ট্রেড লাইসেন্স ব্যবসা পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক দলিল। আর এর নিবন্ধন ও নবায়ন প্রক্রিয়ায় তথ্যের ঘাটতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, একাধিকবার অফিসে যাতায়াত এবং বিভিন্ন ধাপে সময়ক্ষেপণ ও হয়রানির কারণে উদ্যোক্তাদের নানা ধরনের ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হচ্ছেন বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। এর সমাধানে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেছেন, হয়রানিমুক্ত ট্রেড লাইসেন্স সেবা নিশ্চিতের জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর বিষয়টি বিচেনাধীন রয়েছে। আর নতুন ট্রেড লাইসেন্স ও নবায়নের জন্য নির্ধারিত ফিতে এনবিআরের চার্জ হ্রাস করা গেলে ট্রেড লাইসেন্স ফি আরও কমানো সম্ভব বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
গতকাল রবিবার ঢাকা চেম্বার এবং ডিএসসিসি যৌথভাবে আয়োজিত ‘স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, আইনশৃঙ্খলা, যানজট পরিস্থিতির উন্নয়ন ও ট্রেড লাইসেন্স সেবা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি ছিলেন। এ সময় তিনি সপ্তাহব্যাপী ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন সেবা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। রাজধানীর মতিঝিল ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) মো. মাসুদ করিম। ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসহ খাতভিত্তিক ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জানানো হয় ১৬ আগস্ট শুরু হয়ে আগামী ২০ আগস্ট সকাল ১০টা হতে ৪টা পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ঢাকা চেম্বারের সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য ব্যবসায়ীরা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের নির্ধারিত ফি জমাদানের মাধ্যমে তাদের লাইসেন্স নবায়ন করতে পারবেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ট্রেড লাইসেন্স ব্যবসা পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক দলিল, তবে এর নিবন্ধন ও নবায়ন প্রক্রিয়ায় তথ্যের ঘাটতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে অস্পষ্টতা, একাধিকবার অফিসে যাতায়াত এবং বিভিন্ন ধাপে সময়ক্ষেপণ ও হয়রানির কারণে উদ্যোক্তাদের নানা ধরনের ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। দেশে ব্যবসা পরিচালনায় সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে ট্রেড লাইসেন্সসহ সব সেবা প্রাপ্তিতে সময়ক্ষেপণ ও হয়রানি রোধে ডিজিটাল ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগ, একাধিক বছরের জন্য নবায়ন কার্যক্রম প্রবর্তনের ওপর জোরারোপ করেন তাসকীন আহমেদ।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমে জবাবদিহিতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে প্রতি শনিবার গণশুনানির আয়োজন করা হচ্ছে, যেখানে ব্যবসায়ীসহ নগরবাসীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে মতামত প্রদানের আহ্বান জানান। নতুন ট্রেড লাইসেন্স ও নবায়নের জন্য নির্ধারিত ফিতে এনবিআরের চার্জ হ্রাস করা গেলে, ট্রেড লাইসেন্স ফি আরও কমানো সম্ভব বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
প্রশাসক আরও বলেন, ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি, তাই ব্যবসা পরিচালনায় সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হলে, এদিকে যেমন সিটি করপোরেশনের আয় বাড়বে, পাশাপাশি জনগণকে উন্নত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রায় আড়াই লাখের মতো ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে, যদিও এর আওতাধীন এলাকায় পরিচালিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক বেশি, এমতাবস্থায় ব্যবসায়ীদের নতুন ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ ও পুরনো লাইসেন্স নবায়নের মাধ্যমে বৈধভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার ওপর জোরারোপ করেন। তিনি আরও জানান, হয়রানিমুক্ত ট্রেড লাইসেন্স সেবা নিশ্চিতের জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং এক্ষেত্রে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু বিষয়টি বিচেনাধীন রয়েছে। শহরের যানজট নিরসনে বিদ্যুৎচালিত অটো রিকশা ও হকারদের রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আসার বিষয়ে কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রশাসক আরও বলেন, পুরনো ঢাকার ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সিটি করপোরেশন এরই মধ্যে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে, তবে পুরনো ঢাকার যানজট নিরসনে কিছু কিছু রাস্তায় একমুখী চলাচল প্রবর্তনে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা কামনা করেন।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান জানান, এ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় ২৯৪ প্রকৃতির ব্যবসায়ের ধরনে এরই মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৪৬ হাজার ১৮০টি ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১৫০ কোটি টাকা, এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যবসায়ীসহ নগরবাসীর সার্বিক সহযোগিতার আহ্বান জানান।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. মাসুদ করিম বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সহায়ক না হলে ব্যবসা ও বিনিয়োগের গতিশীলতা আসে না, তাই ডিএমপির পক্ষ হতে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তবে পুরনো ঢাকায় বিভিন্ন জায়গায় ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানে মালামাল খালাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হয়রানির সম্পৃক্ততা থাকলে তা পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার জন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের মুক্ত আলোচনায় ডিসিসিআইয়ের পরিচালক মোহাম্মদ জমশের আলী, প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি আলহাজ আব্দুস সালাম, প্রাক্তন সহ-সভাপতি হোসেন এ সিকদার ও আলহাজ মো. আলাউদ্দিন মালিক, প্রাক্তন পরিচালক একেডি খায়ের মোহাম্মদ খান ও আলহাজ দীন মোহাম্মদ, মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী ভুট্টো প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।