তিন মাসে পোশাক খাতের আয় কমেছে ৪.২২ শতাংশ

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৩, ০১:৫০ এএম

দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসে তৈরি পোশাক থেকে। কিন্তু বিশ^ব্যাপী আর্থিক সংকটের কারণে এ খাতের রপ্তানি আয়ে ভাটা পড়া শুরু করেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় কমেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলো পোশাক আমদানি কমিয়ে দেওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, তৈরি পোশাক খাত থেকে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) যে পরিমাণ রপ্তানি আয় হয়েছে, পরের তিন মাসের আয় তা থেকে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ কম।

রপ্তানিকারকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশের ক্রেতারা পোশাকের মতো খাতে এখনো কম অর্থ ব্যয় করছেন। তাই রপ্তানি আয় কিছুটা কমে গেছে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ব্যাংক সুদের হার বাড়ানোয় আরও কয়েক মাস এ প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। তবে আগামী ডিসেম্বর নাগাদ স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে আশা রপ্তানিকারকদের।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) রেডিমেড গার্মেন্টস (আরএমজি) থেকে মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৭৩ কোটি ৯১ লাখ ডলার। এর আগের প্রান্তিকে যা ছিল ১ হাজার ২২৫ কোটি ৫৭ লাখ ডলার। হিসাব অনুযায়ী তিন মাসের ব্যবধানে পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় কমেছে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ। বছরের প্রথম তিন মাসে তৈরি পোশাকের একটি ধরন ওভেন থেকে আয় হয়েছে ৫১৩ কোটি ৮৪ লাখ এবং অন্য বৃহৎ ধরন নিটওয়্যার থেকে আয় হয়েছে ৬৬০ কোটি ডলার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ^ব্যাপী মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এটা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ সুদের হার বাড়িয়েছে। যে কারণে পোশাক রপ্তানি অনেকটা কমে গেছে। এটার পরিমাণ ১৫-২০ শতাংশের বেশি।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ফারুক হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, পোশাক রপ্তানি শুধু বাংলাদেশের কমেছে এমন নয়, চীন-ভিয়েতনামসহ অন্যান্য দেশেরও কমেছে। তাদের থেকে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। মূলত সুদের হার বৃদ্ধি কারণে ইউরোপ ও আমেরিকার জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এজন্য তারা অতিরিক্ত পোশাক ক্রয় থেকে বিরত থাকছেন। মূল্যস্ফীতি কমে গেলে সুদের হারও কমবে। এ সময় আমাদের রপ্তানিও বেড়ে যাবে।

কবে নাগাদ এ সমস্যার সমাধান হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন বিশ^ব্যাপী মূলস্ফীতি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে রপ্তানি বাড়বে। সে ক্ষেত্রে ডিসেম্বর নাগাদ সময় লাগতে পারে বলেও মনে করেন এ ব্যবসায়ী নেতা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের এপ্রিল-জুন মাসে আরএমজি খাতে মোট রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ২৬৯ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। সেখানে আয় হয়েছে ১ হাজার ১৭৩ কোটি ৯১ লাখ ডলার। যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭.৫৫ শতাংশ কম।

এপ্রিল-জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, কানাডা এবং বেলজিয়াম ছিল বাংলাদেশের আরএমজি রপ্তানির শীর্ষ গন্তব্য। এ ৯টি দেশ থেকে বাংলাদেশ ৮৩২ কোটি ৯১ লাখ মার্কিন ডলার আয় হয়েছে আরএমজি খাত থেকে। হিসাব অনুযায়ী যা মোট আরএমজি রপ্তানির প্রায় ৭১ শতাংশ।

সবশেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের মন্তব্য ছিল কভিড-১৯ মহামারীর পরে বাংলাদেশে আরএমজি সেক্টর পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। তাছাড়া চলমান রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এর ফলে সাপ্লাই চেইন ব্যাঘাতের প্রভাব, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি এবং ফেড কর্তৃক আর্থিক নীতি কঠোর করার মতো চ্যালেঞ্জগুলো এ সেক্টরের অগ্রগতিকে প্রভাবিত করতে পারে। এ চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির জন্য, আন্তঃপোশাক বৈচিত্র্য, উৎপাদনশীলতা এবং দক্ষতা বৃদ্ধি, পণ্যের উদ্ভাবন, নতুন বিশ্ববাজার অন্বেষণ এবং এমজিকর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, পুরো অর্থবছরের চিত্র আলাদা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক দুর্বল আর্থিক পরিস্থিতির মধ্যেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড পরিমাণ ৫ হাজার ৫৫৬ কোটি ডলারের রপ্তানি আয় এসেছে। মূলত পোশাক রপ্তানির ওপর ভর করে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় অর্জিত হয়েছে গত বছর, যা এর আগের বছরের (২০২১-২২) তুলনায় ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি। বিদায়ী অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেড়েছে। এ সময়ে পোশাক রপ্তানির আয় দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৬৯৯ কোটি ১৬ লাখ ডলার। প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানির আয় ছিল ৪ হাজার ২৬১ কোটি ৩১ লাখ ডলার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত