বাংলা তার নিজের ভাষা নয়, তবুও মানুষটি বাংলা ভাষার বিকাশে রেখে গেছেন গভীর ছাপ। তার হাত ধরে বাংলা মুদ্রণ পেয়েছিল নতুন গতি। বাঙালিকে বাংলা গদ্যভাষা শেখানোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন যেসব লাট-সাহেব, তিনি তাদের মধ্যমণি। যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে এক রকম লুটতরাজ চালাচ্ছে, সে সময় তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন এ দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে। মানুষটির নাম উইলিয়াম কেরি। বাংলা গদ্য, বাংলা সাংবাদিকতা ও মুদ্রণ শিল্পের পয়মন্ত এই পরিব্রাজকের জন্মদিন আজ। এই দিনে তাকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন ইংরেজ মিশনারির জীবনকে ফিরে দেখা নয়; বরং বাংলা ভাষা, শিক্ষা, মুদ্রণ ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে নতুন করে আবিষ্কার করা।
সময়টা আঠারো শতকের শেষ ভাগ। ভারত তখন এক গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দুর্বল হয়ে পড়েছে মোগল সাম্রাজ্যের শক্তি। পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। ঠিক সেই সময় বাংলা ভাষাও পার করছিল নিজের পরিচয় খোঁজার এক সন্ধিক্ষণ। প্রাকৃত ও অপভ্রংশের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বাংলা ধীরে ধীরে গড়ে তুলছিল তার আধুনিক রূপ। এমন এক সময়ে সমুদ্র পেরিয়ে ভারতে আসেন ইউরোপীয় মিশনারি উইলিয়াম কেরি। তার আগমন শুধু ধর্ম প্রচারের ইতিহাসে নয়, বাংলা ভাষা, মুদ্রণ ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসেও তৈরি করে নতুন অধ্যায়।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার শ্রীরামপুরের নীরব করিডর, পুরনো কাঠের দরজা আর সংরক্ষিত বইয়ের পাতাগুলো আজও যেন সাক্ষ্য দেয় সেই অসাধারণ যাত্রার, যার কেন্দ্রে ছিলেন উইলিয়াম কেরি। ১৭৯৩ সালে ভারতে আসার পর তিনি শ্রীরামপুরকে তার কর্মের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, অভিধান প্রণয়ন, বিভিন্ন গ্রন্থ অনুবাদ এবং মুদ্রণ সংস্কৃতির বিকাশে তার ভূমিকা ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। জোশুয়া মার্শম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ডের সঙ্গে তার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা শ্রীরামপুর মিশন শিক্ষা, প্রকাশনা ও ভাষাচর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শ্রীরামপুর শহরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ঔপনিবেশিক সময়ের নানা স্মৃতি। আধুনিকতার ভিড়ের মাঝেও শহরটি ধরে রেখেছে পুরনো ঐতিহ্যের ছাপ। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক ভবন, শান্ত পরিবেশ এবং গঙ্গার তীরবর্তী জনপদে রয়েছে এক ধরনের মায়াবী আকর্ষণ। মনে হয়, এখানে অতীত আর বর্তমান পাশাপাশি বসবাস করছে। এই শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর একটি শ্রীরামপুর কলেজ। ১৮১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান শুধু একটি কলেজ নয়; এটি ভারতীয় শিক্ষা ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
কেরি জাদুঘরে প্রবেশ করতেই অনুভূত হয় এটি শুধু একজন ব্যক্তির স্মৃতি সংরক্ষণের স্থান নয়; এটি একটি সময়ের দলিল। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে পুরনো বই, পাণ্ডুলিপি, মুদ্রণ উপকরণ, চিঠিপত্র, মানচিত্র, ব্যক্তিগত সামগ্রী ও নানা ঐতিহাসিক নথি।
সরেজমিন দেখা যায়, কলেজের ঐতিহাসিক মূল ভবনের পাশে কেরি মিউজিয়াম অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তিন পথিকৃতের স্মৃতি। কেরি-মার্শম্যান-ওয়ার্ড এই তিনজনের আবক্ষ মূর্তি যেন আজও সাক্ষ্য দেয় সেই ঐতিহাসিক জাগরণের। উইলিয়াম কেরির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা জোশুয়া মার্শম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ডও ছিলেন ইংল্যান্ডের সন্তান।
ইতিহাস পাঠে জানা যায়, ১৮০০ সালের আগস্ট মাসে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় ‘মঙ্গল সমাচার মতীয়ের রচিত’ বাংলা গদ্যে মুদ্রিত প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর একটি। এরপর এই ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হতে থাকে কৃত্তিবাসের রামায়ণ, কাশীরামের মহাভারত এবং দুই খণ্ডে বাংলা বাইবেল। শুধু ধর্মীয় গ্রন্থ প্রকাশ নয়, ভারতীয় বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য, জ্ঞান ও সংস্কৃতিকে মুদ্রণের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজেও এগিয়ে আসে শ্রীরামপুর মিশন। প্রাচ্য সাহিত্যকে ইংরেজিতে এবং পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান ও জ্ঞানকে ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে তারা তৈরি করে জ্ঞান বিনিময়ের এক নতুন সেতু। পরবর্তী ৩২ বছরে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে ৪৫টি ভাষায় প্রকাশিত হয় প্রায় ২ লাখ ১২ হাজার বই।
জাদুঘরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর ভাষাভিত্তিক সংগ্রহ। এখানে রয়েছে ১০১টি ভাষার পাঠ্যসামগ্রী, ১৪টি ভাষার পান্ডুলিপি, বিভিন্ন ভাষার ব্যাকরণ ও অভিধান, চিঠি, দিনলিপি এবং বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত ধর্মীয় গ্রন্থ।
কেরিকে ভারতে টিকে থাকতে সংগ্রাম করতে হয়েছিল। তিনি একসময় চলে যান উত্তরবঙ্গের মালদা থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে বামনগোলা ব্লকের মদনাবতী গ্রামে। ছিলেন পাঁচ বছর। মুদ্রণযন্ত্র, কাগজ, কালি ও হরফ সংগ্রহ করে বাংলা হরফে বাইবেলের অনুবাদ ছাপার কাজ শুরু করেন তিনি। সেই মালদা থেকে উঠে আসা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেতাজী নগর কলেজের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘কেরি ভারতবর্ষের সম্পদ। তিনি ভাষা, শিক্ষা ও মুদ্রণের ক্ষেত্রে যে ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, তার প্রভাব আজও অনুভূত হয়।’
ইতিহাসের আড়ালে থাকা গল্প খুঁজে বের করার নেশায় কলকাতার হাওড়া থেকে মাত্র ৫ টাকার লোকাল ট্রেনে টিকিট কেটে শুরু করতে হয় এই যাত্রা। জাদুঘরে কোনো প্রবেশমূল্য নেই। গঙ্গা নদীর ধারঘেঁষা এই ঐতিহাসিক স্থান দেখে ফেরার সময়ও সেই ৫ টাকার ট্রেন টিকিট। কলকাতা থেকে মাত্র দশ টাকায় যাওয়া-আসার দূরত্বে কয়েক শতাব্দী আগের অমূল্য গন্তব্যের নাম হতে পারে শ্রীরামপুর কলেজ!
লেখক : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক।