ১২তম জয়ের রেকর্ড এবং বিশ্বকাপের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার লক্ষ্যে। তবে ইকুয়েডরের সামনে সমীকরণ অনেক জটিল। নকআউট পর্বে ওঠার আশা বাঁচিয়ে রাখতে হলে জয়ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই আন্দিজ পর্বতমালার দেশটির সামনে। টানা দুই জয়ে যেখানে জার্মানরা আগেই গ্রুপসেরা হয়ে পরের পর্বের টিকিট নিশ্চিত করেছেন, সেখানে দুই ম্যাচে মাত্র ১ পয়েন্ট ইকুয়েডরের। শুধু জার্মানিকে হারালেই চলবে না, গ্রুপের অন্য ম্যাচে আইভরি কোস্টের হারের প্রত্যাশাও করতে হবে তাদের। পাশাপাশি কুরাসাও যেন বড় ব্যবধানে জয় না পায়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে এননার ভ্যালেন্সিয়াদের।

এমন কোণঠাসা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াইয়ের আগে অবশ্য আত্মতুষ্টিতে ভুগতে চান না জার্মানরা। দলটির মিডফিল্ডার নাদিয়েম আমিরি বলেন, ‘আমাদের এই ছন্দ ধরে রাখতে হবে। কারণ প্রতিটি জয় আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ম্যাচটিও আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জার্মানি থেকে অনেক সমর্থক খেলা দেখতে আসবেন। তাই আমরা শতভাগ জয়ের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামব এবং নিজেদের সর্বোচ্চটুকু নিংড়ে দিয়ে খেলব।’ কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যানও চান তার দল এমন মানসিকতা ধরে রাখুক। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার পর এবার ১২ বছর পর প্রথমবারের মতো নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে জার্মানি। এ ধারাবাহিকতা ধরে রেখে নিজেদের পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ের পথে এগিয়ে যেতে চায় দলটি।

তবে এসবের মাঝেও চোট নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে জার্মান শিবিরে। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ম্যাচে গোড়ালির লিগামেন্টে চোট পেয়ে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছেন নিয়মিত সেন্টার-ব্যাক নিকো শ্লটারবেক। ফলে রক্ষণভাগে পরিবর্তন আনতে হচ্ছে জার্মান কোচকে। সেই ম্যাচে বদলি হিসেবে নামা আন্তোনিও রুডিগার এবার প্রথমবারের মতো শুরুর একাদশে সুযোগ পেতে পারেন। জোনাথান তাহর সঙ্গে জুটি গড়ে জার্মান রক্ষণ সামলানোর দায়িত্ব পড়তে পারে তার কাঁধে। শ্লটারবেকের অনুপস্থিতি জার্মান রক্ষণ আরও দুর্বল হতে পারে। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকবারই তাদের রক্ষণভাগ অগোছালো ছিল। বিশেষ করে দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাকের সামনে জার্মান ডিফেন্স অনেক খেই হারিয়ে ফেলছে। ইকুয়েডর যদি দ্রুতগতির আক্রমণ সাজাতে পারে, তাহলে কিছুটা হলেও চাপে ফেলতে পারবে ইউরোপের পরাশক্তিদের।

অবশ্য ইকুয়েডরের বর্তমান অবস্থান বিবেচনায় তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা আক্রমণভাগ। প্রথম ম্যাচে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ১-০ গোলে হারের পর দ্বিতীয় ম্যাচে কুরাসাওয়ের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করেছে তারা। আরও হতাশার বিষয়, এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে একটি গোলও করতে পারেনি দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। যদিও বিশ্বকাপে আসার আগে টানা ১৯ ম্যাচ অপরাজিত ছিল ইকুয়েডর। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বাছাই পর্বে তারা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার পর দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। সেই দলটিই এখন টুর্নামেন্টে টিকে থাকার লড়াইয়ে। তাই তাদের সামর্থ্য নিয়ে সন্দেহের সুযোগ নেই। বরং অনেকের মতে, তারা এখনো পর্যন্ত নিজেদের প্রকৃত সামর্থ্যরে কাছাকাছিও যেতে পারেনি।

দুই দলের মুখোমুখি পরিসংখ্যান জার্মানির পক্ষেই কথা বলছে। সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচটি হয়েছিল ২০০৬ বিশ্বকাপে। স্বাগতিক জার্মানি সেই ম্যাচে ৩-০ গোলে জয় পায়। পরে একটি প্রীতি ম্যাচেও জয় তুলে নেন জার্মানরা। তবে বিশ্বকাপ এমন এক মঞ্চ, যেখানে ইতিহাস প্রায়ই নতুন করে লেখা হয়। আর সেই আশাতেই বাঁচছে ইকুয়েডর। কারণ তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত