পাঁচ কারণে শিশুমৃত্যু বেশি চট্টগ্রামে

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০২:৪৮ এএম

চলতি বছর ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে ৫৯ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে জেলা সিভিল কার্যালয়। এর মধ্যে ২২ জনই শিশু। যাদের বেশিরভাগের বয়স পাঁচ থেকে দশ বছর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার তথ্যমতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত এবং মৃত্যুর পরিসংখ্যানের প্রায় ২৫ ভাগ শিশু-কিশোর। চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের মধ্যে পুরুষ ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ, নারী ২৩ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং শিশু ২৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় তথ্যমতে, আক্রান্তের মধ্যে শিশু আক্রান্তের হার ২৬ শতাংশ হলেও মোট মৃত্যুহারে শিশু প্রায় ৫০ শতাংশ।

ডেঙ্গুতে চট্টগ্রামে এত মৃত্যুর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাঁচ কারণে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশুরা মারা যাচ্ছে। প্রথম : শিশুদের রোগ প্রতিরোধ কম, দ্বিতীয় : আক্রান্ত শিশুরা দেরিতে চিকিৎসার আওতায় আসা, তৃতীয় : আক্রান্ত হওয়ার পর শরীরের কোথায় কী রকম অসুবিধা লাগছে তা মুখে বলতে না পারা, চতুর্থ : বাসাবাড়ির বাইরে পরিপূর্ণ পোশাক পরিধান না করে খেলাধুলা করা এবং পঞ্চম কারণ অভিভাবকদের অসচেতনতা।

চট্টগ্রামে শিশুমৃত্যুর হার বেশি হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১৪ নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ডের প্রধান প্রফেসর ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘শিশুরা ডেঙ্গু রোগের লক্ষণগুলো বুঝতে বা বলতে পারে না। শরীরে রক্তের প্লাটিলেট দ্রুত কমতে শুরু করে। রক্তচাপ কমে যায়। হঠাৎ করে ডেঙ্গুর শকে চলে যায় শিশু। চিকিৎসার আওতায় আসতে দেরি হলে শিশুদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। যখন আক্রান্ত শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তখন অবস্থা খুবই খারাপ থাকে। এ সময় জরুরি চিকিৎসা করলেও শিশুকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।’

রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় শিশুরা সহজেই ডেঙ্গুতে কাবু হচ্ছে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক প্রণব কুমার চৌধুরী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশুদের ইমিউনিটি কম। এক বছরের কম বয়সী শিশুদের ডেঙ্গু হলেই পরিস্থিতি ভয়ংকর হতে পারে। ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের পালমোনারি হেমারেজ বেশি হয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করতে না পারলে মালটি-অরগান ফেইলর হয়ে শিশু মারা যেতে পারে। এ ছাড়া তাদের ফ্লুইড ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে নরমাল স্যালাইন দেওয়া যায় না।’

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তো মৃত্যুর হিসাবটা রাখছি। সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা হচ্ছে। এত বেশি শিশু কেন ডেঙ্গুতে মারা যাচ্ছে তা গবেষণা করে দেখতে হবে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘শিশুদের প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় দ্রুত বিপাক হয়। বেশি নড়াচড়া ও দৌড়াদৌড়ি করার কারণে ব্যায়াম হয় এবং তাপমাত্রা বেড়ে ঘাম হয়। ফলে শিশুর শরীর থেকে কার্বন-ডাই অক্সাইড নিঃসরণের মাত্রা বেড়ে যায়। মশা কার্বন-ডাই অক্সাইড দ্বারা আকৃষ্ট হয়। তাই শিশুদের কামড়াতে যায়। পূর্ণবয়স্ক একজন মানুষের ত্বকের তুলনায় শিশুদের ত্বক নরম এবং কামড়ানোর জন্য বেশি সংবেদনশীল। নরম ত্বকে সহজেই মশা তার হুল ফুটিয়ে রক্ত গ্রহণ করতে পারে। শিশুরা মশার কামড়ানো সহজে বুঝতে পারে না এবং মশা তাড়াতে পারে না। শিশুদের ত্বকে প্রাকৃতিকভাবে অনেক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে মশার কামড় ও মশাবাহিত রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি শিশুদের বেশি। তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল। তাই রোগের জন্য বেশি সংবেদনশীল।’

চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম বলেন, ‘শিশুরা দিনে বা রাতে যখনই ঘুমাবে অবশ্যই মশারি টাঙাতে হবে। ঘুমানোর সময় যাতে শরীরের কোনো অংশ খালি না থাকে। নিজের বাড়িঘর পরিষ্কার রাখতে হবে। যেকোনো বয়সের মানুষের জ্বর দেখা দিলে দেরি না করে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো উচিত। অনেক শিশু দিনের বেলা ঘুমায়, আর এডিস মশাও দিনের বেলায় কামড়ায়। ডেঙ্গু মৌসুমে শিশুদের ফুল-লেংথ ট্রাউজার এবং ফুলহাতা কাপড় পরানো উচিত।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৬৫ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে ভর্তির দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে। অর্থাৎ এসব শিশুকে হাসপাতালে আনা হয়েছে পরিস্থিতি বেশ খারাপ হওয়ার পর। রোগ সম্পর্কে বুঝে উঠতে না পারা। অনেকেই আক্রান্ত শিশুর মৌসুমি সর্দি-জ্বর হয়েছে ভেবে দেরিতে চিকিৎসার আশ্রয় নিচ্ছেন। অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে ঠিক সময়ে শিশুর রক্ত পরীক্ষা করানো হয়নি। পরীক্ষা করানোর পর যখন রোগ শনাক্ত হয়েছে, তখন অনেক অনেক দেরি হয়ে গেছে।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী বলেন, ‘শিশুর জ্বর হওয়ার প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রথম দিককার সাধারণ উপসর্গ দেখে মৌসুমি জ্বর ভেবে অভিভাবকরা সময়ক্ষেপণ করেন। জ্বর সম্পূর্ণ চলে যাওয়ার ২৪ ঘণ্টার পর রোগী বেশি অসুস্থতা অনুভব করলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। পর্যাপ্ত চিকিৎসায় ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার ১ শতাংশ। কিন্তু শক দেখা দিলে তা বেড়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত