কেমন চলছে ঈদের সিনেমা

আপডেট : ০১ জুন ২০২৬, ০৭:০৫ এএম

ঈদের সিনেমা কোনটি কেমন, কার অভিনয় ভালো লেগেছে, গানগুলো কী রকম হয়েছে, ব্যবসায়িক দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে কোনটি এ রকম অনেক কৌতূহল তৈরি হয়েছে দর্শকের মনে। সিনেমা সংশ্লিষ্টদের প্রচারণা, রিভিউ এবং টিজার, ট্রেলার দেখেও অনেকেই যারা এখনও সিনেমা হলে গিয়ে ঈদের সিনেমা দেখেননি, তাদের মনেই এই কৌতূহল বেশি। কাছের মানুষদের মুখ থেকে এসব শোনার পর অনেকেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কোন কোন সিনেমা দেখবেন। তবে যারা প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখেছেন, তাদের বেশিরভাগই উৎসবের আমেজেই পরিপূর্ণ বিনোদন উপভোগ করেছেন। যদিও কেউ কেউ প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে নানা রকম ইতিবাচকের পাশাপাশি নেতিবাচক মন্তব্যও করেছেন। গল্পটা ভালো হলেও মেকিং তেমন সুন্দর হয়নি, অভিনয়ে অমুক শিল্পী আরও ভালো করতে পারতেন, গান ভালো হলেও পারফরম্যান্স ছিল তুলনামূলক দুর্বল এ রকম সমালোচনাও করেছেন অনেক দর্শক। আবার টিকিট পেয়ে সিট না পাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। 

তবে দর্শকের এমন সমালোচনাকে গঠনমূলক হিসেবে নিচ্ছেন সিনেমা নির্মাতারা। সব মিলিয়ে ঈদের সিনেমায় উৎসবমুখর পরিবেশই বিরাজ করছে প্রেক্ষাগৃহগুলোয়। ঈদের প্রথম দিন থেকেই তারকা, নির্মাতা ও কলাকুশলীদের আনাগোনায় জমে ওঠে দেশের মাল্টিপ্লেক্স ও সিঙ্গেল স্ক্রিনগুলো। দর্শকের সঙ্গে সরাসরি দেখা তাদের প্রতিক্রিয়া শোনা সব মিলিয়ে ঈদ সিনেমার প্রচারণা যেন একেবারেই হলভিত্তিক উৎসবে রূপ নিয়েছে।

এবারের ঈদুল আজহায় শুরুতে এক ডজনের বেশি সিনেমা মুক্তির কথা থাকলেও শেষমেশ আটটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে দেশের ১৮১টি প্রেক্ষাগৃহে, যার সিংহভাগই চিত্রনায়ক শাকিব খানের দখলে। প্রতি ঈদের মতো এবারও ঈদের মূল প্রাণ ছিলেন এই তারকা, যার সিনেমা মুক্তি পাওয়ার খবরেই খুলে যায় বন্ধ থাকা শতাধিক প্রেক্ষাগৃহ। যার দরুণ এবারও শাকিবের ধারে কাছে নেই কোনো অভিনয়শিল্পী।

এবার ঈদে ১০৩টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে শাকিব খানের ‘রকস্টার’। সামগ্রিক বিচারে স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায়িক দিক থেকে শীর্ষে অবস্থান করছেন সিনেমাটি। ঈদের প্রথম দিন থেকেই ছবিটি দর্শকের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলছে এবং বক্স অফিসে ঝড় তুলেছে। রোমান্স, মিউজিক ও ভিন্নধর্মী অ্যাকশন ধাঁচের এই চলচ্চিত্রটি ঘিরে দর্শকের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা তৈরি করেছে। দর্শকের উপচে পড়া ভিড় এবং অগ্রিম টিকিট বুকিংয়ের চাপের কারণে মুক্তির দ্বিতীয় দিনেই সিনেমাটির দৈনিক শোর সংখ্যা ১৮টি থেকে বাড়িয়ে ৩৬টি (দ্বিগুণ) করা হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ ও পরিবার নিয়ে আসা দর্শকরা স্টার সিনেপ্লেক্স ও সিঙ্গেল স্ক্রিনগুলোতে সিনেমাটি দারুণ উপভোগ করছেন। শাকিব খানের নতুন ‘রক লুক’, স্টাইলিশ অ্যাকশন এবং ছবির চমৎকার মিউজিক সবার মন ছুঁয়েছে। সিনেমাটির পরিচালক আজমান রুশো এবং অভিনেত্রী সাবিলা নূর ও তানজিয়া মিথিলা বিভিন্ন মাল্টিপ্লেক্সে গিয়ে দর্শকের সঙ্গে দেখা করছেন। পরিচালক বলেন, ‘এই সিনেমায় প্রচলিত অ্যাকশন বা আইটেম গান নেই। আমরা দর্শকদের নতুন গল্প দিতে চেয়েছি। দর্শকের প্রতিক্রিয়া বুঝতে আরও সময় লাগবে।’

হলের সংখ্যা ও দর্শকের উপস্থিতির বিচারে রকস্টারের পরের স্থানেই রয়েছে ‘মালিক’ সিনেমাটি। সাইফ চন্দন পরিচালিত এই সিনেমাটি দেশের ৩২টি প্রেক্ষাগৃহে চলছে। অনেক শো-ই এরই মধ্যে হাউজফুল। এর মাধ্যমে প্রায় ৭ বছর পর শুভর বিপরীতে দেখা মিলল লাক্স তারকা বিদ্যা সিনহা মিমের। বিভিন্ন সিনেমা হল পরিদর্শন ও হল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,  মুক্তির পর থেকে সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে বেশ ভালো সাড়া পাচ্ছে। স্টার সিনেপ্লেক্সসহ দেশের বিভিন্ন সিনেমা হলে দর্শক সিনেমাটি দেখে পজিটিভ রিভিউ দিচ্ছেন। ঈদের তৃতীয় দিন থেকেই সিনেমাটি ‘অডিয়েন্স ডিমান্ডিং’ মুভি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ফ্যামিলি ড্রামা এবং চমৎকার চিত্রনাট্যের কারণে দর্শক হল থেকে হাসিমুখে বের হচ্ছেন।

মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত ‘রইদ’ ঈদের দিন থেকেই প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে। বিভিন্ন হলে গিয়ে টিম সদস্যরা দর্শকের প্রতিক্রিয়া নিচ্ছেন। বেশ কিছু শো এরই মধ্যে হাউজফুল হওয়ায় সিনেমাটির আলোচনা আরও বেড়েছে। চলচ্চিত্র মহলে এবং সাধারণ দর্শকের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলছে। এর আগে সিনেমাটি মর্যাদাপূর্ণ ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রটারড্যামের ৫৫তম আসরের মূল ‘টাইগার প্রতিযোগিতা’ বিভাগে অফিশিয়ালি নির্বাচিত ও প্রদর্শিত হয়েছিল।

গল্প ও আবহ : এটি মূলত আদম ও হাওয়ার আদিম আখ্যানের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি মেটাফোরিক্যাল রহস্যধর্মী ফ্যামিলি ড্রামা। গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে সাদু, তার পাগল স্ত্রী এবং তাদের বাড়ির পাশের একটি তালগাছকে কেন্দ্র করে এর কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। সিনেমাটিতে প্রধান চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান ও নাজিফা তুষি। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আছেন গাজী রাকায়েত এবং আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদ। সিনেমা বোদ্ধা এবং সাধারণ দর্শক এটিকে একটি ‘মাস্টারপিস’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। এর চমৎকার মেকিং, গভীর জীবনদর্শন এবং চমৎকার সিনেমাটোগ্রাফির কারণে এটি স্টার সিনেপ্লেক্স ও লায়ন সিনেমাসসহ দেশের প্রধান মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে বেশ ভালো ব্যবসা করছে।

সরকারি অনুদানের সিনেমা ‘বনলতা সেন’ মাল্টিপ্লেক্সে চলছে আটটি প্রেক্ষাগৃহে। প্রতিদিনই একাধিক শো হাউজফুল যাচ্ছে। মাসুদ হাসান উজ্জ্বল পরিচালিত এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন খাইরুল বাসার, গাজী রাকায়েত, সোহেল মণ্ডল, নাজিবা বাশার, প্রিয়তী উর্বি, রুপন্তি আকিদ, শরীফ সিরাজ ও সুমাইয়া খুশি। তারকা ও কলাকুশলীরা নিয়মিত প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দর্শকের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। প্রথম দিন থেকেই প্রেক্ষাগৃহে অসাধারণ সাড়া ফেলছে এবং দর্শকদের প্রশংসায় ভাসছে। কবি জীবনানন্দ দাশের কালজয়ী কবিতা অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমার টিকিট না পাওয়ারও ঘটনা ঘটেছে ঈদের দ্বিতীয় দিনে। এর নির্মাণশৈলী ও সিনেমাটোগ্রাফি দর্শকদের মুগ্ধ করছে। সিনেমাটিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মাসুমা রহমান নাবিলা এবং কবি জীবনানন্দ দাশের চরিত্রে অভিনয় করেছেন খায়রুল বাসার। তাদের অনবদ্য অভিনয় ও পর্দার রসায়ন দর্শকমহলে ব্যাপক সমাদৃত হচ্ছে।

অ্যাকশন-থ্রিলারধর্মী ‘তছনছ’ মূলত পুরোদস্তুর একটি বাণিজ্যিক সিনেমা। ঢালিউডের সফল নির্মাতা বদিউল আলম খোকন পরিচালিত এই সিনেমাটি নিয়ে দেশের বিভিন্ন হলের দর্শকের মধ্যে মিশ্র থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রথমবার দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করছেন ববি হক। একটি চরিত্র সহজ-সরল ও অন্যটি প্রতিবাদী তরুণীর। এ প্রসঙ্গে ববি বলেন, ‘প্রথমবার দ্বৈত চরিত্রে কাজ করছি। চিত্রনাট্য ভালোভাবে পড়েছি, সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়েছি। নতুন অভিজ্ঞতা হতে চলেছে। আশা করছি, কাজটি ভালোভাবে শেষ করতে পারব।’ ববির বিপরীতে রয়েছেন সিনেমাটির প্রযোজক মুন্না খান। জানা গেছে, সিনেমাটি ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সিঙ্গেল স্ক্রিনে এবং ঢাকার ফতুল্লা, বনানী ও সাভারের মতো এলাকায় বেশ দর্শক টানছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের হলগুলোতে শিস ও হাততালির মাধ্যমে দর্শকরা সিনেমাটি উপভোগ করছেন।

সৈকত নাসির পরিচালিত ‘মাসুদ রানা’ এবার ঈদে মাল্টিপ্লেক্সে চারটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে। সিনেমাটির টিমও নিয়মিত হলে গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। কিছু শো এরই মধ্যে হাউজফুল হওয়ায় দর্শকের আগ্রহ বাড়ছে। এতে অভিনয় করেছেন রাসেল রানা, পূজা চেরি ও সৈয়দা তিথি অমি। সিনেমাটি প্রযোজনা করেছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও জাজ মাল্টিমিডিয়া। এটিও দর্শকদের মধ্যে বেশ ভালো কৌতূহল ও ইতিবাচক সাড়া তৈরি করেছে। কাজী আনোয়ার হোসেনের কালজয়ী স্পাই থ্রিলার উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমাটি নিয়ে ঈদের চতুর্থ দিনেও (গতকাল রবিবার) দর্শকের উন্মাদনা দেখা গেছে। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও জাজ মাল্টিমিডিয়ার যৌথ প্রযোজনায় সিনেমাটি নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন নতুন অভিনেতা রাসেল রানা এবং তার সাবলীল অভিনয় ও লুক দর্শকদের বেশ মুগ্ধ করেছে। সিনেমাটি নিয়ে জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আব্দুল আজিজ এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে, তিনি ঘোষণা দিয়েছেন কারও যদি সিনেমাটি ভালো না লাগে, তবে টিকিটের পেছনে নাম ও বিকাশ নম্বর লিখে পাঠালে টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। স্পাই থ্রিলার এবং অ্যাকশনপ্রেমী দর্শকরা সিনেমাটিকে বেশ পছন্দ করছেন। তবে কিছু সমালোচকের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে নির্মাণকাজ চলায় কিছু জায়গায় আধুনিক স্পাই থ্রিলারের চেয়ে কিছুটা অতিনাটকীয় বা চেনা ঢালিউড বাণিজ্যিক ধারার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে।

আদর আজাদ ও শবনম বুবলী অভিনীত ‘পিনিক’ সিনেমাটিও মোটামুটি ভালো দর্শক টানছে। পর্দায় তাদের কেমিস্ট্রি দর্শক বেশ পছন্দ করেছেন। মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ও অ্যাকশন ঘরানার সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন জাহিদ জুয়েল । মুক্তির আগে এর আইটেম গান এবং ট্রেলার দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল, যা মুক্তির পর সিনেমা হলে দর্শক টানতে সাহায্য করছে।

ঈদের আরেক সিনেমা ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’ও সাড়া জাগাচ্ছে দর্শকমহলে। বলা চলে, এটি এবারের ঈদে ভিন্নধর্মী এক সংযোজন। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হল সংস্কৃতি, গণরুমের রূঢ় বাস্তবতা এবং ছাত্র রাজনীতির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই রাজনৈতিক স্যাটায়ার চলচ্চিত্রটি সচেতনতার বার্তা দিচ্ছে।  মুক্তির আগেই সিনেমাটি ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘বাংলাদেশ প্যানোরামা’ বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতেছে। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটি আয়োজিত ‘আমার ভাষার চলচ্চিত্র উৎসব’-এ এটি মর্যাদাপূর্ণ ‘হীরালাল সেন পদক’ নিজের করে নেয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত