শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দ্বিতীয় দফায় আলটিমেটাম দিয়েছেন আন্দোলনরত এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। এ দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড়ে ব্লকেড কর্মসূচি পালন করা হবে। পরে সেখান থেকে সচিবালয়ের উদ্দেশে কর্মসূচি নিয়ে এগোবেন শিক্ষার্থীরা। এ ঘোষণা দিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় শাহবাগের অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন তারা।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা গ্রহণ, প্রশ্নপত্রে ত্রুটি এবং পরীক্ষাসংক্রান্ত নানা অনিয়মের প্রতিবাদে ঘোষিত ‘লংমার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচি ঘিরে বুধবার দিনভর রাজধানীতে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও মিছিল করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। সায়েন্সল্যাব ও নীলক্ষেত থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশে লংমার্চ করে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ভবনের সামনে পুলিশি ব্যারিকেডের মুখে পড়েন। পরে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থানের পর শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন তারা।
এদিকে বিকেলে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি থেকে সরে এসে ছয় দফা দাবি নিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সচিবালয়ে প্রবেশ করলেও সন্ধ্যায় সে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকেন তারা।
এদিকে এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে সরকারের ৫ উদ্যোগের কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিকূল আবহাওয়া বা অনিবার্য কারণে যারা চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার কোনো বিষয়ে অংশগ্রহণ করতে পারেননি, তারা আবারও অংশ নিতে পারবেন। এসব পরীক্ষার্থী চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ইতিমধ্যে স্থগিত হওয়া সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অভিন্ন প্রশ্নপত্রে, একই তারিখ ও সময়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন। গত বুধবারও তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকায় এমন প্রেক্ষাপটে ফেসবুকে পোস্টে মাহদী আমিন এ তথ্য জানান।
শাহবাগে অবস্থানকালে আন্দোলনকারী জুনায়েদ বলেন, ‘আজ (বুধবার) রাত ১০টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। যদি এই সময়ের মধ্যে তিনি পদত্যাগ না করেন, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় সায়েন্সল্যাব মোড়ে ব্লকেড কর্মসূচি চলবে। পরে সেখান থেকে সচিবালয়ে যাবে শিক্ষার্থীরা।’ তার এ ঘোষণার পর আন্দোলনকারীরা শাহবাগ ছেড়ে চলে যান।
শতাধিক শিক্ষার্থীর আন্দোলনে ভোগান্তিতে লাখো নগরবাসী : ‘দামপাড়া থেকে যাত্রী নিয়ে মুরাদপুর যাচ্ছিলাম। দুই নম্বর গেট এসে অবরোধের কবলে পড়েছি। গাড়ি এদিকেও যেতে দিচ্ছে না, ওদিকেও যেতে দিচ্ছে না। যাত্রীরা ভাড়া না দিয়ে চলে গেছে। এই অল্প কয়েকজনের অবরোধের কারণে আমরা আটকা পড়ছি। এসব আন্দোলন মানে গরিবের পেটে লাথি মারা।’ কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রাম নগরীর সিএনজি অটোরিকশাচালক মো. বারেক। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধের কবলে পড়েছেন তিনি। বারেক মিয়ার মতো একই অবস্থা ১০ নম্বর রুটের বাসচালক মো. ইলিয়াসেরও। তিনিও দুই নম্বর গেট এলাকায় অবরোধের কারণে যানজটে আটকা পড়েন। তিনি বলেন, আমি অসুস্থ মানুষ। এই ট্রিপের যাত্রী নামিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা। আন্দোলনকারীদের কত অনুনয়-বিনয় করে একটু যেতে দিতে বললাম, তারা গাড়ি আটকে রাখল। ডাক্তারের কাছে যাব বলেছি, তাও শুনল না।
বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের একদফা দাবিতে নগরীর দুই নম্বর গেট এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন নিজেদের এইচএসসি পরীক্ষার্থী পরিচয় দেওয়া শতাধিক আন্দোলনকারী। এতে বন্ধ হয়ে যায় সড়কের দুই পাশের যান চলাচল। চরম ভোগান্তিতে পড়েন ইলিয়াস, বারেকের মতো লাখো নগরবাসী। অফিস ছুটির সময় অবরোধ শুরু হওয়ায় ভোগান্তি বেড়ে যায় আরও কয়েক গুণ। এ সময় বাসাবাড়িগামী লোকজনকে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়।
ভুক্তভোগী পথচারীদের প্রশ্ন চট্টগ্রামে তো এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি, তাহলে এখানে কেন এভাবে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন? বেসরকারি চাকরিজীবী আশরাফুল আমিন বলেন, আমাকে জরুরিভাবে মুরাদপুর একটা কাজে যাওয়া লাগত। আমি অবরোধে আটকা পড়েছি। গুটিকয়েক মানুষের কারণে আমরা কেন ভুক্তভোগী হব?
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, দুপুর আড়াইটা থেকে নগরীর দুই নম্বর গেট এলাকায় সড়কে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সেøাগান দিতে থাকেন। পরে ৪টার দিকে একটি মিছিল নিয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের দিকে অগ্রসর হয় শিক্ষার্থীরা। এতে সড়কের চারপাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকেল ৬টা পর্যন্ত এ অবরোধ চলচিল। আন্দোলনকারীরা জানান, মঙ্গলবার তাদের তিন দফা দাবি থাকলেও আজ বুধবার তাদের দাবি একটা। তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চান।
আন্দোলনের অংশ হিসেবে নগরীর দুই নম্বর গেট থেকে মিছিল নিয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের দিকে যাওয়ার সময় সড়কের এক পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় একটি সিএনজি অটোরিকশা উল্টো পথে মুরাদপুরের দিকে যাওয়ার সময় ৪ নম্বর রুটের একটি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। চালক ও একজন যাত্রী আহত হন।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ কেন চান? জানেন না কেউ : শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ কেন চাচ্ছেন এমন প্রশ্ন করা হয় আন্দোলনরত অন্তত ১০ জনকে। তাদের মধ্যে কেউ জানালেন কারণ জানেন না। আবার কেউ বললেন শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের ফার্মের মুরগি বলেছেন। আবার কেউ বললেন শিক্ষামন্ত্রী অভিন্ন প্রশ্নপত্রের কথা বলে চট্টগ্রাম বাদে বাকি সব বোর্ডে পরীক্ষা নিচ্ছেন, এতে চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষার্থীরা বঞ্চিত হবেন।
এর আগে মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে দিনভর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে তারা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের গেট ভেঙে নিয়ে যান। এ সময় তারা শিক্ষা বোর্ড ভবনেও তালা ঝুলিয়ে দেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম ছাড়াও ভোলা প্রেস ক্লাবের সামনে, নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায়, সিরাজগঞ্জ শহরের ইলিয়ট ব্রিজ এলাকায়, পিরোজপুর সিও অফিস মোড়ে বিক্ষোভ মিছিল এবং মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা।