দর বাড়ার অন্যতম কারণ মহাসড়কের ওজন স্কেল

আপডেট : ০৩ মে ২০১৯, ০৩:২২ পিএম

শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। রোজায় ভোক্তার বাড়তি চাহিদার সুযোগ নিয়ে প্রতিবারই বাজারে অস্থিরতা নামে। ‘পর্যাপ্ত মজুদ আছে, রোজায় কোনো পণ্যের দামই বাড়বে না’ সরকারের দায়িত্বশীলদের এ ধরনের বক্তব্যের মধ্যেও রোজার বাজারে ছোলা, ডাল, চিনি, তেল, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দেখা দেয়। এজন্য অসাধু ব্যবসায়ীদের অধিক মুনাফার লোভ ও কারসাজিকে দায়ী করে থাকেন অনেকে। রোজার বাজার স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার গঠিত বাজার মনিটরিং টিম, ভ্রাম্যমাণ আদালত দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঠে রয়েছে। তা সত্ত্বেও রোজা শুরুর ১৫ দিন আগে থেকেই বাড়তে শুরু করেছে বিভিন্ন পণ্যের দাম। সারা দেশে ভোগ্যপণ্য সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্যের আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত ‘খাতুনগঞ্জ’।

রমজান সামনে রেখে দেশে ভোগ্যপণ্যের আমদানি, সরবরাহসহ বাজারদরের সার্বিক অবস্থা নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সগীর আহমদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক শামসুল ইসলাম

দেশ রূপান্তর : এবার রোজার মাসে কি পণ্যমূল্য বাড়ার আশঙ্কা আছে বলে মনে করেন?
সৈয়দ সগীর আহমদ : অন্য সময়ের তুলনায় রোজার মাসে ছোলা, চিনি, পেঁয়াজ, তেল, ডালসহ বেশকিছু পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে সব কটি পণ্যের মজুদই চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি আছে। তাই এবার রমজানে কোনো পণ্যের দাম বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ দেখছি না আমি।

দেশ রূপান্তর : কিছু পণ্যের দাম তো এরই মধ্যেই বেড়ে গেছে, এর কারণ কী?
সৈয়দ সগীর আহমদ : এখন দর বাড়ার একটি বড় কারণ হলো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওজন স্কেল। সারা দেশে ২২টি মহাসড়কের কোথাও ওজন স্কেল না থাকলেও চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কে এটা বসানো হয়েছে। এই মহাসড়ক দিয়ে ছয় চাকার গাড়িতে ১৩ টনের বেশি পণ্য নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ এসব গাড়ির পরিবহনক্ষমতা এর দেড় গুণ বেশি। দেশের আমদানি পণ্যের সিংহভাগ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসে। ফলে পণ্যগুলো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়েই সারা দেশে পৌঁছায়। এই ওজন স্কেলের কারণে ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই তার প্রভাব পড়ছে পণ্যমূল্যের ওপর। আমরা মনে করি, চট্টগ্রামের সঙ্গে দেশের অন্যান্য স্থানের একটি বাণিজ্যিক বৈষম্য সৃষ্টির জন্য এ কাজটি করা হয়েছে। বিষয়টি চট্টগ্রাম চেম্বারসহ ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিসহ চট্টগ্রামের মন্ত্রীদের জানানো হয়েছে। তবে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভোক্তাদের স্বার্থে বিষয়টির সুরাহা হওয়া দরকার।

দেশ রূপান্তর : রোজায় পণ্যমূল্যের অস্থিতিশীলতার পেছনে খাতুনগঞ্জের কিছু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধেও কারসাজির অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
সৈয়দ সগীর আহমদ : ভোগ্যপণ্য আমদানির বড় অংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হলেও দেশের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ নেই। মুক্তবাজার অর্থনীতির এই সময়ে আমদানি বাণিজ্যের মাত্র ৩২ থেকে ৩৩ শতাংশ হয় খাতুনগঞ্জে। বাকিটা নিয়ন্ত্রণ করেন দেশের অন্যান্য স্থানের ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন স্থলবন্দর ও অন্যান্য বন্দর দিয়েও এখন বিভিন্ন ধরনের ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়। তা ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া পণ্যের কন্টেইনার সরাসরি চলে যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে। এখন খাতুনগঞ্জে পণ্য গুদামজাতের প্রতিযোগিতা হয় না, প্রতিযোগিতা চলে কার আগে কে পণ্য বিক্রি করে ব্যাংকঋণ শোধ করবে, তা নিয়ে। কাজেই ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির জন্য খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের দায়ী করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, অমূলক।

দেশ রূপান্তর : রমজানে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসনের কোন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?
সৈয়দ সগীর আহমদ : এ কথা সত্য যে, চাহিদার তুলনায় কোনো পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি থাকলে ওই পণ্যের দাম বাড়বে। কিন্তু এবারের রমজানে কোনো পণ্যেরই চাহিদার তুলনায় ঘাটতি নেই। বরং বেশি আছে। তাই সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চললে দাম বাড়ারও কোনো কারণ নেই। তা সত্ত্বেও কেউ যাতে অধিক মুনাফার লোভে কৃত্রিম সংকট করে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করতে না পারে, সেজন্য বাজারের ওপর যথাযথ মনিটরিং প্রয়োজন।

দেশ রূপান্তর : ইতিমধ্যেই খুচরা বাজারে অনেক পণ্যের দাম বাড়তি। এটা নিয়ন্ত্রণের উপায় কী?
সৈয়দ সগীর আহমদ : খুচরা বাজারের ওপর বাড়তি নজরদারি রাখতে হবে। কারণ, খুচরা বাজার থেকেই ক্রেতারা পণ্য কেনেন। পাইকারি ও খুচরা বাজারে দামের ব্যবধান যৌক্তিক পর্যায়ে থাকতে হবে। অতীতে দেখা গেছে, পাইকারিতে দাম না বাড়লেও বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়িয়ে খুচরা বাজারে দাম বাড়িয়ে কেউ কেউ ফায়দা লুটছে। এ বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি ও কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে। কেউ সুযোগ বুঝে দাম বাড়িয়ে যাতে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে না পারে, সে বিষয়ে সকলকে সতর্ক থাকতে হবে। এজন্য খুচরা বাজারের দোকানগুলোতে প্রকাশ্যে পণ্যের মূল্যতালিকা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে পণ্যের মূল্যতালিকা দেখে পাইকারি বাজারের সঙ্গে খুচরা বাজারের ব্যবধা বোঝা যায়।

দেশ রূপান্তর : রোজার বাজার নিয়ন্ত্রণে টিসিবির করণীয় কী?
সৈয়দ সগীর আহমদ : টিসিবির মাধ্যমে রমজানে নামকাওয়াস্তে ভোগ্যপণ্য বিক্রি করা হয়, তা বাজারে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর প্রভাব ফেলতে টিসিবিকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। আরও বেশি পণ্য দেশজুড়ে বিক্রির উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে খুচরা ব্যবসায়ীরা নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম নিতে পারবে না।

দেশ রূপান্তর : খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি এখন কেমন?
সৈয়দ সগীর আহমদ : একটা সময় ছিল, যখন খাতুনগঞ্জ দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের নেতৃত্ব দিয়েছে। খাতুনগঞ্জের আগের সেই জৌলুস এখন আর নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগ্যপণ্যের বাজারে নানা উত্থান-পতন, অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারা, অবকাঠামোগত সমস্যাসহ নানা কারণে অনেকেই এখান থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ খাতুনগঞ্জ থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় ব্যবসা স্থানান্তর করে ফেলেছেন। একসময় দেশের বড় বড় শিল্প গ্রুপগুলোর প্রধান কার্যালয় ছিল খাতুনগঞ্জে। এখন তা চলে গেছে ঢাকায়। তা ছাড়া জলাবদ্ধতা খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের বড় দুঃখ। প্রায়ই জোয়ারের পানিতে ভাসে খাতুনগঞ্জ। ভারী বর্ষণ হলেও সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। এখানকার পণ্য গুদামগুলোতে পানি ঢুকে নষ্ট হয় কোটি কোটি টাকার ভোগ্যপণ্য। এসব কারণে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়িক ঐতিহ্য দিনকে দিন কমে যাচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
সৈয়দ সগীর আহমদ : আপনাকে এবং দেশ রূপান্তরের পাঠকদেরও অনেক ধন্যবাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত