ভবনটিতে সেফটি প্ল্যান ছিল না

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৩, ০২:৪৬ এএম

প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর রাজধানীর মহাখালীর আমতলীতে বহুতল ভবন খাজা টাওয়ারে লাগা আগুন নেভাতে সক্ষম হয় ফায়ার সার্ভিস। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে লাগা এ আগুনে তিনজনের মৃত্যু ও বেশ কয়েকজন আহত হন। ফায়ার সার্ভিস বলছে, ভবনটিতে তেমন সেফটি প্ল্যান ছিল না। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত কেন বা কীভাবে আগুন লেগেছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত সে বিষয়টি স্পষ্ট করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। এগুলো নিরূপণে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে তারা।

এদিকে ওই ভবনে থাকা ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বলেন, এ ভবনটি রাজধানীর সবচেয়ে বড় ডেটা হাব। দেশের টেলকো সেবা প্রতিষ্ঠানসহ ৩০ শতাংশ ইন্টারনেট সেবা এখান থেকে কাজ করে। কিন্তু আগুনের ঘটনার পর সেখানে বিদ্যুৎ নেই। ইন্টারনেট সেবা স্বাভাবিক রাখতে হলে দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ প্রয়োজন। বিদ্যুৎ পেলে দু-এক দিনের মধ্যে এই ইন্টারনেট সেবা স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাইন উদ্দিন আগুন নিয়ে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে বললে ওই ভবনে সেফটি প্ল্যান ছিল না। তবে বিভিন্ন ফ্লোরে আমরা কিছু ফায়ার এক্সটিংগুইশার পেয়েছি এবং এগুলো কাজ করছিল। কিন্তু দাহ্য পদার্থ একটু বেশি ছিল, যে কারণে আগুনটা ছড়িয়ে গিয়েছিল।’

তিনি আরও বলেন, ওই ভবনটিতে ব্যাটারি ছিল, স্টোরস, কেবল, সুইচ, আইসোলেশন ফোম এবং ১২ ও ১৩-তলায় ইন্টেরিয়র দিয়ে খুব সুসজ্জিত করা; যা আগুনের বিশেষ উপাদান। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আগুন কন্ট্রোলে এলেও এগুলোর কারণে নির্বাপণ করতে সময় লাগছে।

আগুন লাগার বিষয়ে দুটি মতের কথা উল্লেখ করে ডিজি বলেন, কেউ বলছেন চারতলা থেকে ৯, ১০ ও ১১-তলায় দ্রুত ছড়িয়েছে। আবার কেউ বলছেন, ১১-তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত। তবে যখন আমরা তদন্ত শেষ করব তখন বলা যাবে কোথা থেকে এবং কী কারণে আগুনের সূত্রপাত। আপাতত মনে হচ্ছে কোনো বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে হয়তো আগুন লেগেছে।

ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান সিকদার বলেন, গতকাল সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে খাজা টাওয়ারের আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ করা হয়। এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের পরিচালক (অপারেশনস) লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্য সদস্যরা হলেন ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক মো. ছালেহ উদ্দিন, সহকারী পরিচালক মো. আনোয়ারুল হক, উপসহকারী পরিচালক মো. তানহারুল ইসলাম, তেজগাঁও ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার নাজিম উদ্দিন সরকার। তারা পুরো ঘটনাটি তদন্ত করে আগুনের ক্ষয়ক্ষতি ও কারণ বের করবেন।

সরেজমিনে গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, ওই ভবনটিতে কোনো বিদ্যুৎ নেই এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মূল ফটকের সামনে পুলিশ রয়েছে। অনুমতি নিয়ে বেশ কয়েকটি ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা ওই ভবনে প্রবেশ করছেন। তারা সেখান থেকে তাদের সার্ভারের যন্ত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিস বের করে নিচ্ছেন।

ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি এমদাদুল হক বলেন, ‘আমরা ভেতরে ঢুকতে পেরেছি। যন্ত্রগুলো দেখে আমাদের মনে হয়েছে এগুলো ভালো আছে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত পাওয়ারে না যাব বা লাইভে না যাব ততক্ষণ পর্যন্ত বলতে পারছি না আমাদের যন্ত্রগুলো কাজ করছে কি না। আমাদের যদি বলা হয় এই যন্ত্রগুলো অন্য জায়গায় স্থানান্তর করার জন্য, সে ক্ষেত্রে সার্ভিস দিতে অনেক সময় লেগে যাবে। ভবনের এখন যে অবস্থা আছে আমাদের ডেটা সেন্টারগুলো লাইভ করা সম্ভব। শুধুু আমাদের বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করব আজকে (শুক্রবার) যদি আমাদের এই বিদ্যুৎ সরবরাহ দেয় তবে আমরা সারা দেশে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিতে পারব।’

ভবনের ফায়ার সেফটির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ডেটা সেন্টারে পর্যাপ্ত সিকিউরিটি ছিল কি না সেটা দেখতে হবে। যদি না থাকে এটা এখনই সময় ঠিক করার। তবে ভবনের সেফটি সিকিউরিটি পর্যাপ্ত ছিল না। যদি তা থাকত তাহলে এ ধরনের ঘটনা ঘটে না।’ 

রেস অনলাইনের হেড অব নেটওয়ার্ক অপারেশন এসএম মোজাহিদুল হাসান বাপ্পি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকাকলো ও এনআরবি নামে দুটো ডেটা সেন্টার আছে। এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে ৬০০-এর ওপর ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারের অপারেশন রয়েছে। মোবাইল অপারেটরের কার্যক্রমের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এখান থেকে চলে। টেকনোলজি পয়েন্ট অব ভিউ থেকে এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভবন। ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ইন্টারনেট ও টেলিফোন অপারেটরদের সার্ভিস এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ভবনে আমাদের মূল সার্ভিস ছিল। যদিও আমাদের ব্যাকআপ আছে এবং সেটা দিয়ে এখন সার্ভিস দিচ্ছি, কিন্তু সেটা ধীরগতিতে চলছে।’

ঢাকাকলো ডেটা সেন্টার ও আর্থ টেলিকমিউনিকেশনের হেড অব ট্রান্সমিশন অ্যান্ড পাওয়ার প্রকৌশলী হাসিবুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের আরও বিকল্প কিছু ডেটা সেন্টার আছে। আমরা ডিভাইসগুলো আস্তে আস্তে এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে অন্য জায়গায় সার্ভিসগুলো আপ করার চেষ্টা করছি। এই ভবনের দশমতলায় যেহেতু ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তাই আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করছি যে, বিদ্যুতের সংযোগটির ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য। এটা চালু হলে আমরা দ্রুত সার্ভিসগুলো চালু করে দিতে পারি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত