শুধু যে উন্নত জীবনের আশায় বা ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভনে মানুষ সহজেই পাচারকারীদের জালে পা দিচ্ছে তা নয়, পাচারকারী চক্র মানুষকে জোরপূর্বকও ঠেলে দিচ্ছে ভয়ংকর পথে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ভুয়া ভিসায় কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বাধ্য করার ঘটনা প্রায় নিয়মিত ঘটছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও ঠেলে দিচ্ছে পাচারকারীরা! ২৮ অক্টোবর দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত দুটি ভিন্ন প্রতিবেদনে ফের উঠে এসেছে পাচারকারী চক্রের হাত কত প্রলম্বিত, সেই চিত্র। ‘পাচারের জন্য আটকে রাখা ১২ তরুণী উদ্ধার’ শিরোনামযুক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনে নিয়ে উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আটকে রাখা ১২ কিশোরী ও তরুণীকে রাজধানীর উত্তরা এবং ভাটারা এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। তারা সবাই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য। আরও বলা হয়েছে, কম্বোডিয়ায় ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দুই বাংলাদেশি তরুণকে পাচার ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে মানব পাচার চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। লিবিয়ার ত্রিপোলি থেকে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরেছেন আরও ১৭৪ বাংলাদেশি, যাদের বেশিরভাগই সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশে মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে লিবিয়ায় প্রবেশ করেছিলেন।
অন্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে লড়তে প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের নাগরিককে পাচারের করে নিয়োগের প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন। এর মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশিও। রুশ সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের আগে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের প্রলুব্ধ করা এবং রাশিয়ায় নেওয়ার পর সামরিক চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করার তথ্য উঠে এসেছে কমিশনের প্রতিবেদনে। এই তথ্যেও পুনর্বার প্রতীয়মান হলো দেশি-বিদেশি পাচারকারী চক্রের জাল কতটা বিস্তৃত। ভাগ্য বদলের আশায় যেসব দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ বিদেশে পাড়ি জমায়, বাংলাদেশ এর মধ্যে অন্যতম। উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় অসচেতনরা হিতাহিত জ্ঞান ভুলে কী ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়ে থাকে এর মর্মন্তুদ নজির ইতিমধ্যে কম মেলেনি। নিকট অতীতে সংবাদমাধ্যমেই জানা যায়, প্রতি বছর কয়েক লাখ বাংলাদেশি বিদেশে অবৈধ অভিবাসনের পথে পা বাড়ায়। এমন প্রেক্ষাপটে আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা তাহলে কীÑ এই প্রশ্নটি উত্থাপনের আগে আমরা প্রশ্ন রাখতে চাই, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চোখে ধুলা দিয়ে পাচারকারী চক্রের জাল ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে কীভাবে?
পাচারকারীরা অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশে অভিবাসীদের জিম্মি করে রাখছে। তাদের খপ্পরে পড়ে ভাগ্যান্বেষীরা শেষ পর্যন্ত সব হারাচ্ছে। আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে স্থানীয় চক্রের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান, এও নতুন খবর নয়। তারা পাচার হওয়াদের মুক্তির জন্য বাংলাদেশে তাদের পরিবারের কাছে অর্থ দাবি করছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের অনেকের শেষ পরিণতির কথাও জানা যায় না। অবৈধ অভিবাসন এবং মানব পাচার সবচেয়ে গুরুতর আর্থ-সামাজিক সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি, বিদ্যমান বাস্তবতায় তা স্পষ্টত দৃশ্যমান। এই কদাচার একদিকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে, শ্রমবাজারে অভিঘাত ফেলছে, সমাজ ও পরিবারে সৃষ্টি করছে বহুমাত্রিক ক্ষত এবং দেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারকেও করছে প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশ থেকে মানব পাচার নিয়ে গ্লোবাল অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্সের এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি নারী ও কন্যাশিশুরা জোরপূর্বক শ্রম ও যৌন অপরাধের উদ্দেশ্যে পাচারের শিকার হয়। অনেক ক্ষেত্রে তা সাজানো বিয়ের মাধ্যমেও ঘটে।
মানব পাচারের এ ভয়ংকর ফাঁদ বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের ভেতরে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে, যাতে পাচারকারী চক্র কর্মহীনদের প্রলুব্ধ করার সুযোগ না পায়। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রবৃদ্ধিমুখী উন্নয়নকে কর্মসংস্থানমুখী করা বাঞ্ছনীয় বলে আমরা মনে করি। মানব পাচার রোধে সবচেয়ে জরুরি হলো, পাচারকারীদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা। মানব পাচার মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই বলেছিলাম, ব্যাধিটি যেহেতু গুরুতর হয়ে উঠেছে সেহেতু কোনো টোটকা দাওয়াই নয়, চাই দেশের ভেতরে সাঁড়াশি অভিযান এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত প্রয়াসের লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।