যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই দিন আগে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শেষ’ হয়ে গেছে। গতকাল শুক্রবার আবার তিনি বলেছেন, যুদ্ধবিরতি শেষ হলেও ইরানের অনুরোধে তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যেতে ওয়াশিংটন প্রস্তুত আছে। গতকাল সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি একথা বলেন।
ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে লিখেছেনÑ ‘ইরান আমাদের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছে। আমরা তাদের সেই অনুরোধে সাড়া দিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছি। তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তেহরানকে কোনো প্রকার লুকোছাপা ছাড়াই পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছেÑ দুই দেশের মধ্যকার পূর্ববর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন সম্পূর্ণভাবে শেষ!’
সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই দিন হামলা-পাল্টা হামলা চলার মধ্যে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চালু রাখার ব্যাপারে সক্রিয় হয়েছেন তাদের আন্তর্জাতিক মিত্ররা। এ লক্ষ্যে কাতারের একটি আলোচক দল এরই মধ্যে ইরানের রাজধানী তেহরানে পৌঁছেছে।
এদিকে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সংঘাতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে অনেকে। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী ট্যাংকার চলাচল বেড়েছে বলে জানিয়েছে জাহাজ ট্র্যাকিংয়ের সংস্থাগুলো। তাদের তথ্য অনুযায়ী, চীন, গ্রিস ও কাতারসহ কয়েকটি দেশের অন্তত পাঁচটি এলএনজি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করেছে।
চুক্তিতে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করার শর্ত থাকলেও গত বৃহস্পতিবার ও গতকাল শুক্রবার লেবাননে রাতভর হামল করেছে ইসরায়েল।
গত বুধবার তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি আর কার্যকর নেই। একই সঙ্গে তিনি ইরানি শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনা করে বলেন, ‘ওদের মধ্যে কিছু সমস্যা আছে। ওরা অসুস্থ। খারাপ মানুষ।’
ওই সময় তিনি এটাও বলেছিলেন, ইরানকে যদি এই সংকট থেকে বাঁচতে হয়, তবে তাদেরই আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে হবে এবং নতুন কিছু শর্ত মানতে হবে।
প্রসঙ্গত, পাকিস্তানের মধ্যস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত ১৭ জুন সমঝোতা স্মারক সই হয়। কিন্তু তার মাত্র কয়েক দিন পরই ট্রাম্প বলেন, তিনি এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর কোনোভাবেই বাড়াতে চান না।
এর মধ্যে চলতি সপ্তাহে দুই পক্ষের মধ্যে এই সংঘাত নতুন রূপ নেয়। ইরান পারস্য উপসাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এর জবাবে ওয়াশিংটন ইরানের মূল ভূখণ্ডের বুশেহর পারমাণবিক কেন্দ্রের পেরিমিটারসহ বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক বিমান হামলা ও বোমাবর্ষণ করে। এর পাল্টা জবাব হিসেবে ইরানও জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে।
সংঘাত সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সচল
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়া সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী ট্যাংকার চলাচল বেড়েছে। জাহাজ ট্র্যাকিংয়ের স্সংথাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চীন, গ্রিস ও কাতারসহ কয়েকটি দেশের অন্তত পাঁচটি এলএনজি ট্যাংকার প্রণালিতে প্রবেশ করেছে।
কেপলার ও এলএসইজি জানিয়েছে, গত দুই দিন ধরে চলা সংঘাতের মধ্যেই অন্তত পাঁচটি খালি এলএনজি ট্যাংকার প্রণালিতে প্রবেশ করেছে। এই জাহাজগুলোর মধ্যে আছে গ্রিক শিপিং কোম্পানি গ্যাসøগের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘গ্যাসøগ সাংহাই’ এবং কাতার এনার্জির সঙ্গে যুক্ত আল সামরিয়া আল দাফনা, আল গাত্তারা ও আল রায়ান।
জাপানের পরিবহনমন্ত্রী ইয়াসুশি কানেকো এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ৭ থেকে ৯ জুলাইয়ের মধ্যে প্রণালি পার হওয়া ছয়টি বড় অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারসহ টোকিওর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট ২২টি জাহাজ পারস্য উপসাগর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেছে।
এদিকে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও প্রণালি দিয়ে জাহাজ চালানো এবং ক্রুদের জীবন বিপন্ন করার অভিযোগে থাইল্যান্ডের একটি জাহাজ পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শুক্রবার মামলা হয়েছে। ‘ময়ূরী নারী’ নামের জাহাজটি গত মার্চ মাসে হরমুজ প্রণালিতে হামলার শিকার হয়।
হামলার সময় জাহাজে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন নিহত হন। বাকি ২০ জনকে প্রায় এক সপ্তাহ পর উদ্ধার করে থাইল্যান্ডে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে তিনজন শুক্রবার বাদী হয়ে মামলা করেছেন।
পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি এশিয়ার দেশগুলোর বিশেষ করে ভারত, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব দেশের নাগরিকরাই মূলত বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ক্রুর একটি বড় অংশ।