মৃত্যুও যেখানে অভ্যাস!

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৩, ১১:৩১ পিএম

মাহমুদ বাদাভি, গাজার এক অ্যাম্বুলেন্স চালক। ইসরায়েলের হামলায় হত্যাযজ্ঞের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ছুটে চলেন তিনি। গত মঙ্গলবারও গাজার এক সরু গলিতে তার অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে মাহমুদ দাঁড়ালেন, বিমান হামলায় আহত দুই শিশুকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার জন্য। সে সময় তিনি বিবিসিকে শোনালেন তার ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা। চোখের সামনে তিনি ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে শিশুদের নির্জীব দেহ বের করে আনা, তাঁবুতে সাদা চাদরে মোড়ানো সারি সারি মৃতদেহ এবং বিমান হামলায় মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া ইমারত দেখেছেন। মাহমুদ বাদাভি তার চোখের সামনে মানবতা গুঁড়িয়ে যেতে, পুড়তে, ছিন্নভিন্ন হতে দেখেছেন। তবুও সেটি তার চেহারা দেখে আন্দাজ করা যাচ্ছিল না। তিনি বিবিসিকে বলেন, অনেক কঠিন পরিস্থিতি আসে। একজন অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে, যা ঘটছে তার অনেক কিছুই দেখতে হয়। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া হাত, মাথাৃ দেহযাই হোক, আমরা অভ্যস্ত।

মাহমুদ বলেন, এখানে যা অবস্থা তাতে বিরতি নেওয়ার ফুরসত আমাদের কারও নেই। পরিস্থিতি ভীষণ খারাপ। এখন আমাদের খোঁজার চেষ্টা করতে হবে, কোথায় এই বিস্ফোরণ হলো যাতে আহত আর মৃতদের কাছে পৌঁছতে পারি। চিকিৎসা পরিষেবার কথা জানতে চাইলে, তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন, সবই চলছে। গাজায় হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য বিভাগের কর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিগত দুই সপ্তাহে সাত হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই শিশু বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের তরফে সতর্ক করা হয়েছে, এক-তৃতীয়াংশ হাসপাতাল এবং দুই-তৃতীয়াংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ করতে হয়েছে। এসব হাসপাতাল হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।  জাতিসংঘ আরও জানিয়েছে, মজুদ জ্বালানির ভাণ্ডার ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও সংকটময় হতে চলেছে। আগামীদিনে, কোন পরিষেবাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে আর কোনটা হবে না, তা নিয়ে ‘কঠিন সিদ্ধান্ত’ নিতে হতে পারে। অন্যদিকে, ইসরায়েল গাজা ভূখণ্ডে কোনোরকম জ্বালানি সরবরাহের বিরোধী। তাদের আশঙ্কা ওই জ্বালানি হামাসের হাতে। তারা হামাসের বিরুদ্ধে জ্বালানি লুট করার অভিযোগও করেছে। মাহমুদ বলছেন, প্রতিনিয়ত মারাত্মক আহত মানুষ দেখতে দেখতে তিনি অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। আসলে গাজায় দিন-রাত প্রায় সব মিলেমিশে একাকার, যুদ্ধ চলছেই। মাত্র ১৪১ বর্গমাইলের সর্বত্রই যুদ্ধের চিহ্ন।

ইতিমধ্যে ইসরায়েল গাজার উত্তরাঞ্চলে বসবাসরত প্রায় ১০ লাখ মানুষকে গাজার দক্ষিণাঞ্চলে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। হামাসকে নির্মূল করার লক্ষ্যে সেনাবাহিনী যাতে নির্বিঘেœ কাজ করতে পারে তাই এই নির্দেশ।

মাহমুদ জানান, তিনি যখন তার কাজে বাসা থেকে বের হন, তখন তার স্ত্রী আর ছয় সন্তানের জন্য উদ্বিগ্ন থাকেন। একই সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যরাও মাহমুদের নিরাপত্তার জন্য চিন্তায় থাকে। যেদিন বোমার হানা তীব্র হয়, মাহমুদ চেষ্টা করেন, প্রতি ঘণ্টায় বাড়িতে ফোন করে কথা বলতে। কিন্তু টেলিফোন মারফত যোগাযোগ করাও কঠিন।

গত দুই সপ্তাহ ধরে রাত ঘনিয়ে এলে একসময় বোমা হানায় ছেদ পড়ে। মাহমুদ একটু থামেন, তারপর অ্যাম্বুলেন্স এবং ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়ান। তার বাঁ হাতে ধরা স্ট্রেচার। পরের জরুরি অবস্থার জন্য প্রস্তুত থাকেন মাহমুদ। উত্তেজনা ক্রমশ কমে আসে। কোনো অনুভূতিই যেন ছুঁতে পারে না তাকে। কিছুক্ষণের জন্য আবেগশূন্য হয়ে পড়েন তিনি, চোখ চলে যায় দূরে। অসংখ্য মৃত মানুষের শরীর তার চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায় যেন, অসংখ্য মানুষের আর্তনাদ কানে বাজে শুধু। বোধহীনতার মধ্যেও বুক ভারী হয়ে আসে তার। চোখের কোনা বেয়ে এক ফোঁটা পানি নেমে আসে। ঝাপসা হয়ে আসে দৃষ্টি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত