দখল দূষণে মৃতপ্রায় নদী-খাল

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৩, ০৩:০৭ এএম

বরগুনা পৌর শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ খাকদোন নদী। অপরিকল্পিত সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ, প্রভাবশালীদের দখল ও পলি জমে প্রায় মৃত এক খালে পরিণত হয়েছে। ব্যাহত হচ্ছে নৌযান চলাচল। শুধু এ নদীই নয়, স্থানীয় প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলদারদের দৌরাত্ম্যে বরগুনার ছয়টি উপজেলায় প্রায় শতাধিক খালও এখন মৃতপ্রায়। নদীরক্ষা কমিশন দখলদারদের তালিকা তৈরি করে উচ্ছেদের সুপারিশ করলেও নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জেলায় দখল ও দূষণে ধুঁকতে থাকা নদী ও খালগুলোর চিত্র উঠে এসেছে।

খাকদোন নদী বিষখালী ও পায়রা নদীকে যুক্ত করার পাশাপাশি বরগুনা সদর উপজেলার সঙ্গে আমতলী, তালতলী ও পাথরঘাটা উপজেলাকে নৌপথে যুক্ত করেছে। নদীটির বিষখালী অংশের ৬ কিলোমিটারে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও বাকি ১৯ কিলোমিটারে ২১টি সেতুর নির্মাণের কারণে নৌযান চলাচল করতে পারে না। মাত্র ১৯ কিলোমিটারের মধ্যে কেন এত সেতু নির্মাণ করা হলো, তার কোনো উত্তর নেই কর্তৃপক্ষের কাছে। তবে সর্বশেষ নির্মিত দুটি সেতু মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন দিয়েছে বলে দাবি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের। শুধু অপরিকল্পিত সেতু নির্মাণই নয়, জোয়ারের সময় উঠে আসা পলি জমে একসময়ের ৬৫০ মিটার প্রশস্ত খরস্রোতা খাকদোন এখন মৃতপ্রায় খালে পরিণত হয়েছে।

পাশাপাশি দখলদারদের দৌরাত্ম্যে নদীটির ঢলুয়া অংশ থেকে শুরু করে সোনাখালী পর্যন্ত তৈরি হয়েছে সহস্রাধিক পাকা-আধাপাকা অবৈধ স্থাপনা। নদীটি মরতে বসলেও বিষখালী অংশের ৬ কিলোমিটার ছাড়া বাকি নদী কেন ড্রেজিং করা হচ্ছে না, সে বিষয়ে প্রশ্ন করেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কাছে সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে এ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নদীটি ড্রেজিংয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু করা হবে। শুধু খাকদোন নদীই নয়, এর সঙ্গে যুক্ত ১৫টি শাখা খালেরও এখন বেহাল দশা। অবৈধ দখলদার ও অপরিকল্পিত সøুইসগেট নির্মাণের ফলে এসব খালে নৌ-চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। শুকনো মৌসুমে এসব খালে দেখা দেয় চরম পানি সংকট।

বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বরগুনায় প্রায় ৪০০ খাল রয়েছে। এর মধ্যে ২৪৩টি খাল অবৈধ দখলদার ও পলি জমে ভরাট হওয়ার পথে। বর্ষা মৌসুমে এসব খালে পানি প্রবাহ থাকলেও শুকনো মৌসুমে দেখা দেয় তীব্র পানি সংকট। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন সময় অর্ধশত খাল খনন করে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা খালগুলোর জীবন বাঁচাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

প্রভাবশালীরা গিলে খাচ্ছে নদী ও খাল : খাকদোন নদী ও বরগুনার বিভিন্ন খাল দখলের পেছনে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। দখলদারদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে সাবেক পৌর মেয়র, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, কাউন্সিলরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।

জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের তথ্য বলছে, বিভিন্ন খালে অবৈধ দখলদার রয়েছে ১ হাজার ৫৫৪ জন। এর মধ্যে বরগুনা সদরে ৩৬৮, আমতলী উপজেলায় ২৯২, তালতলী উপজেলা ২২৭,

পাথরঘাটা উপজেলায় ৩৯০, বামনায় ৭২, বেতাগীতে ২০৫ জন অবৈধ দখলদার রয়েছে। নদী ও খাল দখল করে অধিকাংশ জায়গাতেই গড়ে উঠছে মার্কেট কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কিছু কিছু স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে আবাসিক স্থাপনা।

অপরিকল্পিত উন্নয়নে মরছে নদী ও খাল : খাকদোন নদীর ১৯ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে ২১টি অপরিকল্পিত সেতু। সেতুগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে জোয়ারের সময় এ নদী দিয়ে কোনো যানবাহনই চলাচল করতে পারে না। এ ছাড়া নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলোর মুখে নির্মাণ করা হয়েছে স্লুইসগেট। স্লুইসগেটগুলো নদীর থেকে কিছুটা উপরি অংশে নির্মাণ করায় শুকনো মৌসুমে পানি প্রবাহ ব্যাহত হয়।

আমতলী উপজেলার সুবন্ধি খালে গিয়ে দেখা গেছে, স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে এ খালে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে কচুরিপানা জমে পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। একই অবস্থা দেখা গেছে বরগুনা সদর উপজেলার ২ নম্বর গৌরিচন্না ইউনিয়নের লাকুরতলা খালে। খালটিতে একসময় নৌযান চলাচল করলেও এখন শুধু বর্ষা মৌসুমে পানি প্রবাহ ঠিক থাকে। শুকনো মৌসুমে পানি সংকট দেখা দেয়। এ ছাড়া খালের দুই পাড়ে রয়েছে অসংখ্য অবৈধ দখলদার। সেতু নির্মাণের জন্য বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের অনাপত্তি পত্র নেওয়ার কথা থাকলেও খাকদোন নদীতে সেতু নির্মাণের জন্য নেওয়া হয়নি কোনো অনাপত্তি পত্র।

খাকদোন নদীতে অপরিকল্পিত সেতু নির্মাণের বিষয়ে বরগুনা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, অধিকাংশ সেতুই অনেক বছর আগে নির্মাণ করা। আমি সে সময় এখানে দায়িত্বে ছিলাম না। তবে সম্প্রতি যে দুটি গার্ডার সেতু নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো মন্ত্রণালয় থেকে পাস হয়ে এসেছে।

অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন ব্যবসায়ী ও কৃষক : খাকদোন নদীর নাব্য হারিয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন আমতলী ও তালতলী উপজেলার কৃষক ও কৃষিপণ্যের ব্যবসায়ীরা। একসময় তাদের উৎপাদিত সব পণ্য নৌপথে খাকদোন নদী দিয়ে জেলা সদর বরগুনায় নিয়ে আসা হতো। এ ছাড়া খাকদোন নদী দিয়ে বরগুনার সঙ্গে পটুয়াখালী জেলার বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল।

পরিবহন ব্যবসায়ী, কৃষক ও আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমতলী ও তালতলী থেকে ৩০০ থেকে ৩৫০ বস্তা ধান নিয়ে জেলা সদরে আসা এক একটি ট্রাকে সড়কপথে ব্যয় হয় ১২-১৪ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শ্রমিকদের মজুরি। একই পরিমাণ ধান নিয়ে নৌপথে আসতে ব্যয় হয় ৬-৮ হাজার টাকা। প্রতিনিয়ত যেমন বাড়ছে কৃষকদের উৎপাদন খরচ, ঠিক তেমনি বাড়ছে পরিবহন খরচও।

কী বলছেন স্থানীয়রা? : লাকুরতলা এলাকার মো. ইব্রাহিম, মো. সোলায়মান, আবদুল হকসহ একাধিক স্থানীয়রা বলেন, নদী ও খালের প্রবাহ সচল থাকলে এ খাল থেকেই অনেকের জীবন ও জীবিকার ব্যবস্থা হতে পারে। কেননা এ খালগুলোই আমাদের দেশীয় প্রজাতির মাছের ভা-ার। খালগুলোতে মৎস্য আহরণ করে অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। এ ছাড়া খালগুলো সচল থাকলে অনেকাংশেই কৃষকদের সেচের ব্যবস্থা সহজ হবে। খাকদোন নদী তীরের একাধিক বাসিন্দা বলেন, এ বরগুনা শহরটা গড়ে উঠেছে এই নদী কেন্দ্র করে। অথচ আজ সেই নদীকেই মেরে ফেলা হচ্ছে।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা? : পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. নুরুল আমিন বলেন, পলি পড়ে নদনদী ভরাট হওয়াটা প্রকৃতির নিয়ম। তবে এটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাই জোয়ারের উচ্চতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। খাল-বিলগুলো দখলমুক্ত করা গেলে কিছুটা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের হাত থেকে সুরক্ষা পাওয়া যাবে।

উপেক্ষিত নদীরক্ষা কমিশনের নির্দেশনা : ২০২০ সালে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন থেকে খাকদোন নদী ও অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। সুপারিশমালায় খাকদোন নদীর সীমানা ও ফোরশোর সিএস ম্যাপ ও পানি আইন ২০১৩ এর ২০ ধারা অনুযায়ী নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। পাউবোকে হাইড্রোমরফোলজিক্যাল সমীক্ষা সম্পাদন করে পায়রা থেকে বিষখালী পর্যন্ত খনন করে খননকৃত মাটি নিরাপদ দূরত্বে ফেলতে সুপারিশ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে কোনো সুপারিশই গ্রহণ করা হয়নি। বরং নদীর তীর দখল করে জেলা প্রশাসন কর্তৃক নির্মাণ করা হয়েছে আবাসন প্রকল্প।

বরগুনা পাবলিক পলিসি ফোরামের আহ্বায়ক মো. হাসানুর রহমান ঝন্টু বলেন, খাকদোন নদী দখলমুক্ত করার জন্য একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। নদীটির নাব্য ফিরিয়ে আনতেও নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। দীর্ঘ বছর ধরে শুনে আসছি নদী খননের জন্য প্রকল্প পাঠানো হয়েছে কিন্তু তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব বলেন, ‘খাকদোন নদীর নাব্য পুনরুদ্ধারে একটি প্রকল্প গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় কেওড়াবুনিয়া থেকে ১০০ ফুট প্রশস্ত করে ১০ কিলোমিটার খনন করে পায়রা নদীর সংযোগস্থল পর্যন্ত নদীটি পুনঃখনন করা হবে।’

খাল ভরাট হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে বরগুনার বিভিন্ন উপজেলার অর্ধশত খাল খনন করা হয়েছে। আমতলী উপজেলার সুবন্ধি খাল খননের জন্য একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। শিগগির খালের প্রবাহ নিশ্চিত করতে কচুরিপানা অপসারণসহ খাল রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।

বরগুনার জেলা প্রশাসক মোহা. রফিকুল ইসলাম বলেন, নদনদী, খাল-বিল দখলমুক্ত করা জেলা প্রশাসনের একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। খাকদোন নদীসহ বরগুনার যারা অবৈধ দখলদার রয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে কথা বলে এসব দখলদারদের উচ্ছেদ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা শিগগির গ্রহণ করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত