ষড়যন্ত্রকারীদের ২০২৪-এর মতোই জনগণ উচিত জবাব দেবে

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:০৬ এএম

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘শ্রমিকদের জন্য গঠন করা মজুরিবোর্ড কাজ শুরু করেছে। আগামী দুয়েক মাসের মধ্যে মজুরিবোর্ড নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করবে। এতে শ্রমিকরা ভালো থাকতে পারবেন।’ একইসঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘দেশের শিল্পকারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পেছনে যারা ষড়যন্ত্র করছে, তাদের ২০২৪ সালের মতোই জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে উচিত জবাব দেবে।’ গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বাগেরহাটে হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতে যাওয়ার পথে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের কাটাখালী মোড়ে আয়োজিত এক পথসভায় তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন। এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা থেকে সরাসরি বাগেরহাটের মোংলায় যান। সেখানে তিনি বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বিকেলে খুলনা স্টেডিয়ামে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২ এর উদ্বোধন করেন। এ ছাড়া একটি অনির্ধারিত পথসভায়ও বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী।

কাটাখালী মোড়ের পথসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সব শক্তি নিয়ে দেশের মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ ও শ্রমিক ভাই-বোনদের সঙ্গে নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের রুখে দাঁড়াব। ২০২৪ সালে যেভাবে বাংলাদেশের মানুষ তাদের উচিত জবাব দিয়েছিল, সামনের দিনেও একইভাবে তাদের উচিত জবাব দেওয়া হবে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আজ যেহেতু জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাই জনগণের সরকার দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে,সেটিকে এই যড়যন্ত্রকারীরা ভেস্তে দিতে চাইছে।’

তিনি বলেন, ‘এসব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আজ জনগণকে রুখে দাঁড়াতে হবে। এই দেশের শ্রমিক ভাইদের রুখে দাঁড়াতে হবে, যাতে কোনোভাবেই সেই ষড়যন্ত্রকারীরা সুযোগ না পায়। কারণ আজ সময় এসেছে দেশ গঠন করার, আজ সময় এসেছে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করার।’

ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সব শক্তি দিয়ে এই ষড়যন্ত্রকারীদের সঠিক জবাব দেব। দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে, খেটে খাওয়া মানুষকে সঙ্গে নিয়ে, শ্রমিক ভাই-বোনদের সঙ্গে নিয়ে ইনশাআল্লাহ জবাব দেব। আমাদের সামনে লক্ষ্য একটাই সেটা হলো ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’

প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, ‘যারা বিগত ১৫/১৬ বছরে দেশের অবস্থার, মানুষের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারেনি, যারা মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, যারা এদেশ থেকে মানুষের অর্থসম্পদ বিদেশে পাচার করে দিয়েছিল, আমরা দেখেছি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে জনতার অভ্যুত্থানে তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। আজ তারা সীমান্তের ওপার থেকে কলকাঠি নাড়াচ্ছে। দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। শুধু তাই নয় তারা দেশের মিল কারখানা ভেঙে দিতে চাচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই মিল কারখানাগুলো হচ্ছে দেশের মানুষের সম্পদ। এই মিল কারখানাগুলো হচ্ছে দেশের শ্রমিকদের সম্পদ। এগুলো যদি ধ্বংস হয়ে যায় প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এই দেশের খেটে খাওয়া মানুষ। এই মিল কারখানা যদি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমার শ্রমিক ভাই ও বোনেরা। এই মিল কারখানাগুলো যদি ধ্বংস হয়ে যায়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের শ্রমিক ভাই-বোনের সন্তানরা। তাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাবে।’

শ্রমিকদের জন্য গঠন করা মজুরিবোর্ড প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জানি শ্রমিক ভাই-বোনদের মজুরি নিয়ে কিছু দাবি দাওয়া আছে। আপনারা দেখেছেন এরই মধ্যে আমরা সেই দাবিগুলো বিবেচনা করার জন্য, পরিচালনা করার জন্য মজুরিবোর্ড গঠন করেছি। মজুরিবোর্ড এরই মধ্যে কাজও শুরু করে দিয়েছে। ইনশাল্লাহ আগামী দুই-এক মাসের মধ্যে মজুরিবোর্ড নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করবে, যাতে করে আমাদের শ্রমিক ভাই বোনেরা এর চেয়েও ভালো থাকতে পারেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি দেশের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি-বেসরকারি শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেছিল। আমরা চেষ্টা করব সারা দেশে বিভিন্ন সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া মিল কলকারখানাগুলো চালু করতে।’

তিনি বলেন, ‘বন্ধ হয়ে যাওয়া মিল-কারখানাগুলো পুনরায় চালুর পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নতুন করে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। দেশে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনে বিনিয়োগকারীদের উদ্বুদ্ধ করা হবে। কারণ, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে দেশের তরুণ ও যুবসমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। সরকার খুলনা, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে উত্তরের পঞ্চগড় পর্যন্ত হাজার হাজার শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে চায়।

পথসভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, বাগেরহাট জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন প্রমুখ। পথসভা শেষে প্রধানমন্ত্রী বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হযরত খানজাহান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। এ সময়ে  বাগেরহাট জেলা বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান। 

এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী মোংলায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ও চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের মধ্যে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতাবিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। পরে তিনি ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি কনটেইনার জেটি নির্মাণ এবং আনুষঙ্গিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এ সময়ে বন্দরপ্রাঙ্গণে তিনি একটি গাছের চারাও রোপণ করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ করা হলে এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি সম্ভাবনাময় নতুন অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হবে। মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও যশোরসহ এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকা- সম্প্রসারণের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে পঞ্চগড় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ, বন্দরের সরবরাহব্যবস্থা ও পণ্য পরিবহন সুবিধা সম্প্রসারণে সরকার উদ্যোগ নিতে চায়।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল, ইয়ার্ড ও কার্গো হ্যান্ডলিং সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে এসব কাজসম্পন্ন হলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে এবং সারা দেশের জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার কমলাপুর আইসিডি থেকে কনটেইনারবাহী ট্রেন সরাসরি মোংলা বন্দরে চলাচল করতে পারবে।

অনুষ্ঠানে যোগাযোগমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান, পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা এবং চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের চেয়ারম্যান দাই হেগেন বক্তব্য রাখেন। এ সময় বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২ উদ্বোধন : মোংলা থেকে বিকেল পৌনে ৩টায় প্রধানমন্ত্রী খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে পৌঁছান। বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের দ্বিতীয় আসরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। একই সঙ্গে অনলাইনে দেশের ৫০৩টি উপজেলায় এ প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এবং জাতীয় সংসদের হুইপ ও খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম বকুল।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিকেএসপি’র শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পরিবেশনা উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া চীনের শিক্ষার্থীদের পরিবেশিত দেশটির ঐতিহ্যবাহী ড্রাগন ড্যান্স ও লায়ন ড্যান্সও উপভোগ করেন তিনি।

খুলনায় অনির্ধারিত পথসভায় প্রধানমন্ত্রী : বিকেলে খুলনা মহানগরীর ডাকবাংলা মোড়ে এক অনির্ধারিত পথসভায় যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। বিকেল ৩টা ২১ মিনিটে তাকে বহনকারী ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বাসটি ডাকবাংলা মোড় অতিক্রম করার সময় খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন পথসভা মঞ্চ থেকে তাকে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানান। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বাস থেকে নেমে খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সামনে নির্মিত মঞ্চে যান। এ সময় তিনি প্রটোকল ভেঙে বাস থেকে নেমেই সোজা হেঁটে যান জনতার দিকে। হাত বাড়িয়ে দেন কর্মীদের দিকে।

বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির আশ^াস দেন। পাশাপাশি খুলনার বন্ধ শিল্পকারখানা দ্রুত চালু করে শিল্পাঞ্চলের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনা, ও স্বাস্থ্যসেবার বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন তিনি।

এর আগে একই মঞ্চে বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু।

বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে হেলিকপ্টারে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন তিনি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত