এরশাদকে প্রত্যাখ্যান গায়ের জোরের কথা

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৯, ০৩:০৪ পিএম

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জি এম কাদের। বড় ভাই সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাত ধরেই রাজনীতিতে আসেন তিনি।  ১৯৯৬ সালে তিনি প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর অষ্টম, নবম এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লালমনিরহাট থেকে নির্বাচিত হয়েছেন জি এম কাদের। ২০০৯ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত মহাজোট সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতিতে এসে বড় ভাই এরশাদের আস্থা অর্জন করেন তিনি। জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও আমৃত্যু চেয়ারম্যান সদ্যপ্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিজের অবর্তমানে ছোট ভাই ও দলটির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে ঘোষণা করে যান। পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবদ হিসেবে ইতিমধ্যে খ্যাতিলাভ করেছেন তিনি। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রাজনীতি এবং সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দলীয় কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেন জি এম কাদের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক পাভেল হায়দার চৌধুরী

দেশ রূপান্তর : জাতীয় পার্টি এবং বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আপনার আগামী পরিকল্পনা কী? সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য আপনার রয়েছে কি, যা বাস্তবায়নে কাজ করতে চান?
জি এম কাদের : জাতীয় পার্টি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংগঠন। জনগণের সর্বস্তরে আমাদের সমর্থক আছে, সংগঠন আছে, অস্তিত্ব আছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পরে জাতীয় পার্টিই এখন তিন নম্বর রাজনৈতিক দল। আমি আশাবাদী এই সংগঠনটিকে সুসংগঠিত করা সম্ভব। এখন ওই কাজটাই আমরা করে যাচ্ছি। জাতীয় পার্টি সুসংগঠিত হয়ে জনগণের প্রত্যাশিত রাজনীতি ও রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব। আমরা বিশ্বাস করি যে, জাতীয় পার্টি জনগণের দল হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে।  শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারবে রাজনীতিতে এবং বিরোধী দলে। দলকে সুসংগঠিত করতে আমি যা করতে চাই, তা হলো- জাতীয় পার্টি নেতাকেন্দ্রিক দল হবে না, সদস্য-কর্মী-সমর্থককেন্দ্রিক দল হবে।  জাতীয় পার্টির মাধ্যমে রাজনীতিতে এ পরিবর্তনের সূচনা করতে চাই যে- রাজনীতি ব্যবসা নয়, কোনো কিছু পাওয়ার জন্য বা অর্থ সম্পদের মালিক হওয়ার জন্য নয়, রাজনীতি হবে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার, ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতায়।

দেশ রূপান্তর : জাতীয় পার্টিতে নেতৃত্ব নির্বাচনে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় সেটা কি যথাযথ? একটা দলের ভেতরে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা না গেলে সেই দল রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কতটা ভূমিকা রাখতে পারে আসলে?
জি এম কাদের : কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, নেতাকেন্দ্রিক দল; আমাদের দেশের তিনটা রাজনৈতিক দলেই আছে- আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। আমি এটা থেকে বেরিয়ে এসে পরিবর্তনের সূচনা করতে চাই জাতীয় পার্টির মাধ্যমে। আবার নেতাকর্মীদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া মানেই সব কিছু করা হলো তা কিন্তু নয়। একটা জিনিস মনে রাখতে হবে যে, গন্তব্য কী হবে, কোথায় যাব এটা আমাকে নেতাকর্মীরা ঠিক করে দিতে পারে। কিন্তু নেতা যখন ড্রাইভিং সিটে বসবে তখন সে কীভাবে গাড়ি চালাবে সেটা তার ওপর নির্ভর করবে। নেতাকে সুযোগ দিতে হবে। গাড়ি চালানোর সময়ে তার স্টিয়ারিং ধরে টানাটানি করলে গাড়ি সে ঠিকভাবে চালাতে পারবে না। কাজেই অতটুকু ক্ষমতা তাকে দিতে হবে। তবে তার ক্ষমতা ব্যবহার অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় রাখতে হবে।

দেশ রূপান্তর : এরশাদ পরবর্তী জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছিল। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে আপনি কি দলের ভেতর নেতৃত্ব এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় আত্মবিশ্বাসী?
জি এম কাদের : দলের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, দ্বন্দ্ব, এসব দূর করার ব্যাপারে অবশ্যই শতভাগ আত্মবিশ্বাসী আমি।

দেশ রূপান্তর : এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি বিভিন্ন সময়ে নানারকম রাজনৈতিক জোটে ছিল।  এখন আপানারা আছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটে। একইসঙ্গে আপনারা সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায়। এভাবে সংসদকে কার্যকর করা যাবে বলে মনে করেন কি?
জি এম কাদের : এভাবে থেকেই জাতীয় পার্টি অগ্রসর হয়েছে, সামনেও এগিয়ে যাবে। নিজেদের অস্তিত্বকে, পার্টির গুরুত্বকে ধরে রাখতে পেরেছে এবং পারবে। রাজনীতি মানে এটাই। রাজনীতি হলো ‘অ্যান আর্ট অফ কম্প্রোমাইজ, আর্ট অফ অ্যাডজাস্টমেন্ট।’ এটা না করলে কোনো রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দল টিকবে না। জাতীয় পার্টি এতদিন যেখানে ছিল, সেখানে  থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে। সেগুলো ডিপেন্ড করবে সময় এবং রাজনীতির গতিধারার ওপর। কখন কোথায় থাকতে পারে, কোথায় থাকবে সব কিছুর সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতাকর্মীদের ইচ্ছার ভিত্তিতেই হবে।

দেশ রূপান্তর : বিরোধী দল হিসেবে কতখানি সফল জাতীয় পার্টি?
জি এম কাদের : বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি অনেকখানি বিকশিত হয়েছে। আমি খারাপ কিছু দেখছি না। আমার মনেও এই নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু এবার এরশাদ সাহেবের মৃত্যুর পরে যেভাবে সারা দেশ থেকে সাড়া পেয়েছি তাতে মনে হয়েছে, জাতীয় পার্টির প্রতি মানুষের আশা, ভালোবাসা, আনুগত্য কমে যায়নি।  বিরোধী দল হিসেবে প্রত্যাশা অনুযায়ী ভূমিকা জাতীয় পার্টি কিছুটা রাখতে পেরেছে, কিছুটা পারেনি। সফলতা ব্যর্থতা দুটোই আছে। এটাই স্বাভাবিক। সামনের দিকে জাতীয় পার্টি যাতে সফল হতে পারে সেই লক্ষ্যে বেশি করে কাজ করব। আর সংসদ কার্যকর করা মানে খালি সংসদে দাঁড়িয়ে হাউকাউ করা নয়, সংসদ বয়কট করা নয়।

দেশ রূপান্তর : জাতীয় পার্টি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দল হিসেবেই পরিচিত। আগামীতেও এরশাদের লিগ্যাসি থেকে যাবে। ফলে প্রেসিডেন্ট এরশাদের যে সাফল্য-ব্যর্থতা আছে, সমালোচনা আছে সেসব নিয়েও কথা বলা প্রয়োজন। প্রেসিডেন্ট এরশাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান মনে করা হয় প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণকে, বিভাগ থেকে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনকে ছড়িয়ে দেওয়া। আপনার দৃষ্টিতে এরশাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা বলুন, যা হয়তো বেশি আলোচিত নয়। 
জি এম কাদের : কোনো অবদানের চেয়ে কোনো অবদান খাটো করে দেখার আছে আমি মনে করি না। তিনি রাষ্ট্র এবং সমাজের উন্নয়নে অনেক বিষয়ে কাজ করেছেন। তার অনেক কাজের যুগান্তকারী প্রতিক্রিয়া দেশে এখনো আছে। যদি খেলাধুলার কথা বলেন, দেখা যাবে বিকেএসপি তৈরি করে তিনি আজ সাকিবের মতো খেলোয়াড় তৈরির পথ করে গেছেন। শিল্পের বিকাশে তিনি অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প প্রথমে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তিনিই এস্টাবলিশ করে গেছেন। চামড়া শিল্পে এরশাদ সরকারের অবদান রয়েছে। চামড়া শিল্পের বিকাশের দিকে উনি কতগুলো ব্যতিক্রম সুবিধা দিয়েছেন। জাতীয় ওষুধ নীতি করে এরশাদ সাহেব বিদেশি ওষুধ দেশে আনা বন্ধ করেছেন, তার ফলে দেশে ওষুধ শিল্পের দারুণ বিকাশ ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক সংস্কারেও এরশাদ সাহেবের বিশেষ অবদান রয়েছে। উপজেলাকে গ্রোথ সেন্টার বানিয়ে জেলার অন্যান্য জায়গার সঙ্গে যোগাযোগে বিস্তার, বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থা এবং রাজধানীর যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন। জাতিসংঘে সেনা পাঠানোর ব্যবস্থা উনিই প্রথম শুরু করলেন। তখন এটা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে এটা দেশের জন্য শুধু উপার্জন নয়, সম্মানও বটে। মুক্তিযোদ্ধাদের যে ভাতা দেওয়া হয় এবং প্রতিটি জেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের অফিসের জন্য জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয় সেটা শুরু হয়েছিল এরশাদ শাসনামলে।

দেশ রূপান্তর : প্রেসিডেন্ট এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে যে রাজনীতির সূচনা করেছিলেন সেটাকে অনেকে বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতির উত্থানের পেছনে বড় কারণ বলে মনে করেন। ফলে মৌলবাদের উত্থানের পেছনেও এটাকে দায়ী করা হয়। আপনি কী মনে করেন?
জি এম কাদের : আমি কিছু বলতে চাই না। যারা এই কথা বলছেন তারা অনেকেই জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি। তাদের কাছে শুধু একটাই কথা বলব, এরশাদ সাহেব তো করে গেছেন, তারপরে কিন্তু সংবিধানের ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। সর্বশেষ সংবিধান সংশোধনীর জন্য নবম সংসদে একটা কমিটি করা হয়েছে সেখানে সব দলের লোক ছিলেন, তারা ব্যাপক আলোচনা করেছেন, চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।  মৌলিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস পরিবর্তন করা হয়েছে। সেগুলো সংসদে গৃহীতও হয়েছে। তারপরও যে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে সংবিধানে আবার পুনর্বহাল করেছেন সেটা কিন্তু করেছেন যারা এখন সমালোচনা করছেন তারাÑযারা সুযোগ পেয়েও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিল করেননি। যারা এটা বলেন, তাদের কাছে জানতে চাই, এই প্রশ্ন এখন তোলা দ্বৈতনীতি নয় কি? আপনারা পুনর্বহাল করলেন আবার এটার নিন্দা করেন কেন? ইজ ইট নট অ্যা কন্ট্রাডিকশন?

দেশ রূপান্তর : মুক্তিযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় গণ-আন্দোলনে, নব্বইয়ের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকার। এরপরও তিনি দীর্ঘ তিন দশক দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। এটা কীভাবে সম্ভব হলো বলে মনে করেন?
জি এম কাদের : এরশাদ সাহেব সবচেয়ে বড় গণ-আন্দোলনের মুখে বিদায় নিয়েছিলেন এ কথাটা সত্য নয়। সবচেয়ে বড় ‘গণঅভ্যুত্থান’- এসব কথা বানানো আমি মনে করি। ক্ষমতাচ্যুতির পরপর যখন তাকে জেলে দেওয়া হলো, তার দলকে রাজনীতি করতে না দেওয়া, তাকে নির্বাচন করতে না দেওয়ার একটি চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র কার্যকলাপ, যেটাই বলেন, চলছিল। কিন্তু তিনি জেলখানায় থেকেই ৫টি আসনে নির্বাচন করে জিতেছেন। পরপর দুই বার। এছাড়াও একানব্বইয়ের পরে প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে তিনি একাধিক আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। কাজেই তাকে জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে এটা যারা বলেন তারা গায়ের জোরে বলার জন্যই বলেন। উনি যদি জননন্দিত না হতেন, জনগণ তাকে ভালো নাই বাসত তাহলে উনি নির্বাচনেই বা কীভাবে জয়লাভ করেন জেলখানায় থেকে। আর মৃত্যুর পরই-বা জানাজায় কেন লাখ লাখ লোক তার জন্য চোখের জল ফেলছে?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত