থানায় মব দেশের জন্য অশনিসংকেত

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ০৬:২৯ এএম

বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় হামলা, ভাঙচুর ও দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের আহত করার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। সেই সঙ্গে ‘মব সংস্কৃতি’ রোধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

গতকাল শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, গুজবকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এ ধরনের হামলা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যই হুমকি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিচার প্রক্রিয়া ও জননিরাপত্তার ওপর গুরুতর আঘাত।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ৮ জুলাই সন্ধ্যায় আগৈলঝাড়া থানার পুলিশ বাকাল ইউনিয়নের ফুল্লশ্রী গ্রামের বাসিন্দা চুরির মামলার আসামি রিয়াজ ফকিরকে (২৬) গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসে। তার বিরুদ্ধে একটি মাদকসংক্রান্ত মামলাও রয়েছে। গ্রেপ্তার রিয়াজ মাদকের প্রভাবে ছিলেন এবং থানা হাজতে থাকাকালে নিজেই নিজের মাথায় আঘাত করে আহত হন। পরে তাকে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরদিন ৯ জুলাই দুপুরে রিয়াজের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে একদল ব্যক্তি থানায় হামলা, ভাঙচুর ও দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ চালায়।

পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন বলছে, অসুস্থ আসামির চিকিৎসার ব্যবস্থা করে পুলিশ আইনগত ও মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। এরপরও গুজবের ভিত্তিতে সংঘবদ্ধ হামলা চালানো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য অশনিসংকেত। এ ধরনের ‘মব সংস্কৃতি’ পুলিশের মনোবল দুর্বল করার অপচেষ্টা এবং এর মাধ্যমে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার চেষ্টা করতে পারে। জনগণের প্রতি গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার, আইনকে শ্রদ্ধা করার এবং যে কোনো অভিযোগ বা অসন্তোষ আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়ে হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয় বিবৃতিতে।

এ বিষয়ে বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। মামলা হয়েছে, তদন্ত চলছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।’

হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার ১৮ : আসামির মৃত্যুর গুজবকে কেন্দ্র করে আগৈলঝাড়া থানায় হামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার রাতভর অভিযান চালিয়ে ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনায় জড়িত অন্যদেরও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে শনাক্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ওই ঘটনায় থানায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার আগৈলঝাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মাদ মাসুদ খান এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

ওসি বলেন, হামলার পর থেকেই থানায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। রাতভর অভিযান চালিয়ে জড়িত ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদেরও আটকের চেষ্টা চলছে। হামলায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় এনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।

জানা গেছে, গত বুধবার সন্ধ্যায় উপজেলার বাকাল ইউনিয়নের ফুল্লশ্রী গ্রামের বাসিন্দা রিয়াজ ফকির একটি চুরির মামলায় গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধে একটি মাদকসংক্রান্ত মামলাও রয়েছে। থানা হাজতে থাকা অবস্থায় তিনি মাথায় আঘাত পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে রাত ১১টার দিকে তাকে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য গভীর রাতে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে রিয়াজ ফকিরের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে তার স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে শতাধিক মানুষ মিছিল নিয়ে থানার সামনে জড়ো হয়। একপর্যায়ে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ডিউটি অফিসারসহ ছয়জন পুলিশ সদস্য এবং অন্তত ছয়জন বিক্ষোভকারী আহত হন। গুরুতর আহত এএসআই আ. হালিমকে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

রিয়াজ ফকিরের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক সাদিক খান বলেন, ‘আঘাতটা অন্য কেউ করেছে, নাকি তিনি নিজেই করেছেন; এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর চিকিৎসা ও পরবর্তী মূল্যায়ন এগোবে।’

এদিকে রিয়াজ ফকিরের পরিবার আগের মতোই দাবি করে আসছে, তাকে বিনা কারণে আটক করে মারধর করা হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন স্বজনরা। ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং রিয়াজ ফকিরের আঘাতের উৎস নির্ধারণে পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি চিকিৎসাসংক্রান্ত পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত