ড. ইউনূসের মামলা

প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বনেতাদের খোলা চিঠি

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৩, ০৪:২৪ এএম

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘন ও দুর্নীতির মামলা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন বিশ্বে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্বস্থানীয় দেড় শতাধিক ব্যক্তি। তাদের মধ্যে শতাধিক নোবেল বিজয়ী রয়েছেন। গতকাল সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোভিত্তিক জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান সিজিয়ন পিআর নিউজওয়্যার তাদের ওয়েবসাইটে এই চিঠি প্রকাশ করেছে।

চিঠিদাতাদের মধ্যে বারাক ওবামা, শিরিন এবাদি, ওরহান পামুক, জোসেফ স্টিগলিৎজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শতাধিক নোবেল বিজয়ী আছেন। এ ছাড়া জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন, যুক্তরাজ্যের ভার্জিন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ধনকুবের স্যার রিচার্ড ব্রানসনসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি রয়েছেন চিঠিদাতাদের তালিকায়।

চিঠিতে যা লিখেছেন : নোবেল বিজয়ী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় এবং বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে আমরা আপনার কাছে লিখছি। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে আপনার দেশ যেভাবে প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা আমরা স্বীকার করছি। অবশ্য সম্প্রতি বাংলাদেশে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রতি যে হুমকি দেখা গেছে, তা নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা বিশ্বাস করি, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু এবং দেশের প্রথম সারির দলগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়াটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিগত দুটি নির্বাচনের বৈধতার ঘাটতি রয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে মানবাধিকারের প্রতি যেসব হুমকি রয়েছে, তার মধ্যে একটি আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সেটি হলো শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলা। আমরা এ কারণে শঙ্কিত যে সম্প্রতি তাকে নিশানা করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি ধারাবাহিক বিচারিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে আমরা মনে করি। তার নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে ৪০ জন বিশ্বনেতা আপনার কাছে যে চিঠি লিখেছিলেন, তার ওপর ভিত্তি করেই এই চিঠি লেখা হয়েছে।

আমরা সম্মানের সঙ্গে আপনার প্রতি অবিলম্বে অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক কার্যক্রম স্থগিতের আহ্বান জানাচ্ছি। এরপর আন্তর্জাতিকভাবে আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃত ব্যক্তিদের নিয়ে একটি নিরপেক্ষ বিচারক প্যানেলের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করা হোক। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে তার বিরুদ্ধে দুদক ও শ্রম আইনে যেসব মামলা চলছে, সেগুলো পর্যালোচনা করলে তার দোষ খুঁজে পাওয়া যাবে না।

আপনি জানেন অধ্যাপক ইউনূস যে কাজ করেন, তা আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। সামাজিক ব্যবসা কীভাবে আন্তর্জাতিক অগ্রগতি আনতে পারে, তা তিনি দেখিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে শতভাগ দারিদ্র্য বিমোচন, বেকারত্ব দূর করা এবং কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে অগ্রগতির বিষয় রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিরা কীভাবে বৈশ্বিক অগ্রগতিতে অবদান রাখছে, তার নেতৃত্বস্থানীয় দৃষ্টান্ত তিনি। কোনো ধরনের নিপীড়ন ও হয়রানি ছাড়া স্বাধীনভাবে তিনি তার পথপ্রদর্শনমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে পারবেন বলে আমরা আশা করছি।

আমরা আশা করি, আপনি এসব আইনগত বিষয়ের যথাযথ, নিরপেক্ষ ও ন্যায্যতা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখবেন। পাশাপাশি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করবেন। একই সঙ্গে সব ধরনের মানবাধিকার রক্ষার প্রতি সম্মান দেখানো নিশ্চিত করবেন। আগামী দিনগুলোতে এসব বিষয়ের সুরাহা কীভাবে হবে, তা দেখার জন্য বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ নজর রাখছে। আমরাও সেই সব মানুষের কাতারে রয়েছি।

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আরও ১৮ মামলা : শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ও গ্রামীণ টেলিকমের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ১৮ বাদীর পক্ষে ১৮টি মামলা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানকে বিবাদী করা হয়েছে। মামলায় ওই প্রতিষ্ঠানের সাবেক ১৭ জন এবং বর্তমানে কর্মরত ১ জনের ২১ কোটি ৪১ লাখ ১৭ হাজার ১৬৩ টাকা পাওনা দাবি করা হয়েছে।

গতকাল সোমবার ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে এ মামলাগুলো হয়। শুনানি নিয়ে শ্রম আদালতের চেয়ারম্যান (জেলা ও দায়রা জজ) বেগম শেখ মেরিনা সুলতানা ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে সমন জারি করেছেন। ১৮ মামলার মধ্যে প্রথম ৯ বাদীর মামলায় আগামী ১৬ অক্টোবর এবং পরবর্তী ৯ বাদীর মামলায় ১৮ অক্টোবর ড. ইউনূসকে সমনের জবাব দিতে বলা হয়েছে। আদালতে বাদীপক্ষে এই মামলাগুলো করেন অ্যাডভোকেট মশিউর মালেক ও অ্যাডভোকেট মো. হেলালউদ্দিন। শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে করা একটি মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে।

আইনজীবী হেলালউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৮ বাদীর মধ্যে ১৭ জন ইতিমধ্যে অবসরে গেছেন। ১ জন এখনো কর্মরত রয়েছেন। তারা ২০০৬ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশের ৫ শতাংশ শ্রমিকদের বুঝিয়ে দিতে হয়। কিন্তু ড. ইউনূস ও তার প্রতিষ্ঠান ১৭ বছরেও তা করেননি। এতে শ্রম আইনের ২১৩ ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালত সমন জারি করেছেন।’

ড. ইউনূসের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তারা লভ্যাংশ দাবি করলেও ২০০৬ সালের আইনের ২৩২ ধারায় শিল্প সম্পর্কিত কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের কথা বলা হয়েছে। গ্রামীণ টেলিকম তো শিল্প সম্পর্কিত কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। তাই তাদের দাবি সঠিক নয়। আমরা মামলার বিষয়টি শুনেছি। সমনের অনুলিপি পেলে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে নির্দিষ্ট লভ্যাংশ জমা না দেওয়া, শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী না করা, গণছুটি নগদায়ন না করে শ্রম আইনের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ এনে ড. ইউনূসসহ প্রতিষ্ঠানের চারজনের বিরুদ্ধে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার শ্রম আদালতে মামলা করে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তর। এরপর এ মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ড. ইউনূসের পক্ষে উচ্চ আদালতে আবেদন করলেও তা টেকেনি। এ মামলায় ২২ আগস্ট ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত