ডিলারের নিয়ন্ত্রণে সারের খুচরা বাজার

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৫ এএম

কৃষকের কাছে নিরবচ্ছিন্ন ও সুষ্ঠুভাবে সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার ডিলার সংরক্ষণ সংক্রান্ত নীতিমালা ২০২৫ (সংশোধিত)’ প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এতে একই পরিবারে একাধিক ডিলারশিপের লাইসেন্স থাকতে পারবে না বলে বিধান করা হয়েছে। একই সঙ্গে সারা দেশে খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে সার বিক্রি বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। তবে প্রতি ডিলার দুইজন করে বিক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগ দিতে পারবেন। প্রতিটি ইউনিয়নে একজন ডিলারের পরিবর্তে থাকবেন তিনজন ডিলার।

জানা গেছে, গত ৯ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অনুবিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ-সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫ (সংশোধিত) বাস্তবানের নির্দেশ প্রদান করা হয়। একই দিনে চূড়ান্ত নীতিমালাটিও অনুমোদন করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। তবে সরকারের এ উদ্যোগককে স্বাগত জানালেও খাত সংশ্লিষ্টরা পুরো বিষয়টি অগোছালো মনে করছেন।

সংশোধিত নীতিমালায় বলা হয়েছে এখন থেকে একক নীতিমালার আওতায় সার বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এর মধ্য দিয়ে ইউনিয়ন, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনে সার ডিলার ইউনিটের সংখ্যা নির্দিষ্ট করতে বলা হয়েছে। যেখানে সারের ডিলারশিপ গ্রহণের ক্ষেত্রে একই পরিবারের একাধিক লাইসেন্সধারী থাকতে পারবেন না।

এ ছাড়া সারা দেশের ডিলারদের পাশাপাশি প্রায় ৪০ হাজারের বেশি খুচরা বিক্রেতা বিভিন্ন ধরনের সার বিক্রি করতেন। তবে নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে অনিয়ন্ত্রিত সার ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা ব্যবস্থা রহিত করা হয়েছে। এর বিপরীতে বিক্রয় প্রতিনিধি ব্যবস্থা চালু করতে বলা হয়েছে। এই বিক্রয় প্রতিনিধি মনোনীত করবে ডিলার নিজেই।

নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি ইউনিয়নে তিনটি, পৌরসভায় তিনটি এবং সিটি করপোরেশনের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সুপারিশের ভিত্তিতে সার ডিলার-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি নির্ধারিত সংখ্যক ডিলার ইউনিটের সুপারিশ করবে।

বর্তমানে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) তালিকাভুক্ত ৫ হাজার ৮০০ জন ডিলার এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) তালিকাভুক্ত ৫ হাজার ২০০ জন ডিলার রয়েছেন। তাদের অধীনে প্রায় ৪০ হাজারের বেশি খুচরা বিক্রেতা কাজ করছেন। বাংলাদেশে প্রতি বছর কৃষিকাজে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন সার ব্যবহার করা হয়।

জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালে ডিলার নিয়োগ নীতিমালাটি জারি করা হয়। জরির পর থেকেই সারা দেশের ডিলাররা নীতিমালা সংশোধনে চাপ দিতে থাকেন। তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটি সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় এটি সংশোধন করা হলো। তবে নীতিমালা জারির সময়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, নীতিমালা জারির পূর্বেই একই পরিবারের একাধিক ডিলারশিপ লাইসেন্স বাতিল করবেন। কিন্তু তিনি লোক দেখানো কিছু ডিলারশিপ বাতিল করে নতুন ডিলার নিয়োগের জন্য ক্ষেত্র তৈরি করেছেন। কারণ আগে ইউনিয়নে যেখানে একজন করে ডিলার ছিল, এখন সেখানে তিনজন করে ডিলার নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সারা দেশে এখনো অনেক পরিবারেই একাধিক ডিলারশিপ রয়েছে। কিন্তু সেগুলো বাতিল না করে পাশর্^বর্তী ইউনিয়নে স্থানান্তর করার গোপন নির্দেশ দিয়েছিলেন সেই সচিব। কৃষি মন্ত্রণালয় চলতি বছরেই পুরনো নীতির আওতায় ডিলারশিপের আবেদন গ্রহণ করে। সারা দেশ থেকে নেওয়া আবেদন চূড়ান্ত করার আগেই চলতি মাসের দুই তারিখ পুনরায় ডিলারশিপের আবেদন চেয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রদান করে।

অর্থাৎ, সংশোধিত নীতিমালা জারির এক সপ্তাহ আগেই এই নীতিমালার আওতায় ডিলার নিয়োগের আবেদনের বিজ্ঞপ্তি প্রদান করে কৃষি মন্ত্রণালয়। অথচ নীতিমালায় একই পরিবারের একাধিক লাইসেন্স বাতিলের কথা বলা থাকলেও সে বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেই কৃষি মন্ত্রণালয়ের।

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে ইউনিয়নে একজন করে ডিলার ছিল, এখন সেখানে তিনজন ডিলার থাকবে। তার সঙ্গে ছয়জন থাকবে বিক্রয় প্রতিনিধি। গুদাম থাকবে, কর্মচারী বাড়বে আর কমবে বিক্রি। তাহলে পুরনো কমিশনে কীভাবে ডিলাররা ব্যবসা করবেন।’

তিনি বলেন, ‘মৌসুমের মধ্যে এই ধরনের সিদ্ধান্ত অরাজকতা তৈরি করবে, যা সার সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। এ জন্য সরকারের এই সিদ্ধান্ত দ্রুত বিবেচনা করা উচিত, যাতে করে সরবরাহ পরিস্থিতিতে কোনো জটিলতা তৈরি না হয়।’

তিনি বলেন, ‘সরকার যদি চায় এক পরিবারের একাধিক ডিলার বাতিল করবে, সেটাও করতে পারে। তবে এটা একটি গোছালো পদ্ধতিতে করতে হবে।   

এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ডিলার নিয়োগের পদ্ধতি নিয়েও খাত সংশ্লিষ্টদের আপত্তি রয়েছে বলে জানা গেছে। বেশি দামে সার বিক্রি, এক স্থানের বরাদ্দ অন্য স্থানে স্থানান্তর করাসহ নানা অপরাধ করলেও সরকারের পক্ষ থেকে ডিলারশিপ বাতিল না করে শুধু জরিমানার মাধ্যমেই দায় সারতে দেখা যাচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত