‘গতিহীন’ বিএনপির নতুন ছক

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৩, ০৪:২৬ এএম

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে এক দফার আন্দোলন করছে বিএনপি ও সমমনা প্রায় ৩৬টি দল। সমস্যা হচ্ছে, তাদের আন্দোলনে প্রারম্ভিক গতি এখন নেই। ১২ জুলাই এক দফার আন্দোলন শুরু হয়েছিল। গত এক মাসে সেটি পথ হারিয়েছে। ২৮ জুলাইয়ের মহাসমাবেশের পর রাজপথে বিএনপির ধারাবাহিক আন্দোলনের কর্মসূচি থাকলেও অনেকের মতে, তাতে রাজনৈতিক স্পৃহার (স্পিড) বড্ড অভাব।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোতে অবস্থান কর্মসূচি সফল করতে না পারায় বিএনপির এ দশা। তাদের শরিকরা কর্মসূচির গতি হারানোর বিষয়টি স্বীকার করে সমন্বয়হীনতা ও কিছু কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। তারা মনে করেন, ২৯ জুলাইয়ের কর্মসূচিতে সমন্বয় না থাকায় আন্দোলনে ধাক্কা লেগেছে। ঝড়-বৃষ্টিও একটা কারণ, ১৫ আগস্টকেন্দ্রিক ঘটনাবলির কারণেও যুগপৎ কর্মসূচিতে গতি ছিল না। এ সুযোগে রাজপথে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক কর্মকান্ড বাড়িয়েছে। ক্ষমতাসীনরা তাদের শক্তি প্রদর্শন করে যাচ্ছে।

বিএনপির শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকার প্রবেশমুখে অবস্থান কর্মসূচিতে আমাদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। ফলে আন্দোলন কিছুটা শ্লথ হয়েছে। আগস্টের টার্গেটও আমরা পূরণ করতে পারিনি। এখন আমাদের আন্দোলনের কৌশল পুনর্বিন্যস্ত করতে হচ্ছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতার মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ও বিভিন্ন এলাকায় সংঘাত-সহিংসতায় দলের দুর্বলতা আবারও স্পষ্ট হয়েছে। অবস্থান কর্মসূচির এক সপ্তাহের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার স্ত্রী জোবাইদা রহমানকে দুদকের মামলায় সাজা, আরও অনেক নেতাকর্মীর আসামি হওয়া প্রভৃতি কারণে বিএনপির আন্দোলন মন্থর হয়েছে।

আগামী ১ সেপ্টেম্বর দলটির ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য র‌্যালি রয়েছে। তাতে নেতাকর্মীদের ব্যাপক অংশগ্রহণের পরিকল্পনা করছে হাইকমান্ড। এতেও নরম কর্মসূচির ঘোষণা আসছে বলে দলটির একাধিক নেতা জানিয়েছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি সতর্কভাবে এগোচ্ছে। সেপ্টেম্বরে আন্দোলনের গতি বাড়বে। এর ধরন নিয়ে দলে আলোচনা চলছে। আন্দোলনে থাকা নেতারাও পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে বিএনপি শান্তিপূর্ণ পথেই এগোবে। জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তা কঠোর হতে পারে।’

বিএনপির একাধিক সূত্র বলছে, মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে এক দফার আন্দোলনে গতি বাড়াতে চায় বিএনপি। ঢাকায় ফের মহাসমাবেশ, গণসমাবেশ বা বড় ধরনের কর্মসূচির চিন্তা রয়েছে হাইকমান্ডের। চূড়ান্ত আন্দোলনের ‘শেষ ধাপ’ শুরু হবে, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তা চলবে। তখন কর্মসূচি হবে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক। বিচারালয়ের সামনে অবস্থান ছাড়াও নির্বাচন কমিশন, গণভবন, সচিবালয় প্রভৃতি ঘেরাও এবং টানা অবস্থান কর্মসূচির চিন্তা রয়েছে। শরিকদের সঙ্গে আলোচনাও চলছে। এ সপ্তাহেই বিএনপির সঙ্গে লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক হবে।

সাইফুল হক বলেন, ‘সেপ্টেম্বরে আন্দোলনে গতি বাড়াতেই হবে। অবস্থান কর্মসূচি, বিক্ষোভ-অবরোধ, ঘেরাও নিয়ে আলোচনা হয়েছে। লাগাতার হরতাল দেওয়ার বিষয়ে শরিকদের পরামর্শ ও চাপ রয়েছে।’

গত ২৮ জুলাই ঢাকায় মহাসমাবেশ করেছিল বিএনপি। তখন পরিকল্পনা ছিল ঢাকাকেন্দ্রিক লাগাতার কর্মসূচির মাধ্যমে দ্রুত লক্ষ্যে পৌঁছানো। কারণ মহাসমাবেশ ঘিরে সারা দেশের লাখ লাখ নেতাকর্মী তখন ঢাকায় ছিল। কিন্তু পরদিন ঢাকার প্রবেশপথে অবস্থান কর্মসূচি দলের চাহিদা অনুযায়ী না হওয়ায় লাগাতার কর্মসূচি থেকে সরে গিয়ে যুগপৎ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত নরম কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। ২৯ জুলাইয়ের কর্মসূচিতে গাফিলতির দায়ে নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছে দলটি। অনেককে মৌখিকভাবে শাসানো হয়েছে।

দলটির দুজন ভাইস চেয়ারম্যান ও যুগ্ম মহাসচিব পর্যায়ের নেতা জানান, নভেম্বরে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা হতে পারে। সে হিসাবে দুই মাসের সময় রয়েছে। বিএনপির মধ্যে সরকারের উসকানিতে পা না দিয়ে ওই সময়টাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় সে আলোচনাই চলছে। নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে সহসাই কোনো সমঝোতা হতে পারে। সরকারের মনোভাব সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে বিএনপি। মার্কিন ভিসানীতিসহ গণতান্ত্রিক বিশ্বের অব্যাহত চাপের মুখে সরকার তাদের অবস্থান বদলাবে নাকি বিরোধী দলকে কোণঠাসা করার চেষ্টাই করবে তা দেখা হচ্ছে। বিএনপি মনে করে আগের মতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে আন্দোলন দমনের পথে হাঁটবে সরকার। এটি ধরে নিয়েই আন্দোলনের নতুন রোডম্যাপ সাজাচ্ছে বিএনপি। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু চিকিৎসার জন্য এখন সিঙ্গাপুরে আছেন। তারা ফিরলে আন্দোলনসংক্রান্ত পর্যালোচনা সিদ্ধান্তের রূপ নেবে। রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আছে, আন্দোলন পরিকল্পনা নিয়ে সিঙ্গাপুরে আলোচনা হলেও হতে পারে।’

এখন বিএনপির পরিকল্পনা হচ্ছে, এক দফা দাবি আদায় করেই নির্বাচনে যাবে তারা। সরকার যদি এ দাবি উপেক্ষা করে একতরফা নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়, তাহলে বিএনপি সে নির্বাচনে যাবে না বরং তা প্রতিহত করবে। যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত সব দলের অবস্থান একই। যেসব দল যুগপতে নেই, কিন্তু অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন চায় তারাও ২০১৪ সালের মতো নির্বাচন বর্জন করবে।

বিএনপি মনে করে মহাসমাবেশে ও অবস্থান কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধা, সরকারি দলের হামলা-সন্ত্রাস ব্যাপকভাবে দেশ-বিদেশে সমালোচিত। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নিন্দা জানিয়েছে। এত সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। এটা বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে আন্দোলন সফল করতে কাজে দেবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরও চাপ তৈরি হবে।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চারটি বিষয়ের ওপর বিএনপির আন্দোলন নির্ভর করবে। আন্দোলন এখন কিছুটা গতিহীন। এর দুটি কারণ হতে পারে। প্রথমত, ২৯ জুলাই ঢাকার প্রবেশমুখে অবস্থান কর্মসূচিতে সাফল্য না পাওয়া। দ্বিতীয়ত, আগস্ট মাস শোকের মাস। সম্ভবত এ কারণে তারা কর্মসূচিতে গতি যুক্ত করতে পারেনি।’

তিনি বলেন, বিএনপির আগামীর আন্দোলন নির্ভর করবে দুটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, অক্টোবর-নভেম্বরে নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। পরিবেশ তখন আন্দোলনের পক্ষে থাকবে। তাই সেপ্টেম্বরে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে মাঠে থাকার। এটি নির্ভর করবে দলটির নেতাকর্মী ও দেশের জনগণ কতটুকু তাদের সঙ্গে রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ভোটের আগে বিএনপির মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটির ওপর আন্দোলনের গতি নির্ভর করবে।’

রাজপথে আন্দোলনে সিনিয়র নেতাদের অনুপস্থিতি বিএনপির সব পর্যায়ে ভাবাচ্ছে। রাজপথে নেতৃত্ব সংকট দৃশ্যমান। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সক্রিয়তা বা উপস্থিতির আশা করছে তৃণমূলের একটা বড় অংশ। তৃণমূলের নেতারা মনে করেন, চেয়ারপারসন যদি আন্দোলনে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখেন তাহলে সেটি সারা দেশের নেতাকর্মীদের উৎসাহিত করবে। বাস্তবতা হচ্ছে, অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে থাকায় তার পক্ষে সক্রিয় সম্ভব নয়। তাকে বাসায়ও নেওয়ার অবস্থা নেই। গত ১৮ দিন ধরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।

বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান দেশ রূপান্তরকে জানান, মহাসচিব ২৮ জুলাই তার মেডিকেল রিপোর্টের ফলোআপ দেখাবেন। আর তার স্ত্রী রাহাত বেগমের ২৯ আগস্ট চিকিৎসক শিডিউল রয়েছে। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে মহাসচিবের দেখা হয়েছে। তিনি আগের চেয়ে সুস্থ। মির্জা আব্বাস ও তার স্ত্রী মহিলা দল সভাপতি আফরোজা আব্বাস, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সিঙ্গাপুরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসকের ফলোআপ করিয়ে আগামী মাসের প্রথম দিকে দেশে ফিরতে পারেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত