অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম জ্বালানি বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা। ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষা সম্পর্কিত বিষয়ে তিনি কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে। সম্প্রতি জাতীয় গ্রিড বিপর্যয় এবং জ্বালানি সংকটে দেশব্যাপী লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের আহমেদ মুনীরুদ্দিন
দেশ রূপান্তর : বিদ্যুৎ সরবরাহের জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের কারণে ৪ অক্টোবর, ২০২২ চার থেকে আট ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎবিহীন ছিল বৃহত্তর ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লাসহ দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ। এতে প্রায় দেশের ৩২ জেলা বিদ্যুৎহীন ছিল। এমন বিপর্যয় কেন হলো বলে মনে করছেন?
এম শামসুল আলম : আমাদের জাতীয় গ্রিড বরাবরই বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে আছে। ২০১৪ সালে এটা বড় আকারে দেখা গিয়েছিল। সিস্টেমের ফ্রিকোয়েন্সির ভারসাম্য ধরে রাখতে না পারলে এমন বিপর্যয় হওয়া স্বাভাবিক। সেটা বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন কিংবা বিতরণ যেকোনো দিকের সমস্যার কারণেই ঘটতে পারে। ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত যতবারই এমন সমস্যা দেখা গেছে, বলা যেতে পারে সবগুলোই ফ্রিকোয়েন্সি আনস্ট্যাবিলিটির কারণে ঘটেছে।
জাতীয় গ্রিডের এই ফ্রিকোয়েন্সির ভারসাম্য ধরে রাখার জন্য যে ধরনের যন্ত্রপাতি দরকার সেটা আমাদের আছে। কিন্তু সেটা কার্যকর রাখার জন্য উৎপাদন ও বিতরণ এই উভয় দিকেই যে গ্রিড কমপ্লায়েন্স দরকার সেখানেই ঘাটতি আছে। যারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সঞ্চালন লাইনে সরবরাহ করবে তাদের জেনারেটরগুলো গ্রিডের উপযোগী হতে হবে। আবার বিতরণের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ যখন বিতরণ লাইনের মাধ্যমে ভোক্তাদের কাছে যায়, তখন যেন সেই পাওয়ারটা যাতে রেটেড পাওয়ারের চেয়ে বেশি বা ওভার লোডেড না হয়ে যায় সেটাও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এটাই মোটা দাগে গ্রিড কমপ্লায়েন্স তথা ফ্রিকোয়েন্সি ভারসাম্য রক্ষা করার মৌলিক ব্যাপার। কিন্তু কখনোই যথাযথভাবে তা করা সম্ভব হয় না। ফলে জাতীয় গ্রিড সবসময়ই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণাদিতে এমন আলামতই পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের কোনো একটি লাইন ওভারলোড হওয়ার কারণেই এই গ্রিড বিপর্যয় ঘটে। বিদ্যুৎ সচিবও এমনই একটা ধারণা দিয়েছেন। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাও এমন কথাই বলছেন।
দেশ রূপান্তর : জাতীয় গ্রিডের বিপর্যয়কে দেশের বিদ্যুৎ খাতের বৃহত্তর পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের মধ্যে কারিগরি সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কোন সমস্যাগুলো প্রধানত দায়ী?
এম শামসুল আলম : গ্রিড কোড বলে একটা বিষয় আছে। গ্রিড কোডে যেসব নির্দেশনা আছে সেসব মেনেই গ্রিড ব্যবহার করতে হবে। সেটা সাপ্লাই ও ডিস্ট্রিবিউশন দুই ক্ষেত্রেই। এখন সাপ্লাই সাইডে যদি কেউ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ না করতে পারে, কোনো জেনারেটর যদি ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণ না করতে পারে তাহলে বিপর্যয় ঘটে। এটা নিয়ন্ত্রণে গলদ আছে। কারণ আমরা তথ্য-উপাত্ত পাচ্ছি, দেখতে-বুঝতে পারছি যে আমাদের যত জেনারেটর উৎপাদনে আছে তার প্রায় ৩০ শতাংশই ‘ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টার’ বা ‘এনএলডিসি’র আওতায় নেই। এর অর্থ হলো ‘এনএলডিসি’র আওতায় আসতে বা যুক্ত হতে হলে যে টেকনিক্যাল ফিটনেস দরকার জেনারেটরগুলোর তা নেই। এখন গ্রিডের শর্ত পূরণ না করা সত্ত্বেও মোট জেনারেটরের ৩০ শতাংশ এতে যুক্ত থাকা নিশ্চিতভাবেই এমন বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করে।
দেশ রূপান্তর : দেশে জ্বালানির সংকট এবং জ্বালানিতে কৃচ্ছ্রসাধনের জন্য সরকার পরিকল্পিত লোডশেডিং অবলম্বনের কথা বলেছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে পূর্বঘোষিত সময়সীমা অনুসারে যখন যেখানে যতটা সময় লোডশেডিং হওয়ার কথা বাস্তবে তারচেয়ে বেশি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো সময়সীমাই মানা হচ্ছে না। লোডশেডিং আনপ্রেডিক্টেবল হয়ে গেছে। সমস্যাটা কোথায়? সরকার কেন ঘোষণা অনুসারে লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না?
এম শামসুল আলম : সরকারি নথিপত্রে যা আছে সে অনুযায়ী ধরে নিচ্ছি ২০ শতাংশের মতো লোডশেডিং হচ্ছে। মানে ২০ শতাংশের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানো হচ্ছে। যেখানে যতটা চাহিদা আছে, সময়ভেদে তার ২০ শতাংশ কম দিয়ে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করার কথা। এটাই পরিকল্পনা। এরকম একটা শিডিউল প্রতি ১৫ দিনের জন্য ‘ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টার’ বা ‘এনএলডিসি’ তৈরি করে। এজন্য পরবর্তী ১৫ দিনের প্রতিদিন কোন কোন সময়ে কোথা থেকে কতটা বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে তার একটা তালিকা তৈরি করে তারা। জেনারেশন সাইডে উৎপাদনের এই তালিকা অনুযায়ী তাদের সরবরাহ সমন্বয় করার কথা। একইভাবে ডিস্ট্রিবিউশন সাইডের কাছ থেকেও তারা চাহিদার একটা তালিকা তৈরি করে। ডিপিডিসি, ডেসকো, পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি, ওয়েস্টার্ন জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, নর্দান পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ইত্যাদির কাছ থেকে তারা বিভিন্ন জোনের বিদ্যুৎ চাহিদার এই তালিকা তৈরি করে। এভাবে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে সমন্বয়ের একটা শিডিউল তৈরি করা হয়। এটাই শিডিউলড লোডশেডিং। এখন সরকারের প্রতিনিধিরা দাবি করছেন আমাদের এই লোডশেডিং পরিকল্পনা সফল হয়েছে। কীভাবে সফল হয়েছে? তারা বলছেন, যে পরিমাণ জ্বালানি তেল তারা বাঁচাতে চেয়েছিল সেটা তারা বাঁচাতে পেরেছে। যে পরিমাণ ভর্তুকি তারা কমাতে চেয়েছিল সে পরিমাণ তারা ভর্তুকি কমাতে পেরেছে। সুতরাং পরিকল্পিত লোডশেডিং বাস্তবায়িত হয়েছে বলে সরকার দাবি করছে।
কিন্তু আমরা বলছি, পরিকল্পিত লোডশেডিং ফেইল করেছে। এই পরিকল্পনা কার্যকর হয়নি। কারণ আমরা দেখছি পরিকল্পনা অনুসারে যখন যে জেনারেটরের যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করার কথা সে পরিমাণ তা উৎপাদন করছে না। কিন্তু কেন তারা লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে না বা করতে পারছে না তার কোনো জবাবদিহি নেই। যা তারা পারবে না বা করবে না সেরকম একটা মনগড়া তথ্য তারা দেয়। অন্যদিকে, যে যে জোনে চাহিদার বিষয়ে যে পরিমাণ লোডের কথা তারা বলেছিল, সেটাও সঠিক তথ্য নয়। তারা প্রকৃত চাহিদার কথা বলেনি। এভাবে দুই ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তি রয়ে গেছে।
এরপর আসা যাক, যেভাবে লোডশেডিং করতে চাওয়া হয়েছিল, ঘাটতিটা যেভাবে সমন্বয় করতে চাওয়া হয়েছিল সেটা হচ্ছে কি না। দেখা যাচ্ছে যে পরিমাণ চাওয়া হয়েছিল সেটা পাওয়ারও কোনো নিশ্চয়তা নেই, আবার যতটা সময় লোডশেডিং হবে বলে বলা হয়েছিল সেই সময়েরও কোনো নিশ্চয়তা নেই। এর অর্থ হচ্ছে পুরো বিষয়টাই র্যান্ডম হয়ে গেল। অর্থাৎ এমন লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা থাকা আর না-থাকার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকল না। ঢাকা শহরে তাও বিষয়টা কিছুটা সহনীয় ছিল। কিন্তু গ্রামে-গঞ্জে অবস্থাটা খুবই খারাপ। অর্থাৎ লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা আর তার পরিণতি যা জনগণ ভোগ করছে এই দুইয়ের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য একেবারেই নেই। এই কারণে আমরা বলছি লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
এখন বিদ্যুৎ বিভাগের উচিত ছিল এই বিষয়ে একটা স্টাডি করা। যা থেকে বেরিয়ে আসত জেনারেশন এবং ডিস্ট্রিবিউশন সাইডে কোথায় কী কী সমস্যা রয়েছে। কিন্তু তারা সেটা করেনি। কারণ তাদের কোনো জবাবদিহির দায় নেই।
দেশ রূপান্তর : এই যে জবাবদিহির অভাব। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের মধ্যে ভারসাম্য থাকার বিষয়ে জবাবদিহি। জাতীয় গ্রিড ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার বিষয়ে জবাবদিহি। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে না পারার বিষয়ে জবাবদিহি। এসব ক্ষেত্রে মূল সমস্যাটা কোথায় বলে মনে করছেন?
এম শামসুল আলম : বিদ্যুৎ ও জ্বালানির যতগুলো কোম্পানি সবগুলোই তো সরকারি মালিকানাধীন। প্রতিটা কোম্পানির পরিচালনা বোর্ড আছে। সেসব বোর্ডের সভাপতি বিদ্যুৎ বিভাগের ক্ষেত্রে সচিব, না হয় অতিরিক্ত সচিব। আবার সঞ্চালন কোম্পানি বা ‘পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ’ বা ‘পিজিসিবি’র চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব স্বয়ং। এখন তিনি যদি জাতীয় গ্রিডের মতো একটা স্পর্শকাতর ব্যবস্থাপনার বিষয়ে বুঝতেন, এ বিষয়ে যদি তিনি অজ্ঞ না হতেন তাহলে কি তিনি এসব ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতেন না? জবাবদিহি নিশ্চিত করতেন না? অথচ, কেবল জাতীয় গ্রিডের বিপর্যয়ই নয়, একটা পরিকল্পিত ও শিডিউলড লোডশেডিংয়ের ব্যবস্থাপনা কার্যকর করার মতো সক্ষমতাই নেই আমাদের বিদ্যুৎ বিভাগের।
এখন মুশকিল হলো, মুখ্য সচিবের কাছে কে জবাবদিহি চাইবেন? আবার অন্য কোম্পানিগুলো যারা পরিচালনা করছেন তারাও সচিব বা অতিরিক্ত সচিব, তাদের কাছেই বা কে জবাবদিহি চাইবেন? আর সব কোম্পানির পরিচালকরা যে পিজিসিবি’র কাছে জবাবদিহি চাইবেন সেটার সমস্যা হলো, এরা তো মুখ্য সচিব, সচিব বা অতিরিক্ত সচিবের অধস্তন কর্মকর্তা। আবার আমরা শুনেছি পিজিসিবি’র চেয়ারম্যান এখনো বিদেশে থেকেই এই পদে রয়েছেন। প্রশ্ন হলো সরকারের কোম্পানিগুলো সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দিয়ে পরিচালনা করা হলেও তাদের কারোরই কোথাও কোনো জবাবদিহি নেই। একটা জবাবদিহিহীন ব্যবস্থার মধ্যেই গোটা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সব স্তরে নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলা-কারিগরি সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে ব্যক্তি পর্যায়ের ভোক্তা থেকে শুরু করে সব স্তরের সব ভোক্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী লাভবান হচ্ছে। এটাই সামগ্রিকভাবে বিদ্যুৎ খাতের নৈরাজ্যের চিত্র।
দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
এম শামসুল আলম : আপনাকে এবং দেশ রূপান্তরকেও ধন্যবাদ।
