রাষ্ট্রের মুখচ্ছবি

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:১৮ পিএম

(গতকাল বুধবারের পর)

মানুষের দুর্দশা ও দারিদ্র্য তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। আর ছিল অমলেন্দুর প্রস্তাব, এখানে আমাদের সঙ্গে থেকে যাও। মেরি টাইলারের পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ মোটেই সহজ ছিল না। এপারে ওপারে দুই মেরুর দূরত্ব। তবু থাকবারই সিদ্ধান্ত নিলেন মেরি টাইলার। অমলেন্দুর পরিবারের সঙ্গে হৃদ্যতা জন্মে গেছে তার ইতিমধ্যেই। বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গেও। অমলেন্দু বড় চাকরি নিতে পারতেন কলকাতার বাইরে গিয়ে, ভারতেই। কিন্তু তিনি কলকাতাতেই রয়ে গেছেন, সেই বিলাসবিমুখতা বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল মেরি টাইলারকে। আড়ম্বরহীন এক অনুষ্ঠানে বিয়ে হয়েছিল তাদের। তারপরে ওই গ্রাম দেখতে যাওয়া, এবং কারাগারে একটানা পাঁচ বছর বিনা বিচারে।

মেরি টাইলারের ভারত মোটেই আধ্যাত্মিক নয়, একেবারেই ইহজাগতিক, মূলত তা কারাগারের। না, কারাগারের বিষয়ে তার আদৌ কোনো আগ্রহ ছিল না, বিন্দুমাত্র নয়। সেটা ছিল অপর মেরির, মেরি কার্পেন্টারের, রামমোহনের ওপর যিনি বই লিখেছেন, ভারতবর্ষে এসে যিনি কারাগারে কারাগারে ঘুরেছেন সংস্কারের সুপারিশ করবেন বলে, অথচ অদৃষ্টের পরিহার এমনি যে, মেরি টাইলারকে কারাগার সম্পর্কে প্রত্যক্ষ বাস্তবিক অভিজ্ঞতা লাভ করতে হলো। এ কারাগার মেরি কার্পেন্টার দেখেননি, বহিরাগত কোনো পরিদর্শকের পক্ষেই একে দেখা সম্ভব নয়, দেখতে হলে ভেতরে থাকতে হয়, রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে মেরি টাইলার তাই ছিলেন।

রাজনৈতিক মহিলা বন্দিদের অন্তত দুজনকে দেখেছেন তিনি, জয়প্রকাশ নারায়ণের ইন্দিরাবিরোধী আন্দোলনের সময়। কারাগার তাদের জন্য দ্বিতীয় গৃহ, খাট-মশারি, সেবা-যত্ন, খাবার-দাবার সবই পান উৎকৃষ্ট রকমের, কারও সঙ্গে মেশেন না, সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে কথাবার্তা নেই, যাওয়ার সময় সঙ্গে করে অব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে যান বেঁধেসেধে। মেরি টাইলারের জেল রবিনসন ক্রুশোর দ্বীপের মতোই। সেখানে স্বাভাবিক জীবনযাপনের কোনো উপকরণই নেই, বলতে গেলে। চৌকি নেই, মশারি নেই, জুতো নেই। জামা-কাপড় পাওয়া যায় না। খাদ্যের বরাদ্দ সামান্য, তাও চুরি হয়ে যায় মাঝপথে। পড়বার বই নেই, লিখবার কাগজ নেই, পায়খানা তো ঘরের ভেতরেই। নর্দমা থেকে ভগ ভগ করে গন্ধ বের হয় সর্বক্ষণ।

মেরি টাইলারের ভেঙে পড়বার কথা ছিল। বিনা অপরাধে গ্রেপ্তার হয়েছেন, প্রথমে আশা ছিল দু’চার দিনের ভেতরেই ছাড়া পেয়ে যাবেন। সেই আশা বিশেষ পুলিশ বাহিনীর লোকেরা জেলের ভেতর এসে সযতেœ ভেঙে দিয়ে গেছে, চুরমার করে। তারা বলেছে, অমলেন্দুর যে ফাঁসি হচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মেরির শাস্তি হবে কম করে হলেও বিশ বছরের। কোনো দিন যদি তিনি ছাড়াও পান তবে কলকাতায় আর যেতে পারছেন না। যে-গন্ধ তার গায়ে লেগেছে তাতে কলকাতায় থাকা অসম্ভব। তাহলে উপায়? উপায়ও তারা বাৎলে দিয়েছে। স্বীকারোক্তি দিতে হবে। কীসের স্বীকারোক্তি? কী তার অপরাধ? মেরি টাইলার খুঁজে পাননি। তাহলে আরেক পথ রয়েছে। আলাদা করে তার জন্য বিচারের ব্যবস্থা করা। সেই উদ্দেশে আবেদন করতে হবে। তিনি খালাস হবেন, এবং ভারত ছেড়ে স্বেচ্ছায় চলে যাবেন।

মেরি টাইলার এ আলাদা বিচারেও সম্মত হতে পারেননি। তার মনে হয়েছে পুলিশের ওই প্রস্তাবে রাজি হলে তার সহবন্দিদের প্রতি কেবল বিশ্বাসঘাতকতা নয়, তাদের ক্ষতি করা হবে। রাজি না হওয়ায় পচতে হয়েছে জেলে। বছরের পর বছর গেছে, বিচার হয়নি।

পাঁচ বছর পরে অত আড়ম্বর করে হঠাৎ যে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো সে কোনো অলৌকিক কারণে নয়। একেবারেই বাস্তবিক ঘটনাসমূহের টানাপড়েনে। আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছিল না। যে জন্য পরে, সাত বছর পরে কাউকে, কাউকে ৯ বছর পরে বেকসুর খালাস করে দিতে হয়েছে। কেবল চারজনের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল সাত বছর করে জেলের, ততদিনে তাদের সাত বছর জেল খাটা সারা হয়ে গিয়েছিল, তাই তাদেরও ছেড়ে দিতে হয়েছে।

হ্যাঁ, নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছিল না তা সত্যি, কিন্তু আরও অন্তত চার বছর অনায়াসে জেলে থেকে যেতে পারতেন মেরি টাইলার, সেটা পারলেন না তার কারণ হচ্ছে বিলেতে তার আপনজনেরা ইতিমধ্যে হট্টগোল সৃষ্টি করেছিলেন, তার কারাবাসের ঘটনার ওপর চোখ পড়েছিল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের, খোঁজ নিচ্ছিল ব্রিটিশ সরকার; সেই কারণেই মামলা তুলে নেওয়া, স্যালুট দিয়ে বিদায় করে দেওয়া।

জেলে গিয়ে মেরি টাইলার কারাবিধির খোঁজ করেছিলেন, যাতে তিনি বুঝতে পারেন কী তার কর্তব্য, কতটুকু তার প্রাপ্য। বলা বাহুল্য, সেই বিধি কেউ তাকে দেখাতে পারেনি। কারা প্রশাসন তাহলে চলছে কী করে? চলছে তার আপন নিয়মে। অথবা চলছে সেই নিয়মে যে-নিয়মে রাষ্ট্র চলছে। নিয়মটা আর কিছুই নয়, শোষণ। বড় মাছ ছোট মাছদের ধরে ধরে খাবে, এই নিয়ম জেলের বাইরে যেমন ভেতরেও তেমনি, এক ও অভিন্ন। কয়েদিদের মধ্যে থেকে বাছাই করে কাউকে কাউকে সর্দার করা হয়েছে। তাকে তখন পায় কে, সঙ্গে সঙ্গে জালেমের ভূমিকা নিয়ে নেয়, কর্মকর্তাদের একজন হয়ে যায় সে, বিনাদ্বিধায়। আর আছে ঘুষ। কয়েদিরা ঘুষ দেয় কর্মচারীদের, আর কিছু না থাক, খাবারের রেশন তো আছে, তার অংশবিশেষ নিয়ে নিতে গররাজি হয় না জেল প্রশাসকরা। ওয়ার্ডার ঘুষ দেয় হেডওয়ার্ডারকে। হেডওয়ার্ডার তার ওপরওয়ালাকে। নইলে বদলি করে দেবে, কে জানে হয়তো-বা চাকরিই থাকবে না। জেল সুপার ঘুষ দেন মন্ত্রীকে। ইনকাম বলতে মেরি টাইলার আয় বোঝায় বলেই এতকাল জানতেন, এখানে এসে জানলেন, ইনকাম মানে হচ্ছে অবৈধ আয়। একজন মহিলা ওয়ার্ডার কেঁদে কেঁদে বলেছে মেরি টাইলারকে, হেডওয়ার্ডার তার কাছে ঘুষ চায়। না, টাকা নয়, অন্য কিছু।

শোষণের নানা চেহারা। একটি চেহারা বর্ণ-বিভেদ। জেলখানায় দেখেছেন তিনি সম্প্রদায়ের চেয়ে জাতি বড়, আর জাতি অর্থ হচ্ছে সোজাসুজি বর্ণ। হিন্দু-মুসলমান এক হয়ে যেতে পারে, গেছেও, দেখেছেন তিনি; কিন্তু উচ্চবর্ণ এক হয়নি নিম্নবর্ণের সঙ্গে। মেরি টাইলারের জাতি ছিল না, শ্রেণিও ছিল না, না-থাকায় তিনি এক হয়ে যেতে পেরেছিলেন সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে। তারাই তাকে বাঁচিয়েছে, নিঃসঙ্গতার পীড়া থেকে।

এই যে বিরাট অমানবিক যন্ত্র শোষণের, এর সঙ্গে ব্যক্তি পেরে উঠবে কেন? ব্যক্তি কেবলি ছোট হয়ে যায়। শুধু নৈতিকভাবে নয়, এমনকি দৈহিকভাবেও। কারাগারের মেয়েদের মধ্যে মেরি টাইলারকে মনে হতো দৈত্য যেমন দৈর্ঘ্য,তেমনি প্রস্থে, অথচ দৈর্ঘ্যে তিনি মাত্র পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি, ওজনে একশ’ বার পাউন্ড।

মেরি টাইলার ভগিনী নিবেদিতা নন। তিনি যোগ দেননি কোনো সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে। অথচ না যোগ দিয়েও জড়িয়ে পড়েছিলেন, হাজার হাজার তরুণ-তরুণীদের মতো। এ নিয়ে ওই যন্ত্রের প্রতি তিনি কোনো ক্ষোভ প্রকাশ করেননি, যে জন্য গোটা বইটিই একটা ধিক্কার ধ্বনিতে পরিণত হয়েছে, কেবল ভারতের নয়, তৃতীয় বিশ্বের সেইসব দেশের শোষণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই যেখানে মানুষ লাঞ্ছিত হয় মানুষের হাতে। রবিনসন ক্রুশো লড়েছিলেন বিরূপ প্রকৃতির বিরুদ্ধে, মেরি টাইলারের বই বলছে তৃতীয় বিশ্বে মানুষ লড়ছে বিরূপ আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। বড়ই ভয়ংকর সে লড়াই।

(সমাপ্ত)

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত