বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। প্রতি বছর বর্ষা আসে, প্রকৃতিকে সজীব করে তোলে, কৃষকের মুখে হাসি ফোটায়। কিন্তু কখনো অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি ভয়াবহ বন্যার রূপ নিয়ে মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। ঘরবাড়ি ভেসে যায়, ফসলের মাঠ পানিতে তলিয়ে যায়, গবাদিপশু মারা যায়, বিশুদ্ধ পানির সংকট হয়, পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং অসংখ্য মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। এ সময় আমাদের দায়িত্ব হলো, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সর্বাত্মকভাবে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
দুর্যোগ কখনো মানুষের জন্য পরীক্ষা, কখনো সতর্কবার্তা, আবার কখনো আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসার আহ্বান। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা ১৫৫)
তিনি আরও বলেন, ‘স্থলে ও জলে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে মানুষের কৃতকর্মের কারণে, যাতে আল্লাহ তাদের তাদের কিছু কর্মের ফল আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।’ (সুরা রুম ৪১)
এসব আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয়, দুর্যোগের সময় হতাশ না হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, তওবা-ইস্তেগফার করা এবং মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করা মুমিনের কর্তব্য।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানবসেবাকে ইমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তার বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।’ (সহিহ মুসলিম ২৬৯৯)
অতএব বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, কাপড়, আশ্রয় ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা নিঃসন্দেহে মহৎ ইবাদত।
বন্যার সময়ে শুধু ত্রাণ বিতরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। পরিকল্পিতভাবে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
আমাদের করণীয় হলো, শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ। বিশুদ্ধ পানি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও স্যালাইন সরবরাহ। শিশু খাদ্য, দুধ ও গর্ভবতী নারীদের জন্য বিশেষ সহায়তা। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা। গবাদিপশুর খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও এতিমদের অগ্রাধিকার দেওয়া। ত্রাণ বিতরণে কোনো দলীয়, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বৈষম্য না করা।
আমাদের নিজেদের অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে তাদের পাশে দাঁড়াব। এতে আমাদের পরকালের পাথেয় সমৃদ্ধ হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘অর্ধেক খেজুর দান করেও জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে রক্ষা করো।’ (সহিহ বুখারি ১৪১৭)
আর ইসলামে অর্থ দানই একমাত্র সদকা নয়। একজন চিকিৎসকের চিকিৎসা, একজন প্রকৌশলীর পরামর্শ, একজন শিক্ষককের শিক্ষা, একজন যুবকের স্বেচ্ছাশ্রম, এমনকি হাসিমুখে মানুষের মনোবল বাড়িয়ে দেওয়াও সদকার অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক ভালো কাজই সদকা।’ (সহিহ বুখারি ৬০২১)
ইসলাম মানুষের মর্যাদা রক্ষার শিক্ষা দেয়। তাই ত্রাণ বিতরণের সময় ছবি তুলে লোক দেখানো, অপমান করা বা দানকে প্রচারের মাধ্যম বানানো উচিত নয়। আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদাররা! খোঁটা ও কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানকে নষ্ট করো না।’ (সুরা বাকারা ২৬৪)