রিভিউ

প্রেম ও অপ্রেমের অনুপম আখ্যান ‘প্রত্যাবর্তন’

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:৪৭ পিএম

কবি ও কথাসাহিত্যিক নওশাদ জামিলের  ‘প্রত্যাবর্তন’ এক কথায় প্রেমের উপন্যাস। হৃদয় বিদীর্ণ করা রোমান্টিক উপন্যাস।

সত্যি কথা গোটা উপন্যাসটিতে একটা ভাষার মিষ্টতা আছে, গল্পের রহস্যঘন আকর্ষণও আছে। এই মিষ্টতার কারণেই উপন্যাসটি এক বসায় পড়ে ফেলা যায়। কোন রকম ছেদ না টেনে একেবারে শেষ পৃষ্ঠায় পৌঁছানো যায়। অনেকটা জোয়ারের মতো যেন, যেখানে থাকুক না কেন সে তাকে তীরে আছড়ে ফেলবেই। এই গতিশীলতার জন্য, পাঠককে ধরে রাখার মুনশিয়ানার জন্য, সুন্দর গল্পের জন্য উপন্যাসটি সব শ্রেণির কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে আশা করি।

উত্তম পুরুষে লেখা উপন্যাস ‘প্রত্যাবর্তন’। উপন্যাসের কথক ও নায়ক রাহাত। তার মুখ থেকে বর্ণিত হয়েছে কাহিনি। উপন্যাসের শুরুটা হয়েছে চমৎকার। রাহাত কনে দেখতে গিয়েছে, প্রাথমিক দেখা সাক্ষাতের পরে হবু বর ও কনেকে ছাদে পাঠানো হয়েছে; যেন নিভৃতে কিছুক্ষণ আলাপ করতে পারে। কনের নাম বীথি। বোঝা যায় রাহাত প্রথম দেখায় পছন্দ করে বীথিকে। এ জন্য সে সচেতনভাবে চেয়েছে বীথিকে ইমপ্রেস করতে। প্রথম দিনেই রাহাত তার আগের সম্পর্কের কথা বীথিকে জানিয়েছে। তাদের ব্রেকআপ হয়েছে তিন বছর, সেটাও বলে। বিপরীতে বীথির কোন পূর্ব বা বর্তমান সম্পর্কের জটিলতা নেই তাও জেনে নেয়। তারপর রাহাত-বীথির বিয়ে হয় পারিবারিকভাবে। তারা ঢাকায় বাসা নেয়।

“প্রত্যাবর্তন। নওশাদ জামিল। প্রকাশক: নালন্দা। প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত। ১৬৮ পৃষ্ঠা। ২২৫ টাকা”

রাহাতের পেশা সরকারি কলেজে শিক্ষকতা আর বীথি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাদের সংসার শুরু হয়। কিছুদিন পর হানিমুন এবং স্বভাবতই সমুদ্রে। সেখানে গিয়ে রাহাতের ছেড়ে যাওয়া সম্পর্ক হুমায়রার সঙ্গে আকস্মিকভাবে দেখা হয়। হুমায়রার সঙ্গে দেখা হয় হোটেলে, যেখানে তারা একসময় সুন্দর সময় কাটিয়েছিল। সেই একই হোটেলে রাহাত-বীথি এবং হুমায়রা তার মাকে নিয়ে উঠেছে। বীথি যেহেতু আগেই হুমায়রার কথা জানত, সে জন্য তাদের পরিচয় করিয়ে দেয় রাহাত।

হুমায়রা ও রাহাত একই কলেজে শিক্ষকতা করত।  দুজন শিক্ষক একপর্যায়ে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। তাদের সম্পর্ক একটা সুন্দর পরিণতি হতে পারত, অর্থাৎ তাদের সম্পর্ক কেন আলোর মুখ দেখেনি আমরা তা জানি না। এই না জানাটাই উপন্যাসকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। উপন্যাসের কথক রাহাত, সে তার অবস্থান থেকে নানা যুক্তি আমাদের সামনে হাজির করে। তাদের সম্পর্কের একটা পর্যায়ে হুমায়রা নিজের ভেতরে অন্য একটি অস্তিত্ব টের পায়। এটা রাহাতকে জানানোর পর রাহাত পিছু হটে। সন্তানসম্ভবা হুময়ারা একই সঙ্গে দ্রুত রাহাতকে বিয়ে করতে চায়, সন্তানও রাখতে চায়। এ অবস্থায় তারা সন্তান রাখবে কি না, বিয়ে করবে কি না, কিছু জটিলতায় ভেঙে যায় সম্পর্ক।

মূলত এখান থেকেই উপন্যাস শুরু। সম্পর্ক, ব্রেকআপ, ঘুরে দাঁড়ানো, সংসার ও নানা টানাপোড়েন ও ভালোবাসার গল্প শুরু। হানিমুনে গিয়ে হুমায়রাকে দেখার পর থেকে রাহাত আবারও স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে। স্মৃতিতে আওড়াতে থাকে পুরো এক বছরের সম্পর্কের নানা দিক। একসঙ্গে চাকরি সূত্রে তাদের মেলামেশা, সময় কাটানোর নানা স্মৃতি রাহাত আমাদের বলতে থাকে। আমরা মানে পাঠকেরা আবারও একটি প্রণয়ের জটিলতায় পড়ে যাই। রাহাত কাকে ভালোবাসে? যদি হুমায়রাকে সে এত করে চায় তাহলে মাঝখানে বীথিকে জড়ালো কেন?

রাহাত আবার পূর্বের প্রেমের প্রতি প্রসন্ন হয়। নানা কথা সে আমাদের বলতে চেষ্টা করে। হুমায়রা চলে যাবার পরে কীভাবে নিজেকে সামলে আবার চেনা পৃথিবীতে ফিরে এসেছিল, সেই কাহিনি শোনায়। এটা খুবই আকর্ষণীয় এবং সম্ভবত বর্তমান তরুণদের জন্য অনুসরণীয়ও বটে। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া এবং তারপর রাহাত ও হুমায়রার দুজনেরই ঘুরে দাঁড়ানোর পর্বটা তরুণেরা জানতে পারবে নানা কিছু। শেষপর্যন্ত জীবনই যে সত্য, জীবনই যে গুরুত্বপূর্ণ, পাঠকের সামনে তা তুলে ধরা হয়।

আমার কাছে মনে হয় হুমায়রা এই উপন্যাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও আলোকিত চরিত্র। তার দৃঢ়তা, সিদ্ধান্ত নেবার সক্ষমতা, বাবা-মার প্রতি দায়িত্ব পালন এবং শেষপর্যন্ত বীথিকে শ্রদ্ধা করা সবটা থেকেই আমরাও তার পক্ষে দাঁড়াই। তার জন্য আমাদের প্রাণ ব্যাকুল হয়। গোটা উপন্যাস পড়ার পর মন ব্যথিত হয়।

উপন্যাসের নাম ‘প্রত্যাবর্তন’ কেন? এ উত্তর ঔপন্যাসিকের জন্য বরাদ্দ থাকল। তবে শেষত রাহাত ফিরল বাস্তবতার কাছে, এ জন্য হয়তো নামকরণ। রাহাত শেষ পর্যন্ত জীবনের দাবিকেই মেনে নেয়। দুটো মানুষকে একসঙ্গে ভালোবাসা যায় কিনা ঔপন্যাসিক পাঠককে এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সামনে হাজির করে। আমরা প্রত্যেকেই নিজেদের প্রশ্ন করতে থাকি-সত্য কোনটা বা একসঙ্গে দুটো সত্য আসলে সম্ভব কিনা? এই দ্বন্দ্ব পাঠককে আক্রান্ত করবে। আমাকেও করেছে ভীষণভাবে। একজন মানুষ কি দুজনকে ভালোবাসতে পারে? হয়তো পারে, হয়তো পারে না। নচিকেতার সেই গানের মতো, হৃদয় বড় যার সেই তো ভালোবাসে বহুবার। এখানে বহুবার ভালোবাসার কথা বলা হয়নি, বলা হয়েছে একই সময়ে দুজন মানুষকে ভালোবাসতে পারার কথা। আবার বলা হয়েছে একই সময় দুটো প্রেম সত্য হতে পারে না। এই উপন্যাস পড়ে আমার কেবলই মনে হয়েছে জগতে অধিকাংশ পুরুষই কি এই সমস্যায় ঘুরপাক খায়? শুধু পুরুষ নয়, নারীরাও কি তাতে ঘুরপাক খায়? সম্পর্কের মধ্যে যে জটিলতা, যে রহস্য, যে সূক্ষ্মতা—সেদিকই লেখকের মনোযোগ ছিল বেশি। এই বিষয়টিকেই তিনি তার উপন্যাসে আকর্ষণীয়ভাবে বিষয় করেছেন। মেলে ধরেছেন সম্পর্কের আনন্দ-ব্যথার অনুপম আখ্যান।

নওশাদ জামিলকে অভিনন্দন, এত সতেজ-সরস ভাষায় তিনি চিরায়ত একটি কাহিনিকে নূতন অবয়বে উপস্থাপন করেছেন। জীবন ও বাস্তবতার অনবদ্য আখ্যান তুলে ধরেছেন। কোথাও কোথাও তার ভাষা কাব্যিক, সমুদ্র এবং চাঁদের উপমা যা আমাদের কবি নওশাদের কথা মনে করিয়ে দেয়। সুন্দর সাবলীল উপস্থাপনায় এই উপন্যাস নওশাদের সবে শুরু আমরা বলতে চাই। দিকে দিকে তিনি আরও নানা আঙ্গিকের চমকপ্রদ উপন্যাস পাঠকদের উপহার দেবেন— এটাই প্রত্যাশা।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত