দুদিনের সফরে আজ রবিবার ঢাকা আসছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন শেষে বাংলাদেশে আসবেন তিনি। ৩৩ বছর পর ফ্রান্সের আরেকজন প্রেসিডেন্টকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত ঢাকা।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চলমান বৈশি^ক অস্থিরতা, বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বিশ্বের চাপ, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে ফ্রান্সের আগ্রহ এবং আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক কারণে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের এ সফর গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্র।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, মাখোঁ কূটনৈতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি ঢাকার কয়েকটি স্থান পরিদর্শন করবেন। জানবেন এ দেশের সংস্কৃতি ও জীবনধারা সম্পর্কে।
বাংলাদেশ ও ফ্রান্স উভয় দেশই এ সফরকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। মাখোঁর বাংলাদেশ সফরের কারণেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লিতে তার সফরসূচি কাটছাঁট করেছেন। আজ জি-২০ সম্মেলন থেকে ফিরেই প্রধানমন্ত্রী বিমানবন্দরে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাবেন।
৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ফ্রান্সের দূতাবাস জানায়, ইমানুয়েল মাখোঁ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ফ্রান্সের কৌশল বাস্তবায়নের কাজ চালিয়ে যাবেন। এ সফর দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে চলা একটি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার এবং দেশটির আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বকে বৈচিত্র্যময় করার সুযোগ দেবে।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অন্যদের মধ্যে থাকছেন দেশটির ইউরোপ ও পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রী ক্যাথেরিন কলোন্না। এ সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হবে এবং তা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে বাংলাদেশ ও ফরাসি সরকার আশা করছে। মাখোঁর এ সফর সম্পর্কে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের বিষয়ে বাংলাদেশ এবং ফ্রান্সের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। প্যারিস এজেন্ডা ফর পিপল অ্যান্ড দ্য প্ল্যানেট সক্রিয়ভাবে সমর্থন করে বাংলাদেশও। আবার জলবায়ু সংকটের কারণে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, সেটি কাটিয়ে উঠতে প্রেসিডেন্ট মাখোঁ ঢাকাকে সহায়তার বিষয়ে সফরের সময় ফ্রান্সের প্রতিশ্রুতি পুনর্নিশ্চিত করবেন।
বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ফ্রান্সের দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ পশ্চিম ইউরোপের এ দেশটি নতুন জোট গড়তে চায়। আফ্রিকা মহাদেশে এর আগে ফরাসি উপনিবেশ বা মিত্র বলে পরিচিত দেশগুলোতে প্রভাব হ্রাস পাওয়ায় এই প্রয়োজনীয়তা আরও অনুভব করছে দেশটি।
এদিকে বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে এ সময়। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে এ নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পশ্চিমা চাপের এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মিত্র ফরাসি প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরে নতুন মেরুকরণের সম্ভাবনা রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, এই সফরের সময় অবাধ, সুষ্ঠু এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিষয়েও ফরাসি প্রেসিডেন্ট কোনো বার্তা দিতে পারেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বলছে, ভারতে জি-২০ সম্মেলন শেষে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ যখন বাংলাদেশে আসবেন, তখন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কিত আলোচনা আসন্ন বৈঠকে কথোপকথনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে এবং এটি মোটামুটি স্পষ্ট। এ ছাড়া ড. ইউনূস যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন, সেগুলোর ন্যায্য সমাধান অর্জনের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ করবেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মাখোঁর ঢাকা সফরে বাণিজ্যিক, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক বিষয় প্রাধান্য পেলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এবং ভূ-রাজনৈতিক কারণে এ সফরটি অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করবে। তারা বলছেন, এই সফরেরর মধ্য দিয়ে ইউরোপের একটি শক্তিশালী দেশের সঙ্গে ঢাকার কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপনের বড় সম্ভাবনা তৈরি হবে। এর ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কও দৃঢ় হবে, যার মাধ্যমে বৈশ্বিকভাবে বাংলাদেশের জন্য সুবিধা আদায়ের প্রেক্ষাপট তৈরি হবে।
ঢাকার কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ফ্রান্স বর্তমানে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে এবং এ অঞ্চলের ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফ্রান্স ও বাংলাদেশের সম্পর্ক যথেষ্ট অগ্রসর হয়েছে। দুদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়ে বর্তমানে তিন বিলিয়ন ইউরোর বেশিতে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া এ বছরের জুন মাসে ঢাকায় নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোকে ফ্রান্সে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। গত জুলাই মাসের শুরুতে ফরাসি নৌবাহিনীর একটি জাহাজ চট্টগ্রামে শুভেচ্ছা সফর করে এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়ায় অংশ নেয়। এ সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত ম্যারি মাসদুপুয়ে একটি বিবৃতি দেন। মূলত এসবের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের বৃহত্তর অঞ্চলে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বকেও স্বীকার করে নেয় ফ্রান্স।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে মোমেন এ সফর সম্পর্কে বলেছেন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করবেন। তার সম্মানে প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত ভোজসভায় যোগ দেবেন। দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর এবং একটি যৌথ প্রেসব্রিফিংয়ে অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, মাখোঁ রাতে ঢাকা ঘুরে দেখবেন। তিনি ঐতিহ্যবাহী এই শহরের উন্নয়ন, মানুষের জীবনাচরণ প্রত্যক্ষ করবেন। তিনি ধানমন্ডি লেক দেখতে যাবেন। লেকপাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পর যাবেন ‘জলের গান’ ব্যান্ডের গান শুনতে। সেই আয়োজন হবে জলের গানের লিড ভোকালিস্ট রাহুল আনন্দের বাসায়। সেখান থেকে ফিরবেন হোটেলে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাখোঁর আমন্ত্রণে ২০২১ সালের নভেম্বরে ফ্রান্স সফর করেন।
