ফেব্রুয়ারির ২২, বৃহস্পতিবার। সালটা ১৯৯০। সকাল থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। বেলা গড়াতেই সোনালি রোদ। মেঘ কেটে গিয়ে ঢাকার আকাশ ততক্ষণে ঝকঝকে। রাজধানীর পথ সেজেছিল ফুলের পাপড়ির রঙে। ফুল আর গানের সম্ভার এনেছিল উৎসবের আমেজ। লাখো মানুষের ভিড়ে বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকায় তিল ধারণের ঠাঁই নেই। চলছিল ব্যান্ডের বাদ্য। মুখর করতালি। সবার মুগ্ধতার চোখ ছিল নীল আকাশের দিকে। আকাশজুড়ে ছিল গগনবিদারি শব্দ।
ঠিক ১১টা ৪২ মিনিটে তীক্ষèচঞ্চুর কিছু একটার দেখা মিলল। সঙ্গে বিমানবাহিনীর চারটি জেটের প্রহরা। নিমেষেই দক্ষিণ আকাশে মিলিয়ে গেল। মিনিট দশেক পরেই আবার দেখা গেল উত্তর আকাশে। আকাশ থেকে ঢাকার মাটিতে যখন নেমে আসছিল ফরাসি প্রেসিডেন্টকে বহন করা উড়োজাহাজ, তখন কেঁপে উঠল বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকা। অভ্যর্থনা জানিয়ে বিমানবাহিনীর সাতটি জেট চমৎকারভাবে উড়ে গেল সেটার ওপর দিয়ে। সেই উড়োজাহাজটি ছিল তখনকার দিনে বিখ্যাত কনকর্ড।
৩৩ বছর আগে স্ত্রী মাদাম দানিয়েল মিতেরাঁকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁ। শব্দের চেয়ে দ্বিগুণ গতির সুপারসনিক কনকর্ডে চড়ে এসেছিলেন তারা। এর আগে কিংবা পরে এ দেশের আকাশে আর কনকর্ডের দেখা মেলেনি।
বিমানবন্দর থেকে সাঁজোয়া যানের পাহারায় সোজা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন করতোয়ার দিকে ছুটে চলে ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁকে বহন করা গাড়িবহর। সঙ্গে ছিলেন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। আর মাদাম মিতেরাঁর সঙ্গে বেগম রওশন এরশাদ। এরপর করতোয়া থেকে সংসদ ভবনের নর্থ প্লাজা। সন্ধ্যার পর করতোয়া থেকে বঙ্গভবন। ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁ যেখানেই যে পথে গেছেন, সে পথেই ছিল উষ্ণ ও সাদর অভ্যর্থনা। ছিল বর্ণময় স্বাগত সম্ভার। উচ্চারিত হচ্ছিল ওয়েলকাম প্রেসিডেন্ট মিতেরাঁ। রাস্তার দুই পাশে উড়ছিল দুই দেশের পতাকা। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা হাত নেড়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল তাদের। সাধারণ মানুষও যেন কাজ ফেলে যোগ দিয়েছিল এই উৎসবে। রাজধানীর সর্বত্রই ছিল সাজসাজ রব।
শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁর আগমনের রং ছুঁয়েছিল গ্রামেগঞ্জেও। দুই বছর আগেই বাংলাদেশে হয়ে গিয়েছিল ভয়াবহ বন্যা। সে সময় অবশ্য বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন মাদাম মিতেরাঁ। দ্বিতীয়বার এসে গিয়েছিলেন মেঘনাবিধৌত চাঁদপুরে। মতলব উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরের এখলাসপুর গ্রামে গিয়েছিলেন ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁ ও মাদাম মিতেরাঁ। সেখানে বন্যা নিয়ন্ত্রণে মেঘনা-ধনাগোদা প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন বাঁধ পরিদর্শন করেন তারা। সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও তার স্ত্রীও ছিলেন।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের আগমনে এখলাসপুর ও এর আশপাশের এলাকার সব বয়সী মানুষ সেদিন জড়ো হয়েছিল। দুই দেশের ছোট ছোট পতাকা নেড়ে স্বাগত জানাচ্ছিল তারা। সঙ্গে ছিল অভ্যর্থনার ব্যানার। প্রেসিডেন্ট দম্পতি হেঁটে পাশের একটি গ্রামে গিয়েছিলেন। গ্রামের কোমলমতি মেয়েরা নৃত্যের সঙ্গে স্বাগত জানিয়েছিলেন তাদের। মাদাম মিতেরাঁ তাদের অনেকের সঙ্গেই করমর্দন করেছিলেন। হাস্যোজ্জ্বল মুখ আর চোখভরা মুগ্ধতায় হাত এগিয়ে দিয়েছিল ছোট ছোট মেয়েরা।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের সফর ছিল তিন দিনের। ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ছাড়েন তিনি। এর আগের তিন দিনে বেশ কয়েকটি বৈঠক ও স্থান পরিদর্শন করেন। বাংলাদেশের তৎকালীন বন্যা সমস্যা মোকাবিলায় ঘোষণা দিয়েছিলেন ১৫ কোটি ফ্রাঁ অর্থ সাহায্যের। বাংলাদেশে আসার পরের দিনই সংবাদ সম্মেলনে প্রায় এক ঘণ্টা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন প্রেসিডেন্ট মিতেরাঁ। সেখানে বাংলাদেশ শুধু নয়, কথা বলেন বৈশি^ক নানা ইস্যু নিয়ে।
ওই সফরে ফ্রান্স রূপপুর পারমাণবিক চুল্লি সম্পর্কিত চুক্তিটি নবায়নে সম্মত হয়। রেলওয়ে সরঞ্জামাদি ক্রয়, তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান, ঢাকা শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থাসহ ১২টি প্রকল্প এবং আরও কয়েকটি বিষয়ে সহযোগিতার ব্যাপারে ফ্রান্সের সঙ্গে আলোচনা হয় বাংলাদেশের। ডেইরি ফার্ম ও দুই দেশের মধ্যে বিমান চলাচলের একটি চুক্তি সম্পন্ন করা নিয়েও আলোচনা হয়।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের এই রাষ্ট্রীয় সফর তখন দেশের কূটনীতিতে ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দৈনিক বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের বিভিন্ন দাবি, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নদীর পানির হিস্যা ও বন্যা সমস্যা সমাধানে ফ্রান্সের সুদৃঢ় সমর্থন পাওয়া যাবে। জাতীয় উন্নয়নে পাওয়া যাবে ক্রমবর্ধমান কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা।
১৯৯০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি চার দিনের জন্য পাকিস্তান সফরে যান ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁ। সেখান থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে আসেন তিনি। তিন দশক পর এবার জি-২০ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর বাংলাদেশে আসছেন ফ্রান্সের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। ফ্রান্স দূতাবাসের ফেসবুক ও এক্সে (আগের নাম টুইটার) দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ৯-১০ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিয়ে ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সফর করবেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের এই সফরে দুই দেশের অংশীদারত্ব বহুমুখী করার একটি সুযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এ কারণে মানবিক সহায়তা, বিশেষ করে নিয়মিত বন্যার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাশে থাকার বিষয়ে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করবেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট।
