ইউরোপজুড়ে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০২:১৮ এএম

রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহে এক নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইউরোপ। জুনের মাঝামাঝি শুরু হওয়া তীব্র গরম জুলাইয়েও অব্যাহত থাকায় পশ্চিম, দক্ষিণ ও মধ্য ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল কার্যত অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। বহু দেশে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। কোথাও কোথাও রাতের তাপমাত্রাও ২০ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামছে না, যা ‘ট্রপিক্যাল নাইট’ নামে পরিচিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ফলে মানুষের শরীর রাতেও স্বাভাবিকভাবে তাপমুক্ত হতে পারছে না। এতে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগজনিত জটিলতা অত্যন্ত বাড়ছে।

বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ এখন ইউরোপ। অতীতে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা দেওয়া দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ধীরে ধীরে নিয়মিত জলবায়ুগত বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। জলবায়ু তথ্যসেবা প্ল্যাটফর্ম কোপারনিকাস ক্লাইমেট সার্ভিসের তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে, বিশেষ করে ইউরোপে। এটি সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণায়নকারী মহাদেশ, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্বিগুণ দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে।

এবারের তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স। দেশটির জনস্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ২২ থেকে ২৮ জুন মাত্র এক সপ্তাহে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা দুই হাজার ২৫ জন, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি।

তবে এটি প্রাথমিক হিসাব। বিস্তারিত বিশ্লেষণের পর সংখ্যাটি আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, অতিরিক্ত মৃত্যুর প্রায় ৮৫ শতাংশই ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো নিজ নিজ বাসভবনে মৃত্যুর হার আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ৯১ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে হাসপাতালগুলোতে হিটস্ট্রোক, তীব্র পানিশূন্যতা, শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত জটিলতা এবং হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মে ও জুন মাসজুড়ে অতিরিক্ত মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশ হয়নি। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সব তথ্য যাচাই শেষে সামগ্রিক চিত্র প্রকাশ করা হবে।

অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং প্রবল বাতাসের কারণে দক্ষিণ ফ্রান্সে একের পর এক দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে। চলতি মৌসুমে সাত হাজারের বেশি দাবানলের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৮ হাজার ৭০০ হেক্টরেরও বেশি বনভূমি আগুনে পুড়ে গেছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আউদ, পিরেনে-ওরিয়াঁতাল, বুশ-দ্য-রোন এবং ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলবর্তী অঞ্চল। শুধু আউদ এলাকাতেই প্রায় এক হাজার ৯০০ হেক্টরের বেশি বনভূমি আগুনে ধ্বংস হয়েছে। ঘণ্টায় প্রায় ৭০ কিলোমিটার বেগে বাতাস বইতে থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রায় দুই হাজার দমকলকর্মী, অগ্নিনির্বাপক বিমান, কানাডেয়ার উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে হাজারো বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ফ্রান্সের পাশাপাশি স্পেন, ইতালি, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, সেøাভাকিয়া, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, যুক্তরাজ্য এবং বলকান অঞ্চলের বিভিন্ন দেশেও নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছে। জার্মানির বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত গরমে সড়কের পিচ নরম হয়ে ফাটল দেখা দিয়েছে। তাপের কারণে রেললাইন বিকৃত হওয়ায় ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। বেলজিয়ামে সীমিত করা হয়েছে কিছু রেলসেবা। ইতালিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে নদী ও জলাধারের পানির স্তর উদ্বেগজনকভাবে কমে যাচ্ছে।

প্রাথমিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক সপ্তাহে ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় তিন হাজার ৭০০-তে পৌঁছেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহজনিত বহু মৃত্যু কয়েক দিন কিংবা কয়েক সপ্তাহ পর সরকারি পরিসংখ্যানে যুক্ত হয়। ফলে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে ইউরোপের কৃষি খাতও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। গম, ভুট্টা ও সূর্যমুখীর উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আঙুরের বাগানগুলোতে তাপজনিত ক্ষতি বাড়ছে। পশুখাদ্যের সংকট, সেচের পানির ঘাটতি এবং বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রভাব আগামী মাসগুলোতে ইউরোপের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাজারে প্রতিফলিত হতে পারে। ফলে খাদ্যপণ্যের মূল্যও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে তাপপ্রবাহের কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন প্রবীণ, শিশু, গর্ভবতী নারী, দীর্ঘমেয়াদি হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং খোলা আকাশের নিচে কর্মরত শ্রমিকরা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন শহরে কুলিং সেন্টার চালু করা হয়েছে। কোথাও স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে, কোথাও বহিরাঙ্গন অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে। অনেক এলাকায় কর্মঘণ্টা পরিবর্তন করে দুপুরের অতিরিক্ত গরম এড়িয়ে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এবারের তাপপ্রবাহের অন্যতম কারণ ‘ওমেগা ব্লক’ নামে পরিচিত একটি স্থির উচ্চচাপ বলয়। এই বলয়ের কারণে উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা অত্যন্ত উষ্ণ ও শুষ্ক বায়ু দীর্ঘ সময় পশ্চিম ইউরোপের ওপর স্থির হয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কম হওয়ায় বনাঞ্চল অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে পড়েছে, যা দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। তাপপ্রবাহ কেবল একটি মৌসুমি আবহাওয়ার ঘটনা নয়, এটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবেরই প্রতিফলন। মানুষের কর্মকা-ে সৃষ্ট গ্রিন হাউজ গ্যাসের নির্গমন বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং এর ফলেই ইউরোপে দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়া ক্রমশ বাড়ছে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া বিভাগ সতর্ক করেছে, জুলাই মাসজুড়েই উচ্চ তাপমাত্রা অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে দাবানল, পানির সংকট, বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি, কৃষি ক্ষতি এবং জনস্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৬ সালের এই তাপপ্রবাহ শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব ও ক্রমবর্ধমান হুমকির একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। কার্যকর জলবায়ু অভিযোজন, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও ঘন ঘন এবং আরও ভয়াবহ তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত