২০১২ সালের ১৮ জুলাই সাভারের আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় ধর্ষণের শিকার হয় ১৬ বছরের এক কিশোরী। পিতৃহীন এ কিশোরী মায়ের অভাব ঘোচাতে চাকরি করত স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায়। ধর্ষণের ঘটনায় স্থানীয় থানায় মামলা হয়। চিকিৎসা সনদেও ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয় ওই বছরের ১৫ নভেম্বর। সাক্ষী করা হয় আটজনকে। ২০১৩ সালের ১০ মার্চ অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ৯ বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও একজন সাক্ষীও সাক্ষ্য দেননি। এমনকি ভুক্তভোগী কিংবা বাদী (কিশোরীর মা) আদালতে যাননি।
মামলার নথি অনুযায়ী, আসামি একই এলাকার শামসুল আলম (৪০)। সে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ বলে অভিযোগ রয়েছে; জামিন নিয়ে পালিয়ে আছে। মামলাটি এখন চলছে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ৯-এ। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ভাষ্য, সাক্ষীরা আদালতে আসেন না। সমন পাঠিয়েও তাদের আনা যাচ্ছে না, খোঁজ মিলছে না।
উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হত্যা, ধর্ষণ এবং মাদকদ্রব্যবিষয়ক গুরুতর অপরাধের মামলা। নিষ্পত্তি হচ্ছে কম। এর বড় কারণ সাক্ষীর গরহাজিরা। আইনজ্ঞরা বলেন, ফৌজদারি মামলায় আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণের প্রধান নিয়ামক হচ্ছেন সাক্ষী। আদালতে তাদের নির্ধারিত তারিখে হাজির করার দায়িত্ব পুলিশের। প্রসিকিউশনের সাহায্যে পুলিশ সাক্ষীদের হাজির করাবে। কিন্তু আইনজীবীরা প্রায়ই বলেন, সাক্ষী হারিয়ে গেছে বা তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে মামলা মুলতবি হয়। তারিখের পর তারিখ সাক্ষীকে সমন ও পরোয়ানা পাঠানো হলেও নির্ধারিত ঠিকানায় তাদের পাওয়া যায় না। এর ফলে বিচারে দীর্ঘসূত্রতা বাড়ে, মামলাজট সৃষ্টি হয়। বিচারবঞ্চিত হয় ভুক্তভোগী এবং আসামিও। আদালতে সাক্ষী না আসা বা তাদের খুঁজে না পাওয়ার বিষয়ে আইনজ্ঞরা অনেক কারণ চিহ্নিত করেছেন। তারা বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের আসামিরা হন প্রভাবশালী এবং রাজনৈতিক-মদদপুষ্ট, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ ও প্রসিকিউশন উদাসীন থাকে, আদালত ও এর পরিবেশ নিয়ে সাক্ষীদের মধ্যে অস্বস্তি থাকে এবং নিরাপত্তা নিয়ে বাদী-বিবাদী উভয়পক্ষে শঙ্কা কাজ করে।
বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণ সম্পর্কে আইনজ্ঞরা বলেন, বিশেষজ্ঞ বা সরকারি সাক্ষীদের (চিকিৎসক, পুলিশ কর্মকর্তা) কর্মস্থল পরিবর্তনের (বদলি) কারণে নির্ধারিত ঠিকানায় না পাওয়া ও আদালতের কিছু অসাধু কর্মচারীর অসৎপন্থা অবলম্বনের কারণে আদালত সাক্ষীর সংকটে পড়ে। এসব কারণে মামলা ঝুলে যায়।
ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের বিচার দীর্ঘদিন ধরে সাক্ষীর গরহাজিরায় নিষ্পত্তি হচ্ছে না, এমন বেশ কিছু মামলা পর্যালোচনা করেছে দেশ রূপান্তর। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, ধর্ষণের কোনো মামলা আদালতে গড়ালে সেটি নিষ্পত্তি হতে সময় লাগে কমপক্ষে ৫ থেকে ১২ বছর। যদিও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু এ বিধান নির্দেশনামূলক, বাধ্যতামূলক নয়। ধর্ষণের মামলায় ভুক্তভোগী, ফরেনসিক পরীক্ষার চিকিৎসক ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ সাক্ষী থাকেন সচরাচর ৫ থেকে ১০ জন। সাধারণত ভুক্তভোগীর সাক্ষ্যের পর অন্যদের সাক্ষ্য নিতে বেগ পেতে হয়।
হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের মামলায় অভিযোগ গঠনের পর এক যুগেও কোনো সাক্ষী হাজির না হওয়ার নজির আছে। প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লিখিত মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মো. শহিদ হোসেন ঢালী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমন জারিসহ আইনি সব প্রক্রিয়া মানা হলেও কেউ সাক্ষ্য দিতে আসেননি। আসামি স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি, হয়তো তার ভয়ে ভুক্তভোগী ও বাদী আদালতে আসেন না; হয়তো ঝামেলার ভয়ে অন্য এলাকায় তারা চলে গেছে। কিংবা সমন প্রক্রিয়াটি পুলিশ যথাযথভাবে কার্যকর করেনি।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাক্ষী কেন হারিয়ে যাবে? এটি খুবই অনাকাক্সিক্ষত। সাক্ষীকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব পুলিশ ও প্রসিকিউশনের। তাদের হাজির না করার যৌক্তিক কারণ থাকতে হবে। সাক্ষী তো দেশ থেকে চলে যায়নি। সাক্ষী না এলে অ্যাডমিনেস্ট্রেটিভ জাস্টিস প্রতিষ্ঠিত হবে না। বিচারপ্রার্থীর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করা হবে না।’ তিনি বলেন, ‘ঠিকানায় কেউ বসে থাকে না। কীভাবে খুঁজে বের করতে হবে, ঠিকানা পরিবর্তন হলে কী করতে হবে তার বিষয়ে নিশ্চয়ই সমাধান আছে। এভাবে চলতে পারে না। যে সাক্ষী আদালতে আসবে তার নিরাপত্তা পাওয়া মৌলিক অধিকার। যদি তা না হয় তাহলে সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে নিরুৎসাহিত হবে, এটাই স্বাভাবিক।’
যে প্রক্রিয়ায় আদালতে আসেন সাক্ষী : ফৌজদারি মামলায় অভিযোগের তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দেয় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭১ (২) (১) উপধারা অনুযায়ী, মামলার ফরিয়াদি (বাদী) বা সাক্ষী মামলার শুনানিকালে যাতে আদালতে হাজির হয় তা নিশ্চিত করা পুলিশ কর্মকর্তার (তদন্তকারী কর্মকর্তা) দায়িত্ব। তদন্তকারী কর্মকর্তা নিজেও একজন সাক্ষী। অভিযোগ গঠনের পর বিচার শুরু হলে সাক্ষীদের কাছে তারিখ উল্লেখ করে সমন পাঠানো হয় আদালত থেকে। ধার্য তারিখে সাক্ষী হাজির না হলে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পরোয়ানা জারি হয়। এরপরও সাক্ষী গরহাজির থাকলে জামিন অযোগ্য পরোয়ানা জারি হয়।
হত্যা, ধর্ষণ ও মাদকদ্রব্যবিষয়ক মামলা পরিচালনা করেন রাষ্ট্রপক্ষের এমন একাধিক আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো সাক্ষী আদালতে প্রথমবার সাক্ষী দিতে এসে ফিরে গেলে তাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সমন জারি হলেও আদালতের কিছু অসৎ কর্মচারী ও পুলিশ সমনের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করেন না। সমন জারির পর অনেক সময় তামিল-প্রতিবেদনও উপস্থাপন করা হয় না। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা পরিচালনা করেন রাষ্ট্রপক্ষের এমন একজন কৌঁসুলি নাম না প্রকাশের শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালত বা প্রসিকিউশন সাক্ষী হাজির করার বিষয়ে সাধারণত তৎপর থাকে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাক্ষীদের হাজির করার চেয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আসামিদের হাজির করার বিষয়ে পুলিশের আগ্রহ বেশি থাকে। আমরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাদী ও সাক্ষীদের টেলিফোন করলেও কাজ হয় না। সাক্ষীদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণও করা যায় না। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের কী করার আছে?’
২০০৩ সালের ২ মে বগুড়ার মোকামতলা এলাকায় শাপলা খাতুন (১৭ বছর) নামে এক কিশোরীর গায়ে এসিড ও পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় তার স্বামী লেবু মিয়া। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ মে মারা যায় কিশোরী। ২০০২ সালের আগস্টে অপহরণের মামলায় কয়েক মাস জেল খাটার পর জামিনে বেরিয়ে কিশোরীকে বিয়ে করে লেবু। কিশোরীর ডাইং ডিক্লেরেশনে (মৃত্যুকালীন ঘোষণা) লেবু ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের নাম উঠে আসে। ঘটনার প্রায় সাত বছর পর ২০১০ সালের ২৯ জুন এ মামলায় আটজনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগ গঠন করে ওই বছরের ২৫ অক্টোবর সাক্ষ্যগ্রহণের আদেশ দেওয়া হয়। সাক্ষী করা হয় সাতজনকে। এখন মামলাটি বিচারের জন্য রয়েছে বগুড়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। জানা গেছে, অভিযোগ গঠনের এক যুগ পরও কোনো সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি। ১৯ বছর ধরে মেয়ে হত্যার বিচার চাইছেন মা ফিরোজা বেগম। এ মামলা নিষ্পত্তি করতে ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা দিচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘মূল আসামি লেবু ও তোতা শুরু থেকেই পলাতক। অন্যরাও জামিনে। প্রধান আসামির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। মিথ্যা অভিযোগের মামলা দিয়ে তারা অন্যদের হয়রানি করে।’ তিনি বলেন, ‘আইনের দৃষ্টিতে আসামি পলাতক থেকেও বাদী ও ভুক্তভোগীদের নানাভাবে হয়রানি করছে এবং হুমকি দিচ্ছে। ফলে কেউ সাক্ষ্য দিতে আসেন না।’
২০০৬ সালের জানুয়ারিতে রাজধানীর কাফরুল থানায় ফেনসিডিল উদ্ধারের ঘটনায় মাদকের একটি মামলা চলমান রয়েছে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ১-এ। নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ওই বছরের ১০ জুন আসামি ফিরোজ ব্যাপারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর বিচার শুরুর আদেশ হয়। সাক্ষী করা হয় সাতজনকে। নথি বলছে, অভিযোগ গঠনের প্রায় ১১ বছর পর ২০১৭ সালের ১৫ মে পুলিশের একজন কনস্টেবল সাক্ষ্য দেন। গত পাঁচ বছরে তারিখের পর তারিখ পড়লেও আর কোনো সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি। ১৬ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি মামলাটি। ইতিমধ্যে আসামি ফিরোজ জামিন নিয়ে পলাতক। তার আইনজীবী আবুল হাসনাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ বলে তারা সাক্ষী খুঁজে পান না। বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় বিরক্ত হয়ে আসামিও জামিন নিয়ে পালিয়ে আছে।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালত কেন সাক্ষী পায় না? সাক্ষী হাজির করার দায়িত্ব কার? ধর্ষণের মামলায় ফরেনসিক প্রতিবেদন বা ভুক্তভোগীর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। কিন্তু আদালত পর্যন্ত আসতে তাকে নিরাপত্তা দিতে হবে। হত্যা মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে কেন? সাক্ষীর বা আসামির নিরাপত্তা কে দেবে? পুলিশকে এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। তবেই না সাক্ষী আসবে।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন সাময়িকী ঢাকা ল রিপোর্টস-এর (ডিএলআর) সম্পাদক অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাক্ষী না আসার অন্যতম কারণ মামলার বিচারে বিলম্ব হওয়া। এতে সাক্ষীরা হতাশায় ভোগেন। ভরসা কমে যায়। অনেক সময় সাক্ষীর স্থান পরিবর্তন হয়। অনেকে মারা যান। ফলে পরিস্থিতির উন্নতি আর হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘ফৌজদারি মামলায় দ্রুত তদন্ত শেষে বিচার তাড়াতাড়ি নিষ্পত্তি হলে এ সমস্যা হতো না। সাক্ষী কেন হারিয়ে যায়, কেন আদালতে আসতে চায় না সে বিষয়ে তদারকি ও করণীয় নির্ধারণে একটি সেল থাকা উচিত।’