দেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা গভীর সংকটের মুখোমুখি। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন এবং কাঠামোগত অবহেলার কারণে দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে তাদের জীবন-জীবিকা। অন্যদিকে মাথায় মহাজনের ঋণের বোঝা, সামনে উত্তাল সাগর আর তার ওপর জলদস্যুদের হানার আতঙ্কে তাদের পেশা হয়ে পড়ছে শঙ্কার বৃত্তবন্দি। ৩ নভেম্বর ‘মহাজনের ঋণ, জলদস্যুর আতঙ্ক’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উপকূলবাসীর জীবন-যুদ্ধের বহুমাত্রিক জটিল চিত্র। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দরবনের দুবলার চরে শুরু হয়েছে শুঁটকির মৌসুম। গত মৌসুমে আশানুরূপ মাছ না পাওয়ায় এমনিতেই পিঠ ঠেকেছে দেয়ালে, তার ওপর নতুন মৌসুমের অনিশ্চয়তা নিয়ে সুন্দরবনের শুঁটকিপল্লীর উদ্দেশে রওনা হয়েছেন খুলনার কয়রাসহ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জেলেরা।
মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন নিয়ে নৌকা, জাল, খাবার ও রসদ নিয়ে যারা জীবিকার পথ কণ্টকমুক্ত করতে জীবনঝুঁকি নিয়ে যান সাগরের দিকে তারা পানি ও ডাঙায় সমান্তরালে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি। সুন্দরবন অঞ্চলে দস্যুদের অপতৎপরতার খবর মিলেছে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনেই। আরও বলা হয়েছে, মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪১ হাজার ৬৪৫। তাদের মধ্যে পাইকগাছা, কয়রা, দাকোপ, রূপসা ও ডুমুরিয়া উপজেলার প্রায় সাড়ে ৩১ হাজার জেলে গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করেন। বেসরকারি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় প্রায় তিন লাখ জেলে বসবাস করেন। কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশীর জেলে আল আমিন জানান, তিনি ১৯ জন জেলেকে নিয়ে তিনটি নৌকার বহরে সাগরে যাচ্ছেন। তাদের কেউ কেউ ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। কিন্তু সাগরে ভারতীয় জেলেদের আধিক্য ও বনদস্যুদের দৌরাত্ম্যে তারা উদ্বিগ্ন।
এই যদি হয় চিত্র তাহলে সহজেই প্রতীয়মান হয়, উপকূলের মৎস্যজীবীদের সার্বিক পরিস্থিতি কতটা নাজুক। আমরা মনে করি, তাদের সার্বিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে শুধু স্থানীয় প্রশাসনেরই নয়, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। সিডর, আইলা, আম্পান, সিত্রাংয়ের মতো একের পর এক ঘূর্ণিঝড় উপকূলে যে ক্ষত সৃষ্টি করে তা এখনো বহুক্ষেত্রে দৃশ্যমান। শুধু জীবিকাই নয়, তাদের সামনে জীবনযাপনের ধাপগুলোও কঠিন। অনেক অঞ্চলেই উপকূলীয় নারীদের প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে হেঁটে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। উপকূলের নানামুখী মানবিক বিপর্যয় রুখতে কেবল ত্রাণ বিতরণ নয়, বরং স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে তাদের অধিকারের বিষয়গুলো উপেক্ষীয় থাকতে পারে না। জলদস্যুদের থাবা থেকে তাদের সুরক্ষায় নজর দিতে হবে উৎসে এবং জলদস্যুদের মূলোৎপাটনে চালাতে হবে সাঁড়াশি অভিযান। সরকারি অনুদান ও সহজ শর্তে তাদের জন্য ব্যাংক ঋণের পথ সুগম করাও সময়ের দাবি। সুদের কারবারিদের শোষণের জাল ছিন্ন করতে এর বিকল্প নেই।
উপকূলবাসীকে সুরক্ষিত না রাখলে দেশের অর্থনীতিতে যেমন অভিঘাত লাগবে, তেমনি খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়বে। তাই সরকারের উচিত উপকূলীয় অঞ্চলকে ‘বিশেষ অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত জোন’ ঘোষণা করে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া। উপকূলীয় অঞ্চলের জেলে, কৃষক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দাদনদার বা মহাজনদের শোষণ থেকে মুক্তির পথ হলো প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের সহজলভ্যতা এবং আইনি সুরক্ষা। যুগ যুগ ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর পুঁজি হারিয়ে উপকূলবাসী মহাজনদের চড়া সুদের ঋণের জালে (দাদন প্রথা) বন্দি হতে বাধ্য হয়। আর জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকি ক্রমেই কঠিন উপসর্গে রূপ নিচ্ছে। জেলেদের জন্য খণ্ডকালীন বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়েও পরিকল্পনা প্রণয়ন-বাস্তবায়নে মনোযোগ দেওয়া দরকার। জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী এবং নৌ-পুলিশের টহল জোরদার করাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। দাদন কারবারিদের রক্তচোষা সুদ আদায় ও জোরপূর্বক কম দামে মাছ বা ফসল কেড়ে নেওয়ার প্রতিবিধানে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা যেসব কারণে বিপর্যস্ত এর প্রতিবিধান করা বাঞ্ছনীয় বৃহৎ স্বার্থ ও প্রয়োজনেই।