ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) বাংলাদেশের নতুন সরকারকে বাস্তববাদী কূটনীতির আলোকে রোহিঙ্গাবিষয়ক নীতিকে নতুন করে সাজানোর পরামর্শ দিয়েছে। আইসিজির বাংলাদেশ ও মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ থমাস কেইন গতকাল বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ পরামর্শ দেন।
বেলজিয়ামের ব্রাসেলসভিত্তিক সংস্থাটি বলেছে, ‘শরণার্থী সংকটের প্রতি (আন্তর্জাতিক) মনোযোগ কমে যেতে না দিয়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারের উচিত বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করা এবং বাস্তববাদী কূটনীতির আলোকে দেশের রোহিঙ্গানীতিকে নতুন করে সাজানো।’
আইসিজি বলছে, বাংলাদেশে অবস্থিত ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফেরত পাঠানো ‘শরণার্থী সংকটের’ একমাত্র টেকসই সমাধান এটা গত ১০ বছর ধরে সরকার বলে আসছে। কিন্তু নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা বাস্তবায়িত না হওয়ায় এই সংকট সমাধানের সম্ভাবনা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান দেশটিকে এক বিস্তৃত গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত করায় এবং রাখাইন রাজ্য পুরোপুরি অরাষ্ট্রীয় জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর আলোচনাই এখন আর হচ্ছে না। অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা তহবিল কমতে থাকায় এবং আশ্রয়শিবিরগুলোর অবস্থার অবনতি রোহিঙ্গাদের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
আইসিজি মনে করে, বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্তে থাকা রোহিঙ্গাদের ‘উপেক্ষা করা’ একটি গুরুতর ভুল হবে। শিবিরগুলোর অবনতিশীল পরিস্থিতি শুধু সেখানকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগই বাড়াবে না; বরং ওই এলাকার বাংলাদেশিদের ওপর চাপ আরও গভীর করবে এবং সীমান্ত অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে তুলবে।
সংস্থাটি বলছে, বিগত দুই দশকের বেশিরভাগ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা সত্ত্বেও বিএনপি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার চক্র এবং বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে অবগত। অতীতে বিএনপি সরকারগুলো ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে এবং ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে পূর্ববর্তী শরণার্থী স্রোত সামাল দিয়েছিল, যখন উত্তর রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের কারণে লাখ লাখ মানুষ পালিয়ে এসেছিল। তবে এবারের পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার অনেক এলাকায় তার বৈধতা ও নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে আরাকান আর্মির জয়ের ফলে রাখাইনের রাজনৈতিক ভূদৃশ্য পাল্টে গেছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা দাতাদের ক্লান্তি গভীর হচ্ছে। বাংলাদেশিরাও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অগ্রগতির জন্য অধৈর্য হয়ে পড়ছে।
আইসিজি মনে করে, মূলত রাখাইন রাজ্যে প্রত্যাবর্তনের জন্য মিয়ানমারের শাসকদের নিরাপদ পরিবেশ তৈরির অপেক্ষায় থাকার ওপর নির্ভরশীলতা ইতিমধ্যেই নাজুক পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করার ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই বিএনপির ২০২৩ সালের ‘রোহিঙ্গা সংকট ও প্রত্যাবাসন কৌশলের’ ওপর ভিত্তি করে নতুন সরকারের উচিত প্রত্যাবাসনকে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে রাখার পাশাপাশি একটি আরও বাস্তবসম্মত অন্তর্র্বর্তীকালীন কৌশল গ্রহণ করা। এ কৌশলটি আশ্রয়শিবিরগুলোতে নিরাপত্তা ও সুশাসন শক্তিশালী করা, শরণার্থীদের আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করা এবং রাখাইনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি; অর্থাৎ আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত প্রশাসনের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালানোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে।