চাকরি ছেড়ে মাটির টানে সানোয়ার অ্যাগ্রো ফার্ম

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪২ এএম

রেস্টুরেন্টে বসে এক কাপ কফি খাচ্ছিলেন এক যুবক। বিল এলো ৫০ টাকা। সাধারণ এক কাপ কফির এত দাম দেখে তার মাথায় চিন্তা এলো দেশে কি কফি চাষ সম্ভব নয়? যেই ভাবা, সেই কাজ। বান্দরবান থেকে চারা এনে নিজের জমিতে বুনে দিলেন। আজ তার বাগানে থোকায় থোকায় ঝুলছে কফি। শুধু কফি নয়, প্রচলিত সমাজব্যবস্থা আর তথাকথিত ‘চাকরি’র মানসিকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের এক রূপকথার সাম্রাজ্য। তিনি সানোয়ার হোসেন। টাঙ্গাইলের মধুপুরের মহিষমারা গ্রামে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘সানোয়ার অ্যাগ্রো ফার্ম’। একসময় হাইস্কুলের ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন তিনি। আজ তিনি একাধারে সফল পরিবেশবান্ধব চাষি, কলেজের প্রতিষ্ঠাতা এবং এক অনন্য জীবন দর্শনের কারিগর।

‘পাগলে’র তকমা ও সমাজের উপহাস

গল্পটা শুরু হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে সানোয়ার সাহেব একটি হাইস্কুলে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু তিন বছর পর তার মনে এক গভীর উপলব্ধি আসে। তিনি দেখলেন, ছাত্ররা পড়াশোনা শেষ করে শুধু একটা চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে। গোলামির এই চেইন ভাঙতে তিনি ঠা-া মাথায় শিক্ষকতার চাকরিটা ছেড়ে দেন। চাকরি ছাড়ার পর চারপাশের মানুষ তাকে ‘পাগল’ বলতে শুরু করল। বাবা ভাবলেন ছেলেটা নষ্ট হয়ে গেছে। এমনকি কৃষিকাজ করেন বলে বিয়ে করতেও তাকে চরম সামাজিক বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। তবে দমে যাননি তিনি। তার স্ত্রী তাকে সাহস দিয়ে বলেছিলেন, ‘ডাল-ভাত খেয়ে থাকব, তাও আপনার কাজে বাধা দেব না।’

ইউরোপের লোভনীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে মাটির টানে

সানোয়ার সাহেবের যোগ্যতা ছিল ইউরোপের যেকোনো দেশে সেটেল হওয়ার। কিন্তু বহুজাতিক জীবনের সেই লোভনীয় হাতছানি তিনি দুহাতে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘ওখানে গেলে আমি মানুষ থাকতাম না, মেশিন হয়ে যেতাম। আমি মাটিতে মিশে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চেয়েছি।’

এক কাজে তিন কাজ

সানোয়ারের জাদুকরী কৃষি চক্র: মধুপুরের মহিষমারায় তার এই ফার্মটি সম্পূর্ণ বৈচিত্র্যময় এবং পরিবেশবান্ধব। তিনি এক কাজে কমপক্ষে তিনটি লাভ বের করেন।

শ্রমিক ছাড়া বাগান পরিষ্কার : তিনি নিজেই প্রতিদিন বাগান থেকে ঘাস কাটেন। এতে তার শারীরিক ব্যায়াম হয়, শ্রমিকের মজুরি বাঁচে এবং এই বিষমুক্ত ঘাস সরাসরি চলে যায় তার গরুর পেটে।

গোবর থেকে গ্যাস ও সার : খামারের গরুর গোবর দিয়ে তিনি তৈরি করেছেন বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট। এই গ্যাস দিয়ে প্রতিদিন ১০-১২ জনের রান্না চলে। আবার বায়োগ্যাসের অবশিষ্ট অংশ শুকিয়ে তৈরি হয় চমৎকার জৈব সার। ফলে জমিতে কোনো রাসায়নিক সার কিনতে হয় না। কফি ও আনারস চাষের পাশাপাশি নিজের পুকুরে শিং, মাগুর ও তেলাপিয়া মাছের চাষও করেন তিনি। বাজার থেকে তাকে কোনো খাবারই কিনতে হয় না।

‘উৎপাদনমুখী শিক্ষা’র জনক

সানোয়ার সাহেব শুধু নিজেই বদলাননি, সমাজকে বদলানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। নিজের পৈতৃক ১৫০ শতাংশ জমি দান করে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি কলেজ। সেখানে তিনি এবং কলেজের শিক্ষকরা মিলে চালু করেছেন এক নতুন ধারণার শিক্ষা ‘উৎপাদনমুখী শিক্ষা’। তিনি কলেজের মাঠে শিক্ষার্থীদের প্র্যাকটিকেলি কৌশলগত চাষাবাদ শেখান। সানোয়ার সাহেবের স্পষ্ট দর্শন ‘যে হাত দিয়ে ভাত খাও, সেই হাতে যদি শক্তি থাকে, তবে ওই হাত দিয়ে ভাত উৎপাদন করতে শিখতে হবে।’

আজ সানোয়ার সাহেব এমন এক জীবনযাপন করছেন, যা অনেকের কাছে শুধুই স্বপ্ন। প্রকৃতির সান্নিধ্যে, মাটির টানে নিজের ফার্মে কাজ করার মধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছেন পরম স্বাধীনতা ও মানসিক শান্তি। সানোয়ার সাহেব আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন পেশা কখনো ছোট নয়, স্বাধীনভাবে মাটির বুক চিরে কিছু উৎপাদন করার মাঝেই লুকিয়ে আছে জীবনের আসল সার্থকতা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত