বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সক্ষমতা সমৃদ্ধকরণে মতবিনিময়

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৪ পিএম

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি বিজ্ঞানী সংঘ (বায়েসা)-র “আয়োজনে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক সক্ষমতা সমৃদ্ধকরণ: বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়” শীর্ষক একটি মতবিনিময় সভা ১৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখ দুপুর ২টায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বাপশক)-এর প্রধান কার্যালয়ের ড. আনোয়ার হোসেন অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, এমপি।

সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। এ ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম. মঈনুল ইসলাম বিশেষ অতিথি হিসেবে সভায় উপস্থিত ছিলেন। 

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সাভার-এর মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি বিজ্ঞানী সংঘ (বায়েসা)-এর সভাপতি ড. এ. এস. এম. সাইফুল্লাহ। আলোচ্য বিষয়ের ওপর বিশেষজ্ঞ হিসেবে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট পারমাণবিক চুল্লি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী আলী জুলকারনাইন, প্রাক্তন চেয়ারম্যান ডা. মো. সানোয়ার হোসেন, প্রাক্তন পরিচালক, জীববিজ্ঞান বিভাগ, ডা. ফারিয়া নাসরিন, এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সদস্য (পরিকল্পনা) মো. হাসিনুর রহমান। সভায় প্রতিপাদ্য বিষয়ের ওপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের সভাপতি ড. এ. এস. এম. সাইফুল্লাহ।  

ড. সাইফুল্লাহ মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন-নির্ভর উন্নয়নে পরমাণু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সক্ষমতা। কৃষি, চিকিৎসা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্প, পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ দেশের টেকসই উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের ৩১ দফার ৩০ নম্বর দফায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের গবেষণা কার্যক্রমের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক সক্ষমতা সমৃদ্ধ করার অঙ্গীকার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বাপশক-কে আরও শক্তিশালী, আধুনিক, দক্ষ ও ভবিষ্যতমুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা প্রয়োজন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন দেশের পরমাণু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা, উদ্ভাবন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও বিশেষায়িত প্রযুক্তিগত সেবার একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। কৃষি, খাদ্য ও স্বাস্থ্য, শিল্প, পানি সম্পদ, পরিবেশ, খনিজ সম্পদ, নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। সাভারের পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা রিঅ্যাক্টর, Cyclotron, Tandem Accelerator, Gamma Irradiator, LINAC, Tissue Bank, Isotope Hydrology, Semiconductor ও উন্নত গবেষণাগারসমূহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো। স্বাস্থ্যখাতে নিউক্লিয়ার মেডিসিন, ক্যান্সার চিকিৎসা, রোগ নির্ণয় ও রেডিওআইসোটোপ উৎপাদনে বাপশক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় উন্নত ও জলবায়ু-সহনশীল ফসল উদ্ভাবন, খাদ্য সংরক্ষণ ও বিকিরণ প্রয়োগেও কমিশনের অবদান উল্লেখযোগ্য।

মূল প্রবন্ধে কমিশনের বর্তমান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয় যে, বাপশকের বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো ১৯৮৫ সালের হওয়ায় বর্তমান বহুমাত্রিক কার্যক্রম ও জনবলের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নেই। দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও বিশেষায়িত দক্ষতা প্রয়োজন হলেও বিজ্ঞানীদের জন্য আধুনিক Scientific Career Track, যথাযথ পদোন্নতি ও পেশাগত স্বীকৃতির ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া পদ ও গ্রেড অবনমন, গ্রেড বৈষম্য এবং জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মেধাবী জনবল ধরে রাখা ও নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। ফলে বাপশকের সাংগঠনিক কাঠামো, জনবল ও ক্যারিয়ার ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন জরুরি। 

জাতীয় পারমাণবিক কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় করণীয় বিষয়ে ড. সাইফুল্লাহ আরও উল্লেখ করেন যে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর সঙ্গে বাংলাদেশের পারমাণবিক কর্মসূচি নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করবে। এ প্রেক্ষাপটে বাপশকের Owner’s Engineering Capability, Independent Technical Assessment ও Strategic Technical Oversight সক্ষমতা শক্তিশালী করা জরুরি। ভবিষ্যৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, SMR, জ্বালানি চক্র ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বাপশককে জাতীয় Technical Support Organization (TSO) হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিনিয়োগ।

অগ্রাধিকারভিত্তিক করনীয় বিষয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, দেশের দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক কর্মসূচি ও প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা নিশ্চিত করতে বাপশকের যুগোপযোগী সাংগঠনিক কাঠামো, আধুনিক Scientific Career Track ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন জরুরি। একই সঙ্গে Owner’s Engineering Capability, Independent Technical Assessment এবং National Technical Support Organization (TSO) হিসেবে বাপশকের সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। গবেষণা অবকাঠামো টেকসই আধুনিকায়ন, জাতীয় মানবসম্পদ ও নিউক্লিয়ার ইনোভেশন রোডম্যাপ প্রণয়ন, পারমাণবিক নিরাপত্তা ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প-গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাপশককে একটি আধুনিক, দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন National Nuclear Science, Technology and Innovation Organization হিসেবে গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। 

ড. সাইফুল্লাহ তার বক্তব্যের উপসংহারে বলেন যে, বাংলাদেশের পারমাণবিক কর্মসূচি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরপর্বে রয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি নিউক্লিয়ার মেডিসিন, রেডিওআইসোটোপ, কৃষি, খাদ্য, শিল্প, পরিবেশ, আইসোটোপ হাইড্রোলজি, সেমিকন্ডাক্টর ও উচ্চপ্রযুক্তি গবেষণায় বাপশকের ভূমিকা ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। এ বাস্তবতায় যুগোপযোগী সাংগঠনিক কাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ, আধুনিক গবেষণা অবকাঠামো, বিজ্ঞানীদের আকর্ষণীয় ক্যারিয়ার ব্যবস্থা এবং Owner’s Engineering ও Technical Support সক্ষমতা গড়ে তোলা অপরিহার্য। বর্তমান সরকারের রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের ৩১ দফার ৩০ নম্বর দফার আলোকে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ পরমাণু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সক্ষমতার পথে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে পারবে বলে আশা ব্যক্ত করেন।

আলোচনা সভায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, জনকল্যাণে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের বিষয়ে কমিশনের বিজ্ঞানীদের নিবেদিত প্রাণভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। গবেষণার নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি করার বিষয়ে গুরুত্বারূপ করেন এবং সুনির্দিষ্ট আকারে প্রস্তাব প্রেরণে করলে মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সভার বিশেষ আথিথি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, মাননীয় প্রধান মন্ত্রী দেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানী চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন এবং পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনে এসএমআর প্রযুক্তির ব্যবহার বিষয়েও চিন্তা-ভাবনা করছেন। দেশের মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের যেকোন গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে কমিশনে সহায়তার আশ্বাস প্রদান করেন।
 
সভায় প্রধান অতিথি মাননীয় মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের মতো দেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক মেধাবী দেশের অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানে নেই। দেশের উন্নয়নে এই মেধাবীদেরকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিদ্যমান সমস্যাসমূহ সমাধান এবং কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদানের আম্বাস প্রদান করেন। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত