কমিকস চরিত্র হাঁদা-ভোঁদা, বাঁটুল দি গ্রেট, নন্টে-ফন্টের স্রষ্টা নারায়ণ দেবনাথ আর নেই। ৯৭ বছর বয়সে মঙ্গলবার সকালে মারা গেছেন তিনি।
গত ২৪ ডিসেম্বর বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার জেরে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় প্রবীণ লেখক-চিত্রশিল্পীকে। এরপর ২৫ দিন হাসপাতালবাসের পর মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গ স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ১০টা নাগাদ সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
হিন্দুস্তান টাইমস জানায়, শনিবার রাত থেকেই ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল নারায়ণকে। বর্ষীয়ান শিল্পীর চিকিৎসায় পাশে ছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। তার চিকিৎসার জন্য মাল্টিডিসিপ্লিনারি মেডিকেল বোর্ডও গঠন করা হয়েছিল।
নারায়ণ দেবনাথ নানা ধরনের বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। এর আগেও একাধিকবার চিকিৎসার জন্য তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
এ কার্টুনিস্টের জন্ম ১৯২৫ সালে হাওড়া শিবপুরে। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে দেড় হাজারেরও বেশি সিরিয়াস ও মজার কমিকস সৃষ্টি করেছিলেন তিনি।
১৯৬৫ সালে ‘শুকতারা’ পত্রিকায় আত্মপ্রকাশ করে তার সুপারহিরো চরিত্র বাঁটুল। তারপর একে একে তার সৃষ্টি করা কমিকস চরিত্রগুলো নজর কাড়তে থাকে।
গোলাপি রঙের স্যান্ডো গেঞ্জি পরা, সঙ্গে কালো রঙের হাফপ্যান্ট। খালি পা। আত্মপ্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই জনপ্রিয়তা না পেলেও তার বাঁটুলের উত্তরণ বিস্ময়কর। বুড়ি পিসি, পাড়ার দুই মিচকে মাস্তান ভজা-গজা, শাকরেদ লম্বকর্ণ, পোষা উটপাখি উটো, পোষা বুলডগ ভেদো নিয়ে বাঁটুল এখন বাংলা কমিকসের ইতিহাসে অন্যতম নাম।
১৯৬৯ সালে ‘কিশোর ভারতী’ পত্রিকায় আত্মপ্রকাশ করে নন্টে-ফন্টে। তখন অন্যদিকে আবার রমরমিয়ে চলছে হাঁদা-ভোঁদা। তবে তাতে কিছু যায় আসেনি নন্টে-ফন্টের। প্রথম প্রথম এই দুই কিশোর ছিল মন ভালো করা দুই ফচকে, যারা প্রায়ই একে অন্যের পেছনে লাগে, মজা করে। কিন্তু হৃদয়টা বিশাল, যে কানো বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরপরে যোগ হলো তাদের হোস্টেল জীবন। এলো সিনিয়র কেল্টুদা, সুপারিন্টেন্ডেন্ট স্যার পাতিরাম হাতি এবং রান্নাঘরের দেহাতি পাচক ঠাকুর। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি এই দুই বিচ্ছুকে। পঞ্চাশ পেরিয়ে তারা আজও একই রয়েছে।
নারায়ণ দেবনাথের সৃষ্ট কার্টুন চরিত্রদের মধ্যে সব থেকে সিনিয়র হাঁদা-ভোদা। ২০১২ সালেই হাঁদা-ভোঁদা ৫০ বছর পার করেছে। হাঁদা-ভোদা আত্মপ্রকাশ করেছিল ১৯৬২ সালে। প্রয়াত শিল্পীর পুত্র তাপস দেবনাথ জানিয়েছিলেন, শিবপুরের ছোট, ছোট দুষ্টু ছেলেদের সঙ্গে ভারী ভাব ছিল নারায়ণ দেবনাথের। তাদের সেই সব নানা মজাদার কাণ্ডকারখানার সঙ্গেই সামান্য রং চড়িয়ে ও মিশিয়ে দু’পাতার মধ্যে নিয়ে আসতেন শিল্পী। আসলে আমাদের সকলের শৈশব জীবন জুড়ে থাকা দস্যিপনাগুলোই পরম যত্নে তাঁদের সৃষ্টির কীর্তির মধ্যে তুলে ধরতেন নারায়ণ দেবনাথ।
কমিকস শিল্পী হিসেবে বহুল জনপ্রিয়তা পাওয়ার বহু আগে থেকেই তিনি ছিলেন অলংকরণশিল্পী। নিজের সমকালীন প্রায় সমস্ত দিকপাল সাহিত্যিকের লেখার অলংকরণ করেছিলেন। স্বপন কুমার হোক কিংবা ঠাকুমার ঝুলি, বিভিন্ন ধরনের বইয়ে তার আঁকা প্রচ্ছদ কলকাতার প্রকাশনার ক্ষেত্রে এক দুর্লভ সম্পদ। নব্বই পেরিয়ে বয়স ও অসুস্থতার কারণে ছবি আঁকার সময়ে তার হাত কিছুটা কাঁপত ঠিকই, তবু একটি দিনের জন্যও কার্টুনের রেখায় ভুল হয়নি ‘বাঁটুল দি গ্রেট’, ‘হাঁদা ভোঁদা’, ‘নন্টে ফন্টে’-এর সৃষ্টিকর্তার।
‘এই বয়সেও অসুস্থ শরীরে কেন টানা এঁকে যাচ্ছেন?’ প্রশ্নের জবাবে নারায়ণ দেবনাথ একবার বলেছিলেন, ‘ছোটদের খুব ভালোবাসি, তাই। তাদের জন্য তুলি-কলম ছাড়তে পারিনি।’
তার হাত থেকে পাঠকেরা আরও পেয়েছে বাহাদুর বেড়াল, ডানপিটে খাঁদু আর তার কেমিক্যাল দাদু, শুঁটকি মুটকি, পটলা দ্য ম্যাজিশিয়ানের মতো মনমাতানো সব কমিকস।
নারায়ণ দেবনাথ আজীবন অজস্র সম্মাননা পেয়েছেন। ২০১৩ সালে সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার এবং বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার পান। আর ২০২১ সালে পান পদ্মশ্রী, সেই সম্মান গত সপ্তাহে হাসপাতালের বেডে তার হাতে তুলে দেওয়া হয়।
