কৃষি খাতের বাণিজ্যিক রূপান্তর প্রয়োজন

আপডেট : ২৪ মে ২০১৯, ১২:৪০ পিএম

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক এবং সাবেক উপাচার্য এম এ সাত্তার মন্ডলের জন্ম ১৯৪৯ সালের ২৯ মে ফরিদপুরের নগরকান্দা থানার উত্তর গোপীনাথপুর গ্রামে। তার বাবার নাম আব্দুল গফুর মন্ডল এবং মাতা সাহেরা খাতুন। ১৯৬৫ সালে ফরিদপুরের কৃষ্ণপুর হাই স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭২ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং সেখানকার কৃষি অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ১৯৭৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন এবং এতেও তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৯৭৯ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি এবং ১৯৮৬ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি সম্পন্ন করেন তিনি। ২০০৮-১১ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া দুই মেয়াদে তিনি বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলেন। দেশের সাম্প্রতিক কৃষি পরিস্থিতি নিয়ে খ্যাতনামা এই কৃষি অর্থনীতিবিদ খোলামেলা কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অনিন্দ্য আরিফ

দেশ রূপান্তর : দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিধানে কৃষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। ধান উৎপাদনের প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন শীর্ষে। এই পরিস্থিতি সত্ত্বেও কৃষকরা কেন এখন ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন?
এম এ সাত্তার মন্ডল : কৃষকরা ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না, এ কথাটি আমরা সাধারণভাবে বলছি। কৃষকরা তো কিছু কিছু ফসলে ভালোই মূল্য পাচ্ছে। কিন্তু আমরা এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করি না। তখন মনে করি, এটা তো পাওয়াই উচিত। যেমন, শাক-সবজির দাম ভালোই পাওয়া যাচ্ছে। মাছের দাম একই পর্যায়ে রয়েছে। পাটের দাম কখনো ভালো পাওয়া যায়, আবার কখনো কম। তবে কয়েক বছরে ভালোই দাম পাওয়া যাচ্ছে। আবার আলুর দাম কমতির দিকে যাচ্ছে। কৃষকরা আরেকটু ভালো দাম পেলে তাদের আর্থিক উন্নতি হতো সেটা আমরা সবাই স্বীকার করছি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমরা কৃষিকে যে ‘খোরপোশ’ অবয়বে দেখছি তা থেকে একে ‘বাণিজ্যিক কৃষিতে’ পরিণত করতে হবে। সেক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আধা বিঘা বা দুই বিঘা জমির মালিকদের নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে লাভজনক কৃষি গড়ে তোলা কঠিন হবে। এজন্য আমাদের খামারের আয়তন বাড়িয়ে প্রযুক্তি ব্যবহার করে দক্ষতার সঙ্গে চাষাবাদ করতে হবে। এটা আইন করে হবে না। আমাদের ধীরে ধীরে এগোতে হবে। কৃষি ব্যবসাটাকে সামনে আনতে হবে।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ সরকারের ২২ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ করার মতো স্থান রয়েছে। বলা হচ্ছে, এটা খাদ্যশস্য মজুদ করার জন্য অপর্যাপ্ত। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
এম এ সাত্তার মন্ডল : আমি মনে করি, খাদ্যশস্য মজুদ করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের যে সক্ষমতা তা পর্যাপ্তই রয়েছে। এখন সরকার যদি এটিকে দ্বিগুণ করে তবুও এই সমস্যার সমাধান হবে না। সরকার বাংলাদেশের সকল শস্য সংরক্ষণ করার মতো ভান্ডার গড়ে তুলবে এটা সমীচীনও নয়, সম্ভব নয়। এটি বেসরকারি খাতের কাজ। আমাদের দেড় কোটি কৃষক পরিবারের মধ্যে উদ্যোক্তা আছে, এবং আমাদের ১৭/১৮ হাজার চালকল মালিক আছে। তাদের সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যবসাটা যাতে ভালোভাবে হয়, সে জন্য তথ্যপ্রবাহেরও দরকার আছে। তাই আমি মনে করছি, সরকারের যে ২২ লাখ টন মজুদ করার মতো সংস্থান রয়েছে, এটা পর্যাপ্ত।

দেশ রূপান্তর : ধানের ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষকরা অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকবে। তখন ধানের ঘাটতি দেখা যাবে। এক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়?
এম এ সাত্তার মন্ডল : আমি মনে করি না কোনো ঘাটতি দেখা দেবে। কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না এজন্য কষ্ট আছে, দুঃখ আছে। আমরাও সহানুভূতিশীল। সরকারও তৎপরতা দেখাচ্ছে। তারপরেও অনেক কৃষক আছে, যারা শুধু পারিবারিকভাবে খাদ্য সংস্থানের জন্যই ধান উৎপাদন করে না বরং তারা এর উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। এর প্রযুক্তির সঙ্গে সুপরিচিত। সুতরাং, এটা তারা করে যাবেন। অন্যদিকে, অনেকের পক্ষেই ধান ছাড়া অন্য কিছু উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত হওয়াও সম্ভব নয়। এটা যেমন ঠিক, তেমনি যেসব কৃষকের পুঁজি আছে, প্রযুক্তি আছে, তারা ফলবাগান বা সবজিবাগানের দিকে ঝুঁকছে। এটা খারাপ কিছু না। এতে আশঙ্কার কিছু নেই।

দেশ রূপান্তর : এমন পরিস্থিতিতে কী কী পদ্ধতি গ্রহণ করে কৃষকদের জন্য ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যায়?
এম এ সাত্তার মন্ডল : ধানের ন্যায্যমূল্য মানে আরেকটু বেশি দাম পাওয়া। সেটা তো চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। গত দুই বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, সরকারের মজুদ বেড়ে যাচ্ছে। সরকারের প্রায় ১২/১৩ লাখ টনের চালের মজুদ আছে। এদিকে বেসরকারি খাতেও যথেষ্ট চাল আমদানি করা হয়েছে। আমদানি শুল্ক রহিত করে এক্ষেত্রে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। বাইরে থেকে ব্যবসা করার জন্য চাল আমদানি করার মাধ্যমে তারা এক ধরনের ঝুঁকিও নিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করবেন। তারা দেশে যে ধান উৎপাদন হচ্ছে সেটা কিনতে পারছেন না। সরকারও গুদাম খালি করতে পারছে না। আর সরকার এত ধান দিয়ে করবেটা কী? তারা তো শুধু চাল কেনে। সরকারের তো আর চালকল নেই। এটা সবার জন্য বিব্রতকর অবস্থা। এটা কাটিয়ে ওঠার জন্য সবারই চেষ্টা করতে হবে। আগে থেকেই যেন আমরা চাহিদা ও সরবরাহের পরিমাণটা নিরূপণ করতে পারি। বিশ্ববাজারের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কোন দেশে কী পরিমাণ ধান উৎপাদন হচ্ছে সেই তথ্য কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে পারি। আমরা শুধু তথ্য সরবরাহ করব, কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারব না। এটা বেসরকারি খাত। যার যে সিদ্ধান্ত, সে নিজে নেবে। এমনটা আশা করা যায়।

দেশ রূপান্তর : পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ফসলের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করার জন্য কমিশন ফর এগ্রিকালচার কস্ট অ্যান্ড প্রাইসেস (সিএসপি) নামে বিভাগ রয়েছে। বাংলাদেশেও কি এ ধরনের বিভাগ চালু করা প্রয়োজন?
এম এ সাত্তার মন্ডল : এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা। ভারতে সিএসপি নামে একটি সরকারি কমিশন রয়েছে। বাংলাদেশেও ১৯৯৯ সালের কৃষিনীতিতে এরকম একটা উদ্যোগের কথা চিন্তা করা হয়েছিল। যে কোনো কারণে এটা করা যায়নি। এটাকে এখন সুচিন্তিতভাবে সামনে নিয়ে আসা দরকার। কেননা আমাদের কৃষিও এখন বাণিজ্যিক কৃষিতে পরিণত হচ্ছে। কোনো ধরনের বাণিজ্যিক ধস যেন কৃষকদের ক্ষতি না করে। সে জন্য সবসময়েই তথ্য-উপাত্ত নির্ভর বিশ্লেষণ দরকার। এক্ষেত্রে সরকারের একটা সংস্থা এই কাজ করার জন্য দরকার। অথচ আমাদের দেশে এখনো পর্যন্ত এই ধরনের সংস্থা নেই। তাই, ভারতের সিএসপির মতো কমিশন এখানেও দরকার।

দেশ রূপান্তর : সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান না কিনে ধান-চাল কিনছে চালকলের মালিকদের কাছ থেকে। এতে পোয়াবারো হচ্ছে ফড়িয়া-দালাল ও চালকল মালিকদের। এই বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
এম এ সাত্তার মন্ডল : এই কথাটি সর্বসম্মতভাবে বলা হচ্ছে। কিন্তু বিষয়টিকে একটু গভীরভাবে ভাবা দরকার। সরকার কীভাবে দেড়কোটি কৃষক পরিবার থেকে সরাসরি ধান কিনবে। এটা কি সম্ভব? এটা তো প্যাকেট করে কিনে আনা সম্ভব নয়। এটা তো ধান। ধানের মধ্যে আর্দ্রতা থাকবে। ধানের মধ্যে ভেজা থাকবে, চিটা থাকবে। এই রকম ধান প্রত্যেক পরিবারের কাছ থেকে কিনে আনা সরকারের পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু এটা বলে সরকারকে আরও তৎপর করার চেষ্টা হচ্ছে। এই ধরনের চেষ্টাকে আমি গ্রহণ করছি। তবে কথা হলো, সরকার তো চুক্তিবদ্ধ হয়েছে চালকল মালিকদের সঙ্গে। তারা তো মাঠে নামেনি। তারা যদি মাঠে নামত, তারা যদি কিনত, তাহলে এই প্রশ্নটা এত বড় করে দেখা দিত না। তারা এখন কিনতে পারছে না, তাদের গুদামে আর কোনো জায়গা নেই। অথবা তারা হয়তো বা আরও অপেক্ষা করছে। সরকার যেটা করতে পারে সেটা চাল কেনার একটা টার্গেট নির্ধারণ করা। সেটা সরকার দেড় লক্ষ টন করেছিল। এখন বাড়িয়েছে কি না জানি না। সরকারকে চালকল মালিকদের কাছ থেকেই চাল কিনতে হবে।

আর ফড়িয়া-দালালদের যে কথা বলছেন সেটাকে সবসময়ে খারাপ অর্থে ধরা যাবে না। তাদের তো ইতিবাচক ভূমিকাও আছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান কেনা, এটা সরকারের পক্ষেও সম্ভব নয়, চালকল মালিকদের পক্ষেও সম্ভব নয়। ফড়িয়া-ব্যাপারীরাই এই কাজটা করে থাকে। তারা আধা বিঘা, এক বিঘার মতো ছোট ছোট জমির মালিকদের কাছ থেকে দুই মণ, পাঁচ মণ কিংবা দশ মণ করে ধান কিনে এক জায়গায় সংগ্রহ করে থাকে। তারাও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রামীণ কৃষক পরিবারের সন্তান। তারা বড় ব্যবসায়ী নয়। তাই তাদের ব্যাপারটিকে সবসময়ে নেতিবাচকভাবে দেখলে চলবে না। বরং তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে, তাদের সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। তাদের আর্থিক সহযোগিতা, ঋণ সহযোগিতা ইত্যাদির কথা চিন্তা করা যেতে পারে।

দেশ রূপান্তর : নিয়মিত বাজারের সরবরাহ পরিস্থিতি মনিটর ও তার ভিত্তিতে আমদানির ওপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা কি ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি অন্যতম উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়?
এম এ সাত্তার মন্ডল : এটা সরকার করছে। সীমিত ক্ষমতা দিয়ে তারা এটা করছে। বাজার মনিটরিং তো হচ্ছে। তবে ধান-চালের মনিটারিং কতখানি হচ্ছে এটা এখনই বলা সম্ভব নয়। ধান-চাল কেনা তো শুরুই হয়নি। সুতরাং, মনিটরিং একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যে সংস্থা যা কিছু করবে তার জন্য তো একটা মনিটরিং থাকাই উচিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত