আমরা কি তাহলে ধর্ষণের অভয়ারণ্যে বাস করছি!

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:০৩ পিএম

আজকাল ফেইসবুক খুললেই ধর্ষণ, খুন, ক্রসফায়ার এসব যেন নৈমিত্তিক ঘটনা। তাই আর এসব গায়ে মাখাতে ইচ্ছে করে না। তবে কষ্ট যে হয় না তো নয়! বুকের ভেতর জ্বলে যায়! ভয়ে কুঁকড়ে যাই! ছেলেটাকে নিয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। মনে হয় যেন এ দেশটা একটা ধর্ষণের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। যেখানে যার যা ক্ষমতা সে সেটা প্রদর্শন করতে ব্যস্ত।

রেপ হলো ক্ষমতা প্রদর্শনের একটা অস্ত্র। যেটা বহু বছর আগে থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যেমন রোহিঙ্গা নির্বাসনের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন। প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। আপনি যদি নারীদের (রোহিঙ্গা) সঙ্গে কথা বলেন, তাহলে বুঝবেন কী ভয়ানক ছিল তাদের ইজ্জতহানির ঘটনা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করার সুবাদে অনেক ঘটনার সাক্ষী হতে পেরেছি। কত যে চোখের জল নীরবে ঝরেছে তা বলতে পারব না। আজও কাহিনিগুলো মনে হলে বুকের ভেতর ভয়ে কাঁপতে থাকে।

এই তো সেদিন এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তার একমাত্র মেয়ে, ভালোবেসে ‘এঞ্জেল’ বলে ডাকেন। শিশুটির বয়স ছয়-সাত বছর। বাবা হিসেবে এখনই তিনি এতটা ভীত যে বলছিলেন, আমি একজন চাকরিজীবী বাবা। আমার মেয়েকে যখন স্কুলে দেব কে নিয়ে যাবে স্কুলে,কে নিয়ে আসবে স্কুল থেকে? বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে দেব কোনো ভরসায় দেব? আপনি কি বুঝতে পারেন মাননীয় রাষ্ট্র একজন বাবা-মা কতটা শঙ্কিত থাকে তার সন্তানদের  নিয়ে।

সেদিন শিশু ফোরামের কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে দলীয় আলোচনা করছিলাম। সবারই এক কথা বাবা-মা আমাদের বিশ্বাস কর‍তে পারে না। কারণ হলো স্কুল, প্রাইভেট কিংবা বিকেলে ঘুরতে বের হলে পাঁচ মিনিটের জায়গায় ১০ মিনিট হলেই নানা প্রশ্ন, নানা চিন্তায় তারা অস্থির হয়ে থাকেন। সত্যি বলছি, আমাদের ভালো লাগে না। বাবা-মা সন্তানদের নিরাপত্তায় উদ্বিগ্ন। সন্ধ্যা হয়ে আসলেই বাবা-মা শুধু সেই ক্ষণটা জপতে থাকে যে, মেয়েটা ফিরবে কখন। ঠিকঠাক ফিরতে পারবে তো। এ দেশের সবচেয়ে উদ্বিগ্ন, আশঙ্কিত মানুষটা হলো কন্যা সন্তানের বাবা।

আমার নিজ বাড়ির থানার পাশেই নাকি একজন মেয়েকে ধর্ষণ করে টুকরো টুকরো করে বস্তাবন্দী করে পুকুরের ধারে ফেলে গিয়েছে। আমার মা ফোন দিয়ে সে কী কান্না। আমি যেন ভালো হয়ে চলি। সন্ধ্যার পর বাইরে বের না হই- ইত্যাদি ইত্যাদি। যদিও মাঝে মাঝে রাগ হয়। কিন্তু আবার ভাবি বাবা-মায়ের চিন্তা কিন্তু অমূলক নয়। মা হিসেবে আমি যেমন সারাক্ষণ ভাবি ছেলেটা কী করছে, কোনো বিপদে পড়ছে কি না!

৩১ বছর বয়স আমার। অফিস থেকে ফিরতে অনেক সময় রাত হয়ে যায়। সত্যি বলছি, আর সাহস পাই না একা একা অন্ধকার পথে ১০-১৫ মিনিট হেঁটে ঘরে ফিরব। সন্ধ্যা হয়ে গেলে সিএনজিতে উঠতে সাহস পাই না। দশবার ভাবি, আচ্ছা একা উঠব, ঠিক হবে তো। আর একটু ক্ষণ না হয় অপেক্ষা করি, আরো কিছু লোক আসুক। এই হলো আমার নিরাপত্তা বোধ।

শুধু শহর নয় নিজের গ্রামেও একজন মেয়ে নিরাপদে ঘুরতে পারে না। রাতে বাড়ি লাগোয়া টয়লেটে যেতে পারে না একা। যদি কেউ ঘাপটি মেরে থাকে! স্কুলের পথে ইভটিজিং তো সাধারণ বিষয়। মেয়েদের নিজেদের পোশাকের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হলে বের হতে সাহস পায় না। তার পছন্দের পোশাক, ভালো লাগা তত দিনে জাদুঘরে চলে যায়।

একটা মেয়ে খোদ রাজধানীর রাস্তায় একটা বাইক চালানোর সাহস পায় না। চালানোর সাহস তো দূরের কথা। উবার কিংবা পাঠাও যদি আপনি নারী হিসেবে ব্যবহার করেন তাহলে তো বাঁকা চোখের অভাব থাকবে না। কত কটু কথা যে আপনাকে শুনতে হবে তার ইয়ত্তা নাই। সাইকেল চালানোর তো প্রশ্নই নাই। ফুটপাত ধরে হাঁটতে পারে না, গাউছিয়ায়/ ফার্মগেটের ভিড়ে যেন শুধু মেয়েটার গায়ে হাত দেওয়ার জন্য।

মানবাধিকার সংস্থা এবং আইন ও সালিস কেন্দ্রের মতে, ২০১৯ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৪১৩ নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে। আত্মহত্যায় বাধ্য করা হয়েছে ১০ নারীকে। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২ জন যা ২০১৯ এ এসে বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। অথচ একটা ঘটনার বিচার হয় নাই। আজ অবধি একটারও না! এ রকম বিচারহীনতা কোনো দেশে দেখা যায় কি না আমার জানা নাই।

একজন ধর্ষক বা একদল ধর্ষক জানে যে দেশে আইন-কানুন আছে। সেই সঙ্গে এটাও জানে ধর্ষণের ফলে কঠিন শাস্তি পেতে হতে পারে। এসব জানার পরেও একজন বা একদল মানুষ ধর্ষণের মতো ঘৃণিত অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে কেন?  

কারণ হলো, ধর্ষক বুঝে গেছে রাষ্ট্র বা আইন যথোপযুক্ত ও দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে পারবে না। ধর্ষকের ওপর দলীয়, রাজনৈতিক ও সরকারি হস্তক্ষেপ বিদ্যমান। শাস্তি হবে না কিংবা যে কোনো উপায়ে ছাড়া পাওয়া সম্ভব হবে এই ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত থাকা। ধর্ষণকে পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রকাশের চূড়ান্ত হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করা। ধর্ষকের নয়, ভিক্টিমের ‘ইজ্জত’ বা ‘সম্ভ্রম’ নষ্ট হয়- এই চেতনা প্রতিষ্ঠিত থাকা।

আর আপনারা বলেন, আমরা মধ্যবিত্ত দেশ? উন্নয়নে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ? একটা দেশের গ্রাম, পাহাড়, নদী, শহর, খোদ রাজধানীতে একজন নারী তার স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না, তার পছন্দের পোশাক পরতে পারে না, তার নিরাপত্তা নাই, বাসে ওঠার আগে দেখতে হয় কয়জন যাত্রী আছে, সন্ধ্যার হিসাব মিলিয়ে পথ চলতে হয়, বাহন ঠিক করতে হয় রাতের হিসাব করে - সেই দেশ উন্নত? সেই দেশই কি শিক্ষিত, সভ্য, সোনার বাংলা!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত