আইসিডিডিআরবি

দেশে হামের জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) একটি অনুসন্ধানের প্রাথমিক ফলাফলে বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবে ভাইরাসের এমন কোনো জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা বর্তমানে ব্যবহৃত টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যেতে পারে।

রবিবার (২ আগস্ট) আইসিডিডিআরর জনসংযোগ কর্মকর্তা এ কে এম তারিফুল ইসলাম খান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। 

এতে বলা হয়, অনুসন্ধানে অন্তর্ভুক্ত সন্দেহভাজন রোগীদের মধ্যে সুপারিশকৃত দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার হার তুলনামূলকভাবে কম ছিল। জিনগত বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি বি৩ জিনোটাইপ ধরনের, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের হাম প্রাদুর্ভাবেও শনাক্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৭৬৩ জন সন্দেহভাজন এবং পরীক্ষাগারে নিশ্চিত ১৫ হাজার ২৭২ হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে হামজনিত বলে সন্দেহ করা ৭২১টি এবং পরীক্ষায় ৯৫টি নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে।

আইসিডিডিআর,বি এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে সন্দেহভাজন হাম নিয়ে ভর্তি হওয়া ১৪ বছরের কম বয়সী ৩৪১ শিশুকে নিয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। পরীক্ষাগারে ৩২৪ শিশুর হাম নিশ্চিত হয়। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ছিল তিন থেকে আট মাস বয়সী শিশুরা। এই বয়সী ১৪১ শিশুর মধ্যে ১৩৭ জনের হাম ধরা পড়ে।

গবেষকেরা বয়স ও টিকা নেওয়ার ভিত্তিতে ৩৪১ শিশুকে চারটি দলে ভাগ করেন। নিয়মিত টিকা পাওয়ার বয়স হয়নি এমন ৯ মাসের কম বয়সী ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২ জনের, অর্থাৎ ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়।  টিকা নেওয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া এমন ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জনের অর্থাৎ ৯৭ শতাংশের পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়। এক ডোজ টিকা পাওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ বা ৯২ শতাংশ এবং সুপারিশকৃত দুই ডোজ টিকা পাওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জন বা ৭৬ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়।

এর অর্থ এই নয় যে পূর্ণ দুই ডোজ টিকা পাওয়া সব শিশুর ৭৬ শতাংশই হাম আক্রান্ত হচ্ছে।

অনুসন্ধানে অংশ নেওয়া সব শিশুই সন্দেহভাজন হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। ৭৬ শতাংশের হিসাবটি শুধু এই হাসপাতালভিত্তিক অনুসন্ধানে অন্তর্ভুক্ত দুই ডোজ টিকা পাওয়া ২১ সন্দেহভাজন রোগীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। টিকার কোনো সুরক্ষা না থাকা শিশুদের মধ্যে পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার হার প্রায় ৯৭ শতাংশ থেকে কমে দুই ডোজ পাওয়া শিশুদের মধ্যে ৭৬ শতাংশ হওয়া, টিকা সুরক্ষা দিচ্ছে এমন ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। হামে আক্রান্ত হয়নি এমন শিশুরা এই অনুসন্ধানে অন্তর্ভূক্ত ছিল না। তাই এই তথ্য থেকে জনসংখ্যার মধ্যে টিকার সামগ্রিক কার্যকারিতার হার নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এই বিষয়ে আরও বড় পরিসরের গবেষণা প্রয়োজন।

গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব ভাইরাসই বি৩ উপশাখার অন্তর্ভুক্ত (সাবক্লেড) এবং অন্যান্য দেশে শনাক্ত হওয়া বি৩ ভাইরাসের সঙ্গে এগুলোর মিল রয়েছে। গবেষকেরা ভাইরাসের এইচ প্রোটিনের অ্যান্টিবডি শনাক্ত করতে পারে এমন অংশ বা এপিটোপ অঞ্চলে চারটি পরিবর্তন বা মিউটেশনও শনাক্ত করেছেন। এইচ প্রোটিন ভাইরাসকে মানুষের কোষে প্রবেশ করতে সহায়তা করে এবং টিকার মাধ্যমে তৈরি অ্যান্টিবডির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এটি। শনাক্ত হওয়া কয়েকটি মিউটেশন এর আগেও অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়া হাম ভাইরাসে পাওয়া গেছে। তবে এসব মিউটেশন থাকার অর্থ এই নয় যে ভাইরাসটি প্রতিরোধে প্রচলিত টিকা আর কাজ করছেনা।

হাম ভাইরাস এখনো একটি একক সেরোটাইপ হিসেবে রয়েছে এবং টিকার মাধ্যমে তৈরি অ্যান্টিবডি ভাইরাসটির একাধিক স্থান শনাক্ত করতে পারে। এসব মিউটেশন অ্যান্টিবডির সুরক্ষায় পরিমাপযোগ্য কোনো প্রভাব ফেলছে কি না, তা জানতে আরও পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন।

গবেষণার ফলাফল কম বয়সী শিশুদের একটি বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ সময়ের কথাও তুলে ধরেছে। বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ৯ মাস এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে। প্রথম ডোজ টিকা পাওয়ার আগে শিশুরা আংশিকভাবে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি এবং ব্যাপক টিকাদানের ফলে সমাজে তৈরি সামষ্টিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল থাকে।

আইসিডিডিআর,বি-এর আগের একটি গবেষণায় জন্মের পর থেকে অনুসরণ করা ১৬ জন মা ও শিশুর সংরক্ষিত নমুনার প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসেই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া হামের অ্যান্টিবডি দ্রুত কমে যায়। মূল্যায়ন করা এই শিশুদের তিন থেকে আট মাস বয়সে কোনো সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি শনাক্ত হয়নি। তবে এই বিশ্লেষণে মাত্র ১৬ জন শিশু অন্তর্ভুক্ত ছিল। আরও বেশি শিশুর নমুনা ব্যবহার করে বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন।

গবেষকেরা জোর দিয়ে বলেছেন, অভিভাবকদের টিকা দিতে দেরি করা বা টিকা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। শিশুর বয়স অনুযায়ী প্রাপ্য হাম-রুবেলা টিকার সব ডোজ নিশ্চিত করতে হবে। প্রাদুর্ভাব চলাকালে টিকাদান বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা অনুসরণ করতে অভিভাবক ও পরিচর্যাকারীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত