ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম বাতিল হওয়ায় এবার ৩০০ আসনেই ব্যালটে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সেই লক্ষ্যে ব্যালট পেপারসহ ভোটসামগ্রী কেনার প্রক্রিয়া শেষ করেছে সংস্থাটি। তফসিল ঘোষণার আগেই প্রায় ৭০ কোটি টাকার কেনাকাটা সারবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। তবে এর পরিমাণ বাড়তেও পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ক্রয়সংক্রান্ত কমিটি নিয়মিত বৈঠকে কার্যাদেশপত্রের চাহিদা অনুযায়ী কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করছে। ইতিমধ্যে ইসির চাহিদা মতো কিছু কিছু সামগ্রী তারা হাতেও পেয়েছে। ইসির লক্ষ্য নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগেই পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু প্রস্তুত রাখা।
আগামী বছর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি সম্প্রতি ইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আগস্টে ইসি কমিশনার আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, নভেম্বর মাসে তফসিল ঘোষণা করা হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল সম্প্রতি বলেছেন, আগামী ডিসেম্বরের শেষ অথবা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে তারা প্রস্তুতিমূলক কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে অতীতে নির্বাচনে ৪০ থেকে ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণা হলেও এবার আরও সময় হাতে রেখে তফসিল ঘোষণা হতে পারে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব জাহাংগীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইসি সচিবালয়ের সব কর্মকর্তাকে এবং আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাদের নিয়ে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে কাজের অগ্রগতির পাশাপাশি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী মালামাল কেনা থেকে শুরু করে ভোটকেন্দ্র স্থাপন পর্যন্ত সব বিষয় রোডম্যাপ অনুযায়ী হচ্ছে।
ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ জানান, তারা ইতিমধ্যে কিছু কিছু নির্বাচনী উপকরণ হাতে পেতে শুরু করেছেন। তারা আশা করছেন, নভেম্বরের মধ্যে সব উপকরণ বুঝে পাবেন। তিনি বলেন, এ নির্বাচনে ব্যালট পেপারটা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। সেটি তৈরির জন্য কাগজ কেনার কাজ ইতিমধ্যে বিজি প্রেস শেষ করেছে। তারা টেন্ডার করেছে। সবকিছু সঠিক পথেই রয়েছে। নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে এসব বিষয়ে হালনাগাদ থাকছে ইসি।
নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ব্যালটে ভোটের কাজে সুই, সুতা, মোমবাতি, দেশলাই থেকে শুরু করে অন্তত ২৩ ধরনের জিনিসের দরকার হয়। এ ছাড়া প্রয়োজন হয় বিশেষ খামসহ ১৭ ধরনের প্যাকেটের।
জাতীয় নির্বাচন পরিচালনায় ইসির যে নির্দেশিকা আছে, সেখানেও ব্যালটে ভোটগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় এসব জিনিসপত্রের বিবরণ আছে।
জানা গেছে, ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণের জন্য ক্রয়তালিকায় থাকা ব্যালট বাক্স, ব্যালট বাক্সের লক, ব্যালটের কাগজ, স্ট্যাম্প প্যাড, অফিশিয়াল সিল, মার্কিং সিল, ব্রাস সিল, লাল গালা, প্যাকিং বক্স, অমোচনীয় কালি ও কলম, বিভিন্ন ফরম, প্যাকেট, সুই-সুতা, খাম, মোমবাতি, ব্যালট বাক্সের সিল, গানি ব্যাগ, অফিশিয়াল সিল ইত্যাদি উপকরণের কোনটি কী পরিমাণ ইসির ভা-ারে রয়েছে, সেগুলোর তালিকা করা হয়েছে। পর্যালোচনা করে নতুন করে প্রয়োজন অনুযায়ী কেনার টেন্ডার দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনী উপকরণের অন্যতম ব্যালট বাক্স, স্ট্যাম্প প্যাড, সিলগালা, অফিশিয়াল সিল, মার্কিং সিল, ব্রাশ সিল, অমোচনীয় কালি, বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ, ক্যালকুলেটর, চার্জার লাইট, বিভিন্ন ধরনের ফরম, প্যাকেট মুদ্রণ ইত্যাদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হাতে পাওয়ার সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে গত মাসের বৈঠকে।
সূত্র বলছে, ভোটার সংখ্যার তথ্যের ভিত্তিতে ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষের সংখ্যার ভিত্তিতে এবার নির্বাচন সামগ্রী কেনার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী এবার ভোটার সংখ্যা ১১ কোটি ৯১ লাখ ৫১ হাজার ৪৪০ জন। মাঠপর্যায়ের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, বর্তমানে সারা দেশে ২ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪৫টি স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স সংরক্ষিত আছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের নির্বাচনে ব্যালট বাক্স প্রয়োজন হবে ৩ লাখ ৬ হাজার ৬০০টি। সে হিসাবে ১২ হাজার ২৫৫টি বাক্স বেশি কিনলেই হতো। কিন্তু সারা দেশের ব্যালট বাক্সগুলো গুণগত মান, ভোটকেন্দ্রে ব্যবহার নিশ্চিত, সংসদ নির্বাচনে রিস্কফ্যাক্টরসহ নির্বাচন পরপরই কিছু উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বিষয়টি সামনে রেখে এবার ৮০ হাজার নতুন ব্যালট বাক্স কেনার টেন্ডার করেছে ইসি। এগুলোর মধ্যে চলতি সেপ্টেম্বরে ৪০ হাজার এবং অক্টোবরে ৪০ হাজার ইসির হাতে পৌঁছনোর কথা। তবে স্থান সংকুলানের কারণে এগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে না রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে ইসির। আগে বিদেশ থেকে এসব ব্যালট বাক্স ও ঢাকনা আনা হলেও এবার দেশীয় প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা হচ্ছে।
কমিশনের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, এবার গানি ব্যাগ ৯০ হাজার, হেসিয়ান ব্যাগ ১ লাখ ৬৫ হাজার, মার্কিং সিল ১৪ লাখ ৩৫ হাজার, অফিশিয়াল সিল ৭ লাখ ১৫ হাজার, ব্রাশ সিল ১ লাখ, গালা ২০ হাজার কেজি, অমোচনীয় কালি ও কলম ৮ লাখ ১৫ হাজার, ব্যালট বাক্সের প্লাস্টিকের লক ৪০ লাখ, ব্যালট বাক্সের ঢাকনা ৫৫ হাজার নভেম্বরের আগেই ইসিকে বুঝিয়ে দেওয়ায় শর্তে ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয়েছে। এসব নির্বাচনী মালামাল কিনতে ১৯ কোটি ৩৬ লাখ ৪৯ হাজার ৯১৫ টাকা ইসিকে খরচ করতে হচ্ছে।
ওই সূত্রমতে, এ খরচ ছাড়াও প্যাডের জন্য আরও ৪ কোটি টাকার মতো লাগবে। সব মিলিয়ে ২২ কোটি টাকা মালামালের জন্য প্রয়োজন হবে। বিজি প্রেস ইতিমধ্যে কাগজ কেনার জন্য আরও ৩৩ কোটি টাকার একটি টেন্ডার দিয়েছে। এতে ১ লাখ ৬১ হাজার রিম কাগজ অর্থাৎ ৩২ লাখ ২০ হাজার দিস্তা কাগজ কেনা হচ্ছে। এসব কাগজ দিয়ে তৈরি হবে ব্যালট পেপার, বিভিন্ন ধরনের খাম ও প্যাড। পুরোটাই বিজি প্রেস ছাপাতে সক্ষম। আর কাগজ সরবরাহ করছে কর্ণফুলী পেপার মিলস। এসব খরচের সঙ্গে যোগ হবে বিজি প্রেসে ব্যালট পেপার ছাপানোর খরচ, লেবাররা যদি অতিরিক্ত সময় কাজ করে সেই ভাতা।
ইসির রোডম্যাপের সারণি ৮ অনুযায়ী, বর্তমানে নির্বাচন কমিশন প্রার্থী ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি এবং ফলাফল ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নামে দুটি সফটওয়্যার ব্যবহার করবে। নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা অ্যাপটি উন্মুক্ত হলে কোনো নির্বাচনে প্রার্থী কে, কাদের মনোনয়নপত্র বৈধ কিংবা অবৈধ হলো, কারা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করলেন, কোনো প্রার্থীর প্রতীক কী ইত্যাদি জানা যাবে। অন্যদিকে নির্বাচনী ফলাফলও পাওয়া যাবে অ্যাপটিতে। এতে ভোট চলাকালে একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর থাকবে ভোটার উপস্থিতির তথ্য। রিটার্নিং কর্মকর্তা ফলাফল ঘোষণার পরপর পাওয়া যাবে ফলাফলের হালনাগাদ তথ্য।
অশোক কুমার দেবনাথ জানান, এ বিষয়ে চলতি মাসেই কমিশন সংবাদ সম্মেলন করবে। অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থার সঙ্গে আরও ছয়টা মডিউল থাকছে এতে। ফলে স্মার্ট ফোনে অ্যাপ ডাউনলোড করে এনআইডি নম্বর দিলে প্রয়োজনীয় তথ্য জানা যাবে।
এর জন্য ১৫ কোটি টাকার মতো ব্যয় হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ৭ কোটি টাকা হার্ডওয়্যারের জন্য। আর কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে ৮ কোটি টাকা। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ নির্বাচনের জন্য অ্যাপটি তৈরি করা হচ্ছে। পরবর্তী কমিশন যদি মনে করে এটা কন্টিনিউ (চলমান) করবে, অন্যথায় সেটি তারা বাতিল করে দেবে।