তাহার নামটি রঞ্জনা

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০২:১৬ এএম

রমনা উদ্যানে গিয়ে রঞ্জনাগাছ দেখে কবিগুরুর এক গাঁয়ে কবিতার এ লাইন দুটি বেশ মনে পড়ে এক গাঁয়ে দুজন বাস করার কী সুখ! সে রকম এক চোখের সুখ যেন পাই রঞ্জনা ফুলের মঞ্জরিকে দেখে, যেন মুক্ত বেণী পাতার ওপর লোটে, পুষ্পিত বাহু তার আকাশ পানে ছোটে। এ গাছের পোশাকি বা কেতাবি নাম রঞ্জনা হলেও বড়বেলা পর্যন্ত এ গাছকেই জানতাম রক্তচন্দন বা লালচন্দন নামে। যেটিকে প্রায় সবাই রক্তচন্দন বলে জানেন সে গাছটি আসলে রঞ্জনা। কী চমৎকার নাম!

জেমস টেইলরের টপোগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকস অব ঢাকা বইয়ে ঢাকায় রক্তচন্দন আছে বলে যে গাছটির কথা উল্লেখ করেছেন সেটিকে আমরা অনেকেই ভুল করে রক্তচন্দন নামে ডাকি। আমাদের ভুলের গোড়াটা বোধ হয় ওখানেই। ১৮৪০ সালে প্রকাশিত বইয়ে জেমস টেইলর যদি রক্তচন্দন নামের পাশে বন্ধনীতে তার উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামটি লিখে রেখে না যেতেন তাহলে আমরা ধরেই নিতাম যে ঢাকায় কোম্পানি আমলে রক্তচন্দন গাছ ছিল। তার বইয়ে এ গাছটির উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে অ্যাডিন্যানথেরা প্যাভোনিনা (Adenanthera pavonina) যা রঞ্জনা গাছের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম। এ বৃক্ষটির ইংরেজি নাম টেইলর লিখেছেন বাস্টার্ড ফ্লাওয়ার ফেন্স। এ গাছ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘গাছটি অনেক বড় হয় ও বাঁচে বহু বছর। এর বীজ ও কাঠ ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে ফুসফুসের রক্ত চলাচল ও চোখের অপথালমিয়া রোগের চিকিৎসায় এর কাঠ ও বীজ ব্যবহার করা হয়।’

এ গাছ থেকে রঞ্জক বা রঙ পাওয়া যায় বলে এর নাম রঞ্জনা। ডিকশনারি অব প্ল্যান্টস নেমস অব বাংলাদেশ বইয়ে এর বাংলা নাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে রক্তচন্দন, কুয়াচন্দন, কুনচন্দন ও রক্তকম্বল। ইংরেজি নাম রেড উড বা রেড বিড-ট্রি। রঞ্জনা পাতাঝরা প্রকৃতির বৃক্ষ। গাছ খুব দ্রুত বাড়ে ৬-১৫ মিটার লম্বা। ডালপালা ছড়ানো সুন্দর ছাতার মতো গড়ন। ছায়াতরু হিসেবে মানানসই। পাতা দ্বিপক্ষল, একটি পত্রদণ্ডের দুপাশে আয়ত-ডিম্বাকার দুই থেকে ছয় জোড়া পত্রক বিপরীতমুখীভাবে সাজানো থাকে। পাতার উপরের পিঠ ফিকে সবুজ, নিচের পিঠ নীলচে সবুজ। বুড়ো হলে পাতার রঙ হয়ে যায় হলুদ।

ডালের শীর্ষে লম্বা শিষের মতো ছড়ায় গাদাগাদি করে প্রচুর ফুল ফোটে, পুষ্পমঞ্জরি দেখতে ইঁদুরের লেজের মতো। ফুল ক্ষুদ্র, হলদে বা হলদে সাদা। ফুল ফোটে গ্রীষ্ম-বর্ষাকালে, তবে বছরের অন্য সময়েও কিছু ফুল ফুটতে দেখা যায়। একই সময়ে গাছে কুঁড়ি, ফুল, কাঁচা ও পাকা ফল দেখা যায়। ফুল সুগন্ধযুক্ত। ফুল দেখতে তারার মতো, পাঁচটি পাপড়ি ফল দেখতে শিমের মতো, তবে ফলগুলো বক্রভাবে কুঞ্চিত। এজন্য এর ফলকে বলে কার্লি বিন। কাঁচা ফল সবুজ, পাকলে ফলের খোসা বাদামি হয়ে যায় ও শুকিয়ে আপনা-আপনি ফেটে যায় ও বীজ গাছের তলায় ছড়িয়ে পড়ে। বীজ শক্ত, টকটকে লাল, চকচকে ও গোলাকার চাকতির মতো।

এর কাঠ থেকে লাল রঙ পাওয়া যায়। কাঠ খুব শক্ত। কাঠ দিয়ে নৌকা ও আসবাবপত্র তৈরি করা যায়। জ্বালানি কাঠ হিসেবেও রঞ্জনা কাঠ ব্যবহার করা হয়। ডায়রিয়া রোগের চিকিৎসায় এ গাছের বাকল ও কচি পাতার ক্বাথ ব্যবহার করা হয়। গাছটি ফ্যাবেসি পরিবারের উদ্ভিদ হওয়ায় এর শিকড় বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে তা মাটিতে যোগ করে। ফলের মাটির পুষ্টি বাড়ে। এ ছাড়া গাছের পাতা ঝরে তলায় পড়ে পচে তা মাটিতে জৈব সার হিসেবে যুক্ত হয়। গাছের পাতা ঝরলেও খুব অল্প সময়ের জন্য নিষ্পত্র অবস্থায় থাকে।

রঞ্জনা গাছ বিভিন্ন উদ্যানে ও বাগানে, পথের ধারে শোভাবর্ধক গাছ হিসেবে লাগানো হয়। কোনো কোনো দেশে এর কচিপাতা শাক হিসেবে খাওয়া হয়। কাঁচা বীজ বিষাক্ত কিন্তু বীজ ভেজে বা রান্না করে খাওয়া যায়। সিঙ্গাপুরে এরূপ খাবারের চল আছে। প্রাচীনকাল থেকে রঞ্জনার বীজ প্রেমের প্রতীক। এজন্য চীনে এ গাছের ফলকে বলে মিউচুয়াল লাভ বিন। সে দেশের মেয়েরা এর রক্তলাল বীজ দিয়ে মালা গেঁথে গলায় ও হাতে পড়ে। অরণ্যের গাছ হলেও ঢাকার শহরে বর্তমানে রঞ্জনাগাছ অঢেল রয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, রমনা উদ্যান, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান প্রভৃতি স্থানে রঞ্জনা গাছ আছে।

লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত