এলডিসি উত্তরণ না হলে বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৪৭ এএম

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পেছানোর সিদ্ধান্ত অনুমোদন পাওয়া গেছে। এই অতিরিক্ত সময়ে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও সিটিজেনস প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

গতকাল রবিবার রাজধানীর ধানম-িতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ : জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে তিনি এ কথা বলেন। সে সময় সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ, সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করেন।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের দেওয়া কথা ও অঙ্গীকারের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে। বর্তমানে বাণিজ্য চুক্তি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তার মতো বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করছে। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর সহযোগিতা পেতে হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে। বিষয়টিকে শুধু এলডিসি থেকে উত্তরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে জাতীয় বিশ্বাসযোগ্যতা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থান জড়িত।

তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের এ সিদ্ধান্তকে আমরা ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে দেখছি। তবে এটি যেমন একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত, তেমনি নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণেও বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে ব্যতিক্রমী কৃতিত্ব দেখাতে হবে।’

চার খাত সংস্কারের কথা জানিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি, সামাজিক সুরক্ষা ও সরবরাহ ব্যবস্থা এ চার খাতের সংস্কার করতে হবে। এসব খাতে সংস্কার হলে তৈরি পোশাকের (আরএমজি) বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণ সম্ভব হবে। পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে। এ চার খাতে সংস্কার কার্যকরীভাবে করতে গেলে ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি এলডিসি থেকে মসৃণ ও টেকসই ও অপরিবর্তনীয়ভাবে উত্তরণের জন্য প্রস্তুত হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে উত্তরণের জন্য আরও তিন বছর সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ।’

রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সময়ের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণে সময়সীমা দেশের রাজনৈতিক চক্রের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিষয়টি শুধু কারিগরি, আমলাতান্ত্রিক বা প্রশাসনিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে।

এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পাওয়া বিশেষ সুযোগ-সুবিধা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ রূপরেখা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, আগামী বাজেটে কোন কোন খাতে কী পরিমাণ সহায়তা বা ভর্তুকি কমানো হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে। পাশাপাশি সম্ভাবনাময় কোন খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে বেশি সহায়তা দেওয়া হবে সেটিও নির্ধারণ করতে হবে। পুরো সংস্কার কর্মসূচি জনসমক্ষে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে।

নীতিনির্ধারণে সমন্বয়ের অভাবের বিষয়টি তুলে ধরে ড. দেবপ্রিয় বলেন, বর্তমানে অ্যাকশন প্ল্যান, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ত্রিবার্ষিক বাজেটারি কাঠামো, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং বিভিন্ন খাতভিত্তিক সরকারি পরিকল্পনা কার্যকর রয়েছে। এসব পরিকল্পনার মধ্যে দ্রুত ও কার্যকরী সমন্বয় না হলে নীতিগত বিভ্রান্তি তৈরি হবে। এতে পরে কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও কঠিন হবে।

এলডিসি থেকে উত্তরণকে জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ প্রক্রিয়ার মালিকানা পুরো সরকার ও দেশের। জাতীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাত, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী গোষ্ঠী, দেশীয় বিশেষজ্ঞ সমাজ ও গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘অতীতে আমরা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কথা বলার ক্ষেত্রে যতটা পারদর্শিতা দেখিয়েছি, বাস্তবায়নে ততটা সফল হতে পারিনি। এ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়। আগামী তিন বছরে জাতিসংঘের সিদ্ধান্তকে বাস্তবে সফল করতে জাতীয় পর্যায়ে ব্যতিক্রমী দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে।’

ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, আগামী তিন বছরে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিতে হবে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না এবং বিনিয়োগ ও উন্নয়নের ধারাও বজায় রাখতে হবে। সরকার ক্ষমতায় আসার পর যেসব সংস্কারের কথা বলেছে, সেগুলো যথাযথভাবে ও সময়মতো বাস্তবায়ন করতে হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য একেবারে নতুন কোনো উদ্যোগ শুরুর প্রয়োজন নেই। বরং বিদ্যমান সংস্কার কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই উত্তরণের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। তবে এ জন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপ, তার বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া এবং সব পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ চাইলেই আবার এ তালিকায় ফিরে আসতে পারবে না। জাতিসংঘের নির্ধারিত কারিগরি মানদ-েও সে সুযোগ নেই। তাই উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার অতিরিক্ত তিন বছরকে এলডিসি হিসেবে পাওয়া সুবিধা ভোগের সময় বাড়ানো হিসেবে না দেখে ২০২৯ সালের পরবর্তী সময়ের জন্য অর্থনীতিকে প্রস্তুত করার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য উত্তরণকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে।

তিনি বলেন, মাতারবাড়ী, মহেশখালী ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআইডিআই) ঘিরে বড় ধরনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ উদ্যোগকে এলডিসি থেকে উত্তরণের কাজে লাগাতে হবে। বিশেষ করে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে এ সুযোগ কাজে আসতে পারে। বাংলাদেশ বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য আগামী তিন বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন বাজারে শূন্য শুল্কে রপ্তানির সুযোগ পাবে। এ সুবিধা ২০৩২ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে। এটি বাংলাদেশের জন্য বিনিয়োগ আকর্ষণের বড় সুযোগ।

তৌফিকুল ইসলাম বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণে প্রস্তুতি ও সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে রিফর্ম ট্র্যাকার ‘ৎবভড়ৎসঃৎধপশবৎ.রহভড়’ ওয়েবসাইটে একটি অনলাইন ট্র্যাকার চালু করা হয়েছে। সরকারের ২০২৪ সালে প্রকাশিত স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি থেকে প্রাথমিকভাবে চারটি ক্ষেত্রে ২৩টি সংস্কার উদ্যোগ বাছাই করে এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ক্ষেত্রগুলো হলো বাণিজ্যসুবিধা ও বাজারে প্রবেশাধিকার, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অংশীদারত্ব জোরদার করা। এসব উদ্যোগের অগ্রগতি পাঁচটি ধাপে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত