মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি বদলের অ্যাকশনে বাংলাদেশের ১ শতাংশ মানুষও আক্রান্ত নয়। এ অ্যাকশনের আগে তাদের দেওয়া স্যাংশনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার হার হিসাবের মধ্যেই পড়ে না। যে কারণে ৯৯.৯৯ শতাংশ মানুষই মার্কিন ভিসা পলিসির আওতামুক্ত। কিন্তু, এই বিশাল সংখ্যাকে দাবড়ায় ওই এক শতাংশ। এই হাতে গোনারাই দল, দেশ, সরকার চালায়। তাদের জনাকয়েকের কৃতকর্মের দায় সইতে হয় ৯৯.৯৯ শতাংশকে।
জাতিসংঘ বাংলাদেশে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে আসছে অনেকদিন থেকে। একই তাগিদ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের শক্ত-সামর্থ্যবান দেশগুলোরও। তাদের চশমার পাওয়ার এবং ঘড়ির সময় প্রায় কাছাকাছি। পারস্পরিক সহযোগিতা, অনুদান, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তাদের অন্যতম শর্ত এখন অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও নির্বাচন। এর আগে, কয়েকজন র্যাব কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া স্যাংশনের তাপ-চাপ পড়েছে সরকারের ওপর। আরও স্যাংশন আসার গুঞ্জন-গুজবের মধ্যে এলো যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা রেস্ট্রিকশন নীতি। ভিসা রেস্ট্রিকশনে নির্বাচনের উল্লেখ একেবারে স্পষ্ট। আর স্যাংশনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছিল মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়ন-গুম-অপহরণের কথা।
স্যাংশন আর রেস্ট্রিকশন দুটাই অ্যাকশন। কোনটা বেশি কড়া-চড়া, তুলনামূলক নরম বা গরম এ সংক্রান্ত কিছু মেঠো আলাপ চলছে। ব্যাখ্যার বাজারও জমেছে। যার যা ইচ্ছা বলে যাচ্ছেন। কোন দলের লাভ, কোন দলের ক্ষতি সেই বিশ্লেষণও বাদ যাচ্ছে না। কেউ বলার চেষ্টা করছেন মার্কিন ‘ভিসা রেস্ট্রিকশন’ আর ‘স্যাংশন’ এক জিনিস নয়। ‘ভিসা রেস্ট্রিকশন’ দেয় ‘ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট’। আর ‘স্যাংশন’ দেয় ‘ডিপার্টমেন্ট অব ট্রেজারি’। তাই ভিসা রেস্ট্রিকশন স্যাংশনের চেয়ে মামুলি। রেস্ট্রিকশনটি মামুলি বা নতুন কোনো স্যাংশন না হয়ে থাকলে এত ঘটা করে ঘোষণা দেওয়া জরুরি হলো কেন? এ প্রশ্নও আছে। এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয় প্রশ্নটি। বাংলাদেশ যে গণতন্ত্র সূচকে তলানিতে চলে যাচ্ছে তা যুক্তরাষ্ট্র কথা-কাজে বুঝিয়ে আসছে অনেক দিন থেকে। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের গণতন্ত্র সম্মেলনে বাংলাদেশকে পরপর দু’বছর না ডাকার মধ্যে সেই বার্তা স্পষ্ট করা হয়েছে। আর ‘নজর রাখা বা অপেক্ষা করে দেখছে’র মতো কূটনৈতিক ভাষার মারপ্যাঁচে জানানো হচ্ছে, অবস্থার পরিবর্তন না হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কারও ওপর শুধু ভিসা রেস্ট্রিকশন দিলে সে ওই দেশে ঢুকতে পারবে না। কিন্তু কারও ওপর ম্যাগনেটস্কি অ্যাক্টে স্যাংশন দিলে সে ওই দেশে ঢুকতে তো পারবেই না, ওই দেশে থাকা তার সহায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে। বাতিল হয়ে যাবে তার ভিসা কার্ড, মাস্টার কার্ডসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা। ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ দেশের কোনো ব্যাংকে সে অ্যাকাউন্ট রাখতে পারবে না। তার সারমর্ম হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য দেশে গেলেও তাকে ক্যাশ টাকা দিয়ে সব কাজ করতে হবে।
মার্কিন ভিসা রেস্ট্রিকশন নীতিতে এ সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলা নেই, এ সরকারের অধীনে নির্বাচন না হওয়ার কথাও নেই। যা নিয়ে সরকার ও বিরোধীরা যে যার মতো বোঝানোর চেষ্টা করছে। বর্তমান সরকারের অধীনে গত দুটি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াতেই এত কথা। তারা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে নারাজ, অথবা অক্ষম। সুষ্ঠু নির্বাচন আদায়ে বিরোধী দলের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ, তারা সরকারকে কার্যকর চাপে ফেলতে পারেনি। তাদের ভরসা এখন বিদ্যমান স্যাংশন এবং ভিসা রেস্ট্রিকশনসহ আন্তর্জাতিক চাপ। দৃশ্যত এবং মাঠের রাজনীতিতে সরকার এ ব্যাপারে বেশ পাকা। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আঁতাত করে আওয়ামী লীগকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসার পাঁয়তারার অংশ হিসেবে স্যাংশন এনেছে বিএনপি। এখন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি বদলে যাওয়ায় বিএনপির মুখ শুকিয়ে গেছে। সরকার সুষ্ঠু-সুন্দর নির্বাচন করতে চায়। এ পথে বিএনপিই বড় বাধা। সেই বিবেচনায় বিএনপি নেতারাই রেস্ট্রিকশনে পড়বেন এমন কিছু কথা নিয়ে মাঠ গরম করছেন সরকারদলীয় নেতারা। অন্যদিকে, বিএনপির মধ্যে একটা উইন-উইন ভাব। সেইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও উন্নয়নের চেষ্টা। এর বিপরীত অবস্থান নিয়ে গোলমাল বাধিয়েছে সরকার। নানা তিক্ত কথায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি টাগ অব ওয়ার অবস্থা করে ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান বদলায়নি। এতদিন নিরপেক্ষ-সুষ্ঠু নির্বাচনের অপেক্ষার কথা জানিয়েছে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এখন তারা আর ‘অপেক্ষার’ পর্বে নেই, যার নমুনা ভিসা রেস্ট্রিকশনে। এর মূল কথা আগামী নির্বাচনে কোনো অনিয়ম হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মার্কিন ভিসা দেওয়া হবে না। তাদের পরিবারের সদস্যদেরও একই দশা হবে। সপ্তাহ কয়েক আগে নাইজেরিয়ায় নির্বাচনী অনিয়মে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র এ রকম সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। আর দক্ষিণ এশিয়ায় রেস্ট্রিকশন আছে একমাত্র আফগানিস্তানের তালেবানদের ওপর। নাইজেরিয়ার ক্ষেত্রে শুধু সরাসরি নির্বাচনী অনিয়মে জড়িতদের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর আওতা আরও বিস্তৃত। এর আগে স্যাংশন কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দিয়ে গেলেও রেস্ট্রিকশনে সরকার, বিরোধী দল, এমনকি বিচার বিভাগে সম্পৃক্তদের কথাও বলা হয়েছে। তার মানে বাংলাদেশের নির্বাচনী অনিয়মে শুধু সরকারি কর্তাব্যক্তি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নন, বিচার বিভাগের সদস্যদেরও সংশ্লিষ্ট ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র।
নতুন ভিসানীতিতে চার ধরনের কর্মকাণ্ডকে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১. ভোট কারচুপি, ২. ভোটার ইনটিমিডেশন, ৩. সহিংসতার মাধ্যমে জনগণের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার লঙ্ঘন এবং ৪. রাজনৈতিক দল, ভোটার, নাগরিক সমাজ ও সংবাদমাধ্যমের মতপ্রকাশের অধিকার হরণ। ১ ও ২ প্রযোজ্য হবে নির্বাচনের সময়। ৩ ও ৪ এখন থেকেই বলবৎ। অভিধানে স্যাংশনের বাংলা অনুমোদন বা বরাদ্দ হলেও কূটনৈতিক বাস্তবতায় এর অর্থ নিষেধাজ্ঞা, বাধ্য করা ইত্যাদি। স্যাংশনের পর ভিসা রেস্ট্রিকশন পর্ব। যদিও সরকার থেকে বলা হচ্ছে, এতে মাথাব্যথার কিছু নেই। বদার করার বিষয় নয় এটি। বাস্তবে বদার করছে। মাথাব্যথা করছে। বিচলিত না হওয়ার ভান করলেও ভেতরের টেনশন ঢাকতে গিয়ে বলছে, এ রেস্ট্রিকশন সরকারের অনুকূলেই। বেশি প্রতিকূলে পড়বে বিএনপি। এ ধরনের হরেকমুখী কথায় ভেজাল আরও পাকছে। প্রকারান্তরে বহিঃপ্রকাশ ঘটছে সরকারের ভেতরের উদ্বেগের। আবার মাঝেমধ্যে সুর-স্বর পাল্টে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হয়ে গেছে বলেও বার্তা দেয় সরকার। রেস্ট্রিকশনের পর বড় জোর একদিন বাঁকাতেড়া কথা বললেও পরদিন থেকে ক্ষমতাসীন দলে একেবারে ইউটার্ন। বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অব্যাহত অঙ্গীকারের প্রতি জোরালো সমর্থনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রশংসা নিবেদন করে সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতির বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘তারা (যুক্তরাষ্ট্র) বলেছে নির্বাচনে বাধা দিলে ভিসা নয়। এটা আমাদেরও কথা।’
উল্টাপাল্টা কথার মধ্যে আবার সুবোধ বনে যাওয়ার বাঁকে কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, তাদের সমমনা অন্যান্য দেশের যতœআত্তি বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার। তার ওপর বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের প্রটোকল তুলে নেওয়াসহ নানান দুঃখজনক কথার কাফফারা দিচ্ছে। ভেতরে-ভেতরে তাদের প্রটোকল-সমাদর এখন আরও বেশি দিচ্ছে। তোয়াজ-তোষণও বেড়েছে। অথচ, ঢাকায় অবস্থিত মিশন ও কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিয়ে হেন বাজে কথা নেই যা না বলা হয়েছে মাত্র ক’দিন আগে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী শর্তসাপেক্ষে তাদের প্রটোকল বহালও করা হয়েছে, যদিও কী সেই শর্ত তা পরিষ্কার নয়। অবস্থা যেখানে গড়িয়েছে সেখানে এ ছাড়া আপাতত উপায়ও নেই সরকারের। যত সমালোচনা ও বিতর্কই থাকুক, বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের চাওয়া-পাওয়ার বাইরে যায় না। আরও নানান বাস্তবতা বুঝে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের দরবারে কেবল ক্ষমতাহীন বিএনপি নয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের বিশ্বস্ত বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নেতারাও যাতায়াত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মিষ্টি-মধুর মেলবৈঠক করেন। সুর কাছাকাছি সবার। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতির সঙ্গে তারাও একমত বলে তাদের কোরাস সুর মি. হাসসহ বিদেশি কূটনীতিকদের জন্য বিনোদনের মতো।
মঞ্চে নানা খিঁচুনি, বড় বড় কথা, রঙ্গব্যঙ্গ, আবৃত্তির ডায়ালগ ছাড়লেও সময়দৃষ্টে নানান জায়গায় কুর্নিশ বা নেতিয়ে পড়ায় লাজ-শরমের বালাই কোনোকালেই ছিল না রাজনীতিকদের কারও কারও। এখন তা চলছে যুক্তরাষ্ট্রের রেস্ট্রিকশন নিয়ে। এর কিছুটা জের বা ছায়া পড়েছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বাধা দিলে কেবল জড়িতদের নয়, তাদের পরিবারের সদস্যদেরও যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা দেওয়া হবে না এমন কঠিন ঘোষণার পরপরই হয়েছে গাজীপুর সিটি নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনসহ সরকারি মহলের ‘ঠাকুর ঘরে কে? আমি কলা খাই না’ চাতুরী এখানেও। বেশি বেশি করে বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের রেস্ট্রিকশনের কারণে নয়, গাজীপুরের নির্বাচন এমনি এমনিতেই সুষ্ঠু হয়েছে। যার মধ্য দিয়ে এ স্থানীয় সরকার নির্বাচনটি সময় ও ঘটনাচক্রে জাতীয় নির্বাচনের চেয়েও বেশি, এমনকি আন্তর্জাতিক নির্বাচনের কাছাকাছি চলে গেছে। তা বোধগম্য হওয়া কঠিন নয়। যার মধ্যে হাসি-বিনোদনের মসলার পাশাপাশি আগামী নির্বাচনের কিছু নমুনাও বিদ্যমান।
লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক
