জিয়াউর রহমানের সাহস-দূরদর্শিতা

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৮ এএম

’৭৫-এর ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে মোড় নেওয়ার একটা বড় ঘটনা। সিপাহি-জনতা অভ্যুত্থানের পর আমার মতে স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে যে ঘটনা বাংলাদেশকে নতুনভাবে তৈরি করে, তার ভেতরে ৭ নভেম্বর মোড় নেওয়ার একটা উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে মোড় নেওয়ার অধ্যায় সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের সেই ঐতিহাসিক অধ্যায়। ওই ঘটনার প্রেক্ষাপট যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে বলতে হয় ক্ষমতার মহানায়ক ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি পরবর্তী পর্যায়ে হন রাষ্ট্রপতি। ঘটনার পেছনের দিকে যদি তাকাই তাও স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়, ১৫ আগস্টের পরে বাংলাদেশে কোনো কার্যকর সরকার ছিল না। একদিকে ছিল বঙ্গভবনে দখলকৃত কিছু সেনা অফিসার আর একদিকে ছিল ক্যান্টনমেন্ট। তখন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী খুব ছোট ছিল। সেখানে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অফিসাররা যেমন ছিলেন, তেমনি পাকিস্তান থেকে ফেরত অফিসাররাও ছিলেন।

 পঁচাত্তরে ১৫ আগস্টে যারা ঘটনা ঘটিয়েছিলেন তারা মোটামুটি এক ধরনের ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করেছিলেন। সেই ক্ষমতার কেন্দ্রটা ছিল এ রকম যে, অনেক জুনিয়র সিনিয়রদের খুব বেশি একটা পাত্তা দিতে চাননি বা দেননি। ওই পরিস্থিতি সামরিক বাহিনীতে একটা বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। তখন যারা সিনিয়র অফিসার ছিলেন তাদের অবজ্ঞা-অবমূল্যায়ন করে চলেছেন জুনিয়ররা। ফলে সেনাবাহিনীর ভেতরে অফিসারদের এবং জওয়ানদের মধ্যে একটা উপলব্ধি তৈরি করে যে, একটা সেনাবাহিনীতে যদি চেইন অব কমান্ড না থাকে তাহলে বিপদ কত প্রকট হতে পারে, সত্যিকারের এই ভাবনাটা। একটা ক্ষুদ্র সেকশন যদি দেশকে জিম্মি করে রাখে, চেইন অব কমান্ড ভেঙে যায় তাহলে সেই আর্মি উঠতে পারবে না। এই উপলব্ধির কারণে একটা চেন অব কমান্ড প্রদান করার জন্য তৎকালীন সিনিয়র অফিসাররা চিন্তাভাবনা করছিলেন কীভাবে কী করা যায়। জিয়াউর রহমান তখন চেষ্টা করছিলেন চেইন অব কমান্ড ঠিক করার। ক্ষমতা দখল নয়, চেইন অব কমান্ড অর্থাৎ আর্মির চেইন অব কমান্ড ঠিক করা জরুরি; এটাই ছিল তার ভাবনার কেন্দ্রে বিস্তৃত জায়গাজুড়ে।

জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় যে ঘোষণা করেছিলেন, সেই ঘোষণাপত্রের মধ্যে স্পষ্ট বাংলাদেশের স্বাধীনতা কথা বলা হয়েছিল। সেই ঘোষণাপত্রের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীতে একটা রিভোল্ট হয় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। এ কারণে জিয়াউর রহমানের একটা পরিচিতি সমগ্র বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের তখনকার সেনাবাহিনীতে ভিন্নভাবে ছিল এবং সেই পরিচিতি হিসেবে যে বিষয়টা ছিল সেটা ছিল তার সাহসিকতা, নিখাদ সততা ও দূরদর্শিতা । তিনি তার সততা-সহজবোধ্যতা এবং প্রজ্ঞা-সাহসের কারণে প্রায় ৯০ ভাগ সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলেন। তখন আর কোনো সিনিয়র অফিসার তার মতো এত গ্রহণযোগ্য ছিলেন না। এই প্রেক্ষাপটে সবাই ভাবছিলেন যে, তিনি একটা ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু এর মধ্যেই কতিপয় উচ্চাভিলাষী অফিসার তৎকালীন সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডার ছিলেন তার নেতৃত্বে একটা ক্যু করে ফেললেন। ক্যু-টা মূলত তিনি করেছিলেন বঙ্গভবনে। কিন্তু তিনি ফেল করলেন। যে বিস্ময়কর ঘটনাটা ঘটেছিল তা জিয়াউর রহমানকে বন্দি করার ঘটনা। অনেকের ধারণায়ই ছিল না, জিয়াউর রহমানকে বন্দি করা হতে পারে। আরও একটা ক্যু হলো, কিন্তু ওই ক্যু-এর উদ্দেশ্যটা কী ছিল, প্রশ্ন সেটাই। এর বিপরীতে যে ক্যু হলো সেটাকে ধরা হলো যে এটা বাংলাদেশের বিরোধী চেতনার। আরও যে ঘটনা ঘটল তা হচ্ছে তা হলো জাসদের গণবাহিনীর উত্থান। ৩ নভেম্বর থেকে ৬ নভেম্বরের মধ্যে তাদের সদস্যরা যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করল, এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কিছু জওয়ানও। তাদের নাম ছিল বিপ্লবী সেনা সংস্থা আর ওই দিকে হচ্ছে জাসদের গণবাহিনী।

তাদের লক্ষ্য ছিল সরকার উৎখাতের একটা সংস্থা তৈরি করা। যদি ১৫ আগস্ট না হতো তাহলে তারা এই পঞ্চমুখ সরকারকে উৎখাত করতেন। ১৫ আগস্ট হওয়াতে গণবাহিনী এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা একটা সেই অবকাশ পেল না এবং এ নিয়ে একটা দ্বন্দ্ব ছিল ১৫ আগস্টের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে। অন্যদিকে খালেদ মোশাররফ যে ক্যু-টা করেন সেই ক্যু ব্যাকফায়ার হয়। ক্যু, কাউন্টার ক্যু-এর ঘটনাগুলো বেশিরভাগ সেনা কর্মকর্তা-সদস্যের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। জনগণও গ্রহণ করেনি, মেনে নেয়নি। জাসদের গণবাহিনী সেনাবাহিনীর ভেতরে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছিল নানাভাবে। ৭ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ পাল্টা অভ্যুত্থানে নিহত হন। ছয়-সাত নভেম্বর জাসদের গণবাহিনী এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা যে তা-ব চালিয়েছিল, শৃঙ্খলা বিনষ্ট করেছিল তা শেষ পর্যন্ত রুখে দাঁড়িয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনি বন্দিদশা থেকে বের হয়ে গ্রহণ করেন দেশ-জাতি রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয়। এ জন্য ইতিহাসে তার স্থান নির্ধারিত শীর্ষে। অনেক প্রাণ নিয়েছে গণবাহিনী। একটা গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তখন বাংলাদেশে।

৭ নভেম্বর মধ্যরাতে জিয়াউর রহমান বের হয়ে কমান্ড সামলান। তিনি যদি কঠিনভাবে সাহসের সঙ্গে তখন না দাঁড়াতেন চারদিকে গোলাগুলির মধ্যে, তাহলে বাংলাদেশে তখন নির্ঘাত একটা গৃহযুদ্ধ হতো। গৃহযুদ্ধ হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা হয়তো চার বছরেই শেষ হয়ে যেত। জিয়াউর রহমান তখন না থাকলে এ দেশের সার্বভৌমত্বই থাকত না। জাসদের গণবাহিনীর কা-কীর্তির ফলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এর বিরূপ প্রভাব আরও প্রকট হতো। মধ্যে কয়েকদিন কার্যত তো কোনো সরকারই ছিল না। ১৫ আগস্টের পরে তৎকালীন আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ ছিলেন জেলে। এর মধ্যে যাদের পাওয়া গিয়েছিল তারা খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সরকার গঠন করছিলেন, কিন্তু সেই সরকার চালাতেন কয়েকজন সামরিক অফিসার। তাদের নাম তো অনেকেরই জানা আছে।

৭ নভেম্বরের পুরো ঘটনার মর্মার্থ হলো এটা বাংলাদেশকে রক্ষা করার একটা অধ্যায় এবং এর জন্য সম্পূর্ণ কৃতিত্ব দিতে হয় তৎকালীন সেনাপ্রধান পরবর্তী সময় যিনি রাষ্ট্রপতি হন, সেই মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। সংক্ষেপে যদি বলি তাহলে বলতে হয়, সেদিন যদি জিয়াউর রহমান না থাকতেন তাহলে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ টিকে থাকতে পারত না। ৭ নভেম্বরের যে ঘটনাকে আমরা সিপাহি-জনতার বিপ্লব বলছি, সেই বিপ্লবের নির্দেশক ছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনি নতুন রূপকার হিসেবে রাষ্ট্রকে পথের দিশা দেন। পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক নীতি, অর্থনৈতিক চিত্র অর্থাৎ বলতে গেলে সবকিছুই এমনভাবে তৈরি করা হয় যেগুলোর সুফল আমরা পেয়েছি নানাভাবে। স্বাধীন দেশে যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, এ রকম দুর্ভিক্ষও বাংলায় হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। তখন আমেরিকার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘বটমলেস বাস্কেট’। সেই ‘বটমলেস বাস্কেট’কে উন্নয়নের পথে ধাবিত করেন রাষ্ট্রপতির জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের কূটনীতির বড় পরিবর্তন হয়েছিল তখন। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক, আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়। তখন কিছু শিল্প গড়ে উঠেছিল তারপর পর্যায়ক্রমে এগুলো বিকশিত হয়। যখন এ দেশের মানুষ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী এ নিয়ে গভীরভাবে উৎকণ্ঠিত, তখন এ অবস্থা থেকে ভবিষ্যতের আলো দেখিয়েছেন জিয়াউর রহমান। তিনি জাতিকে একত্র করেছেন, এই বাস্তবতা এড়ানোর অবকাশ নেই।

২০২৪ সালের আগস্টে আমাদের রাষ্ট্র আবার ভেঙে পড়েছিল। টানা ১৫ বছর কোনো সরকার এভাবে নির্বাচিত হয়ে দেশ চালায়নি। ২০০৯-এর পর থেকে স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কিংবা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়নি। নির্বাচনকে নিজের ছকে ফেলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছিল। অন্য কারোরই জায়গাই ছিল না আওয়ামী লীগের অনুগতদের ছাড়া। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু হলো নিপীড়ন আর কঠিন সংগ্রামের চাপে। ২৪-এর ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে যে ঘটনা ঘটে, এটা একটা শিক্ষা। ৭ নভেম্বরের মতো ওখানে কিন্তু কোনো নেতৃত্ব ছিল না। জনতা ছিল, ছিল সুশীল সমাজ এবং সবাই অংশগ্রহণ করে একনায়কতন্ত্রী আওয়ামী লীগের পতন ঘটিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এসে ভঙ্গুর রাষ্ট্রটাকে কিছুটা হলেও টেনে তুলেছিল। এখন ক্ষমতায় নির্বাচিত সরকার। নেতৃত্বে জিয়াউর রহমান এবং বেগম জিয়ার সন্তান তারেক রহমান। তার কাছে দেশ-জাতি অনেক কিছু আশা করে। কারণ তিনি এ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা-নেত্রীর সন্তান। তিনি দেশকে ভঙ্গুর অবস্থা থেকে টেনে তুলবেন, এটাই প্রত্যাশা।

আজ বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের একটা পরিচিতি আছে। আমরা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে যুক্ত। আমাদের শিল্প অনেক বেড়েছে। বিশ্ব শ্রমবাজারে দক্ষ-অদক্ষ অনেক কর্মী কাজ করছেন। আর্থ-সামাজিক চিত্র অনেক বদলেছে কিন্তু সমস্যাও আছে বিস্তর। বৈশ্বিক সংকটও প্রকট। এর অভিঘাতমুক্ত নই আমরাও। সামনের সময় হয়তো আরও কঠিন হতে পারে। এ জন্য যোগ্য নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে দেশকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে হবে, যে রকমভাবে জিয়াউর রহমান নিয়ে গিয়েছিলেন।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত