বিমান সংস্থাগুলোর লাইসেন্সে অনীহা

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০২:০০ এএম

বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের কাজ পেতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা নানা উপায়ে লবিং করছে; বিশেষ করে তৃতীয় টার্মিনালের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর কে কাজ পাবে তা নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। বিমানও চাইছে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের কাজটি ধরে রাখতে। আবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান ডানাটাও চাইছে কাজ করতে। তবে কর্তৃপক্ষ চাইছে জাপানকে দিতে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ সব কটি বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের কাজ করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এরই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ইতিমধ্যে ১ হাজার কোটি টাকার সরঞ্জাম আনা হয়েছে। আরও ৭০০ কোটি টাকার সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনা করেছে সংস্থাটি। কিন্তু গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের কাজ পেতে হলে এয়ার নেভিগেশন অর্ডার (এএনও) সার্টিফিকেট করার কথা থাকলেও বিমান তা করেনি বলে অভিযোগ করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। এতে বছরে সংস্থাটির অন্তত ১০০ কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে লাইসেন্স করতে বিমানকে চিঠি দিয়েছে বেবিচক। এরপরও লাইসেন্স করার আগ্রহ না দেখালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের কাজ দেওয়া হবে অন্য কোনো সংস্থাকে। বিমানের পাশাপাশি বেসরকারি এয়ারলাইনসকেও বাধ্যতামূলক লাইসেন্স নিতে বলা হয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে দেশ রূপান্তরকে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ১৯৭২ সাল থেকে দেশের সব কটি বিমানবন্দরে এককভাবে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের কাজ করে আসছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। নিজেদের ফ্লাইটের পাশাপাশি ৩২টি ফ্লাইটের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের সেবা দিচ্ছে রাষ্ট্রের এ সংস্থাটি। তবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসসহ বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো নিজস্বভাবে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং করে আসছে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং এবং কার্গো পরিষেবার মাধ্যমে বিমান প্রতি বছর প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা আয় করছে। থার্ড টার্মিনালের দায়িত্ব পেলে ৪ হাজার কোটিতে গিয়ে ঠেকবে আয়ের পরিমাণ। কিন্তু সংস্থাটির কর্মকান্ড নিয়ে বেবিচক অনেকটা নাখোশ। রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানটি এএনও সার্টিফিকেট না নিলেও কোনো ব্যবস্থাও নেয়নি বেবিচক। এ জন্য বেবিচক বিমানকে একটি চিঠি দিয়েছে সম্প্রতি। পাশাপাশি ইউএস বাংলা এয়ারলাইনস ও নভো-এয়ারলাইনসকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে লাইসেন্স করে ফেলতে। তবে নবনির্মিত থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং সেবা প্রদানকারীদের বেলায় বাধ্যতামূলক লাইসেন্স গ্রহণের কড়াকড়ি আরোপ করেছে বেবিচক কর্তৃপক্ষ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই বিমান গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং করছে। অথচ তারা লাইসেন্স নিতে টালবাহানা করছে। এতে আমাদের বছরে অন্তত ১০০ কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে। লাইসেন্স করতে বিমানকে কয়েক দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। বিষয়টি আমরা মন্ত্রণালয় হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অবহিত করেছি। কারণ লাইসেন্স করলেও সরকারের কোষাগারেই অর্থ আসবে। নিয়মের মধ্যে থেকেই গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং করতে হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল কর্মকান্ড পুরোদমে হওয়ার পর আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের দায়িত্ব বিমানকে না দিয়ে জাপানকে দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বিষয়টি চূড়ান্ত হতে আরও দেড় বছর লাগতে পারে। এর মধ্যে বেবিচক দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠানকে সাময়িকভাবে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের দায়িত্ব দেবে। এতে বিমানের রাজস্ব আয় কমে আসবে।

জানতে চাইলে বেসাসরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, তৃতীয় টার্মিনালের কাজ প্রায় শেষের দিকে। ৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন। তবে পুরোদমে যাত্রী সেবা দেওয়া হবে আগামী বছরের মার্চ মাসে। কাজ শেষ হওয়ার পর গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে জাপানের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি। তারাই এর দায়িত্ব পেতে পারে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস গ্রাউন্ড হ্যাল্ডেলিং করছে। তবে তারা এখনো লাইসেন্স নেয়নি। যারাই গ্রাউন্ড হ্যাল্ডেলিংয়ের দায়িত্ব পালন করবে, তাদের অবশ্যই লাইসেন্স নিতে হবে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং লাইসেন্স নেওয়ার গেজেট ২০১৮ সালে করা হয়েছে। কেউ এখনো লাইসেন্স নেয়নি। এখন থেকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং করতে হলে বাধ্যতামূলক লাইসেন্স নিতে হবে। লাইসেন্স ছাড়া কেউ কাজ পাবে না। নীতিমালা অনুযায়ী আবেদন করলে বিমানও কাজ পেতে পারে।

বেবিচক সূত্র জানায়, তৃতীয় টার্মিনালের মেইনটেন্যান্স ও অপারেশনের কাজ জাপানকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের পিপিবি কর্তৃপক্ষ একটি ট্রান্সজেকশন যোগ করেছে, যার মাধ্যমে পুরো কাউন্সিল কন্ডিশন নিয়ে তারা সংযুক্ত হবে। জাপানের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিচালনার দক্ষতা রয়েছে। আর তাদের তত্ত্বাবধানেই গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং, কার্গো হ্যান্ডেলিংসহ সবই অপারেশনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ বেবিচককে জানিয়েছে, তাদের কাছে এখন অভিজ্ঞ কর্মী ও আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে, যা থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং করার জন্য উপযুক্ত। সম্প্রতি গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং পরিষেবার জন্য ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন থেকে নিবন্ধন এবং স্বীকৃতির প্রশংসাপত্র পেয়েছে। বিমান এই দায়িত্ব পেলে রাজস্ব পুরোটা দেশেই থাকবে। ইতিমধ্যে এক হাজার কোটি টাকার সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। আরও ৭০০ কোটি টাকার সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনা আছে বিমানের। একটি উড়োজাহাজ যখন কোনো বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন ও অবতরণ করে, তখন সেটিকে পার্কিং বেতে নেওয়া, বোর্ডিং ব্রিজ না থাকলে উড়োজাহাজের দরজার সিঁড়ি লাগানো, যাত্রীদের মালপত্র ওঠানো-নামানো, নতুন যাত্রী তোলার আগে উড়োজাহাজের ভেতর পরিষ্কার করা, এমনকি চেকইন কাউন্টারে দায়িত্ব পালনও গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের অন্তর্ভুক্ত বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে বেবিচক ও বিমানের দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিমানের রাজস্ব আয়ের বড় একটি অংশ আসে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং থেকে। বছরে আয় করছে ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা। তবে সংস্থটির সেবার মান ভালো নয়। তারপরও বিমান সেটি ধরে রাখতে চাইছে। সক্ষমতা থাকলেও বিদ্যমান টার্মিনালের অবকাঠামো দুর্বলতায় কাক্সিক্ষত সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। থার্ড টার্মিনাল চালু হলে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের পুরো সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারব আমরা। কিন্তু মনে হয় আমরা তা পাব না। জাপানকেই দেওয়া হবে। আরব আমিরাতের একটি সংস্থাও গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের দায়িত্ব পেতে নানাভাবে চেষ্টা করছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিইও শফিউল আজিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সঠিকভাবেই গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং করছি। বেবিচক যে নিয়ম করেছে তা আবশ্যই মানা হবে। লাইসেন্স নেওয়ার চেষ্টা চলছে।’ তিনি বলেন, ‘গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ে বিমানের ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিছু বিষয়ে যেসব অভিযোগ ছিল, তা বর্তমানে নেই। কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তৃতীয় টার্মিনাল চালু হওয়ার পর সেখানেও আমরা গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং যাতে করতে পারি, সে জন্য নীতিনির্ধারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত