ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। গতকাল শনিবার সর্বসাধারণের শ্রদ্ধার জন্য রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাখা হয় তার মরদেহ। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বলেছে, লাখো মানুষের উপস্থিতিতে এই অনুষ্ঠান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিপক্ষদের উদ্দেশে শক্তির প্রদর্শনী হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শনিবার ভোর থেকেই মানুষের ঢল নামে রাজধানীতে। শহরের প্রধান সড়কগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং বহু এলাকায় যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, বিশাল গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সের প্রধান চত্বর অনুষ্ঠান শুরুর অনেক আগেই পূর্ণ হয়ে যায়। বহু মানুষ কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে সেখানে পৌঁছান। তেহরানের বিভিন্ন মেট্রো স্টেশনেও সকাল থেকে মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যায়।
কালো পোশাক পরিহিত শোকাহত মানুষের হাতে ছিল ইরানের জাতীয় পতাকা ও লাল ব্যানার। ইরানি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে লাল পতাকা প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। সমবেত জনতা ‘যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যু হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগান দিতে থাকে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, কাচঘেরা একটি বিশেষ স্থাপনায় খামেনির কফিন রাখা হয়েছে। একই স্থানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত তার পরিবারের সদস্যদের কফিনও রাখা হয়। হাজারো মানুষ সেখানে অশ্রুসিক্ত চোখে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ইরানি কর্র্তৃপক্ষের ধারণা, কেবল তেহরানেই আগামী তিন দিনে খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দেড় থেকে ২ কোটি মানুষ অংশ নেবেন। বলা হচ্ছে, ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির পূর্বসূরি ও ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজার পর ইরানে এটাই সবচেয়ে বড় জনসমাগম হতে চলেছে। খোমেনির শোক ও দাফন অনুষ্ঠানে প্রায় এক কোটি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
এই শোক অনুষ্ঠানে শুধু আলি খামেনিকেই নয়, তার পরিবারের নিহত সদস্যকেও স্মরণ করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন তার এক জামাতা, জ্যেষ্ঠ কন্যা, ১৪ মাস বয়সী নাতনি এবং বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির স্ত্রী। তবে মোজতবা খামেনি নিজে জনসমক্ষে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিত থাকবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই শোক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ করার পাশাপাশি আকাশসীমাও বন্ধ রাখার কথা রয়েছে। ১৯৮৯ সালে খামেনির পূর্বসূরি রুহুল্লাহ খোমেনির দাফন অনুষ্ঠানের পর এটিই হতে যাচ্ছে ইরানের সবচেয়ে বড় গণ-জমায়েত।
আলি খামেনির এই শোক অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন শতাধিক দেশের প্রতিনিধি। গত শুক্রবার শোক অনুষ্ঠানে অংশ নেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান, জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখেইল কাভেলাশভিলিসহ অনেক বিশ্বনেতা। এ ছাড়াও রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের পক্ষে হাজির ছিলেন রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমানে দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ। ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ গোষ্ঠী হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের প্রতিনিধিরাও এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
প্রায় সাড়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইরান শাসন করা ৮৬ বছর বয়সী খামেনির স্মরণে ছয় দিনব্যাপী এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ শোকানুষ্ঠান ইরানের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি ইরাকেও অনুষ্ঠিত হবে। আগামী সোমবার পর্যন্ত খামেনির কফিন সর্বসাধারণের শ্রদ্ধার জন্য রাখা হবে এবং ওইদিন তেহরানের রাস্তায় শোকমিছিল হবে। আগামীকাল সোমবাার তেহরানের থাকার পর মঙ্গলবার খামেনির মরদেহ নেওয়া হবে ইরানের ধর্মীয় নগরী কোমে। বুধবার এটি প্রতিবেশী ইরাকের শিয়া মুসলমানদের পবিত্র নগরীগুলোতে নেওয়া হবে। এরপর আগামী ৯ জুলাই উত্তর-পূর্ব ইরানের নিজ শহর মাশহাদে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে দাফন করা হবে।