পাঠ প্রতিক্রিয়া

দুই বড় লেখকের হৃদয়গ্রাহী আলাপ

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৩, ১১:৪২ পিএম

নেরুদা বললেন, অচিরেই তুমি বিখ্যাত হতে চলেছ মারিও বার্গাস যোসা এবং বলে দিচ্ছি, কী কী থাকছে তোমার জন্য। তুমি যত আক্রান্ত হবে, তত বিখ্যাত হবে। প্রত্যেকটি প্রশংসার জন্য থাকবে দুই রকম ফলাফল। আমার নিজের বুক অপমান, পাষ-তা আর কুখ্যাতিতে ভরা। এসব সহ্য করা এক লোক আমি। কেউ আমাকে ছাড়েনি। চোর, বদমাশ, বিশ্বাসঘাতক, ঠগ, ব্যাভিচারী এক কথায় সবই। যদি তুমি বিখ্যাত হও এসবের মধ্য দিয়ে তোমাকে যেতে হবে। যোসা এক সাক্ষাৎকারে এ কথা উল্লেখ করেন মায়াময়ভাবে। বললেন, কেবল আমার বুক নয়, পরিচিতজনদের অপমানপূর্ণ লেখাজোখায় আমার বেশ কিছু সুটকেস ভর্তি হয়ে আছে।

মারিও বার্গাস যোসা বিশ্ব সাহিত্যের এক অনন্য নাম। কিন্তু তিনি নিঃসঙ্কোচে ঋণ স্বীকার করেছেন, বিশ্ব সাহিত্যের আরেক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখক হোর্হে লুই বোর্হেসের কাছে। যোসাকে মুগ্ধ করে রেখেছিলেন তিনি। বোর্হেসের প্রতি তার এই মুগ্ধতা এক অন্যমাত্রায় উপনীত হয়। এ সম্পর্কে যোসা নিজেই বলেছেন ‘ইটস আ সিনফুল প্যাশন’। বোর্হেস তিনি বারবার পাঠ করেন। কোনোবারই তিনি হতাশ হন না। যোসা বলেন, প্রত্যেকবার নতুন পাঠ তাকে উদ্দীপিত ও আনন্দিত করে। যে বোর্হেস তাকে এড়িয়ে চলতেন, সেই বোর্হেসের প্রতি তার মুগ্ধতা কখনো কমেনি বরং বেড়েছে। বোর্হেস তাকে প্রতিবারই নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে দিয়েছেন। যোসার ভাষায় : পৃথিবীর যে সৌন্দর্য ও মনন তিনি তৈরি করেছেন, তা আমার নিজের সীমাবদ্ধতাকে আবিষ্কারে সাহায্য করেছে। এমনকি তার মুখ ফিরিয়ে থাকাও আমার মুগ্ধতা একবিন্দু কমায়নি। বিশ বছরের মধ্যে বোর্হেসের দুটো সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তিনি। তেত্রিশ বছর বয়সে মারিও প্রথম দেখেছিলেন বোর্হেসকে। প্যারিসে। এ সময় বোর্হেসের একটি সাক্ষাৎকার নেয়ার সুযোগ পান, দীর্ঘ কথোপকথন। এ সঙ্গে তিনি দেখেছেন, প্যারিসে বোর্হেসের চোখ ধাঁধানো বিজয়।

বহুমাত্রিক লেখক বোর্হেস খ্যাত তার ছোটগল্পের জন্য। সাহিত্যজীবনে একাধারে কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও সাহিত্য সমালোচনাও লিখেছেন তিনি। অনুবাদক হিসেবেও করেছেন অসাধারণ সব কাজ। তার অনন্য সাহিত্যকর্ম অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে গার্সিয়া মার্কেজ, মিশেল ফুকো এবং মারিও বার্গাস যোসার মতো পরবর্তী প্রজন্মের বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিকদের।

হোর্হে লুইস বোর্হেসের প্রথম সাক্ষাৎকার নেয়ার সময়কাল ১৯৬৩ সাল। তার ব্যক্তিগত ভা-ার থেকে লেখাটি উদ্ধার করে যোসার ওয়েবসাইটে ‘অপ্রকাশিত ও বিরল বিভাগ’-এ প্রকাশিত হয়।

সাক্ষাৎকারে বার্লিনে অনুষ্ঠিত জার্মান ও লাতিন আমেরিকান লেখকদের একটি সম্মেলনের অনুভূতি প্রকাশ করেন বোর্হেস। সম্মেলন তাকে বিষণœ ও বিস্মিত করেছিল। সেখানে তিনি দেখেছেন সাহিত্যিকরা সাহিত্যে কম, রাজনীতি নিয়ে আলাপ করছেন বেশি। ফ্রান্সে বোর্হেসের অভাবনীয় পাঠক ছিল। বেশ কয়েকটি পত্রিকা তার কাজ সম্পর্কে বিশেষ সংখ্যা করে। তার বক্তৃতা শোনার জন্য যারা সভাস্থলে প্রবেশ করতে পারেননি তাদের জন্য বাইরে সাউন্ডবক্স স্থাপন করা হয়েছিল। এটা তাকে নিজের সম্পর্কে বিস্ময়কর অনুভূতি দিয়েছে বলে যোসার কাছে বলেছেন।

যোসা তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, এটি নির্জন দ্বীপে যদি পাঁচটি বই নিয়ে যেতে হয় তাহলে কী কী নেবেন? মনে হয় গিবনের ‘হিস্টরি অব ডিক্লাইন অ্যান্ড ফল অব রোমান এম্পায়ার’ সঙ্গে নেব। মনে হয় না কোনো উপন্যাস নিয়ে যাব, বরং ইতিহাসের একটা বই নিয়ে যাব। ধরা যাক, এটা হবে দুই খন্ডের একটা সংস্করণ। এরপর আমি নিতে চাই অন্য আরেকটা বই, যেটা আমি পুরোপুরি বুঝিনি, অতএব বারবার পড়ে বোঝার জন্য নিয়ে যাব রাসেলের ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল ফিলোসফি’; বা আঁরি গোইঙ্কায়ের কোনো বই। এটাও আমার নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা। তিন খন্ড হলো। এরপর চোখ বুজে এনসাইক্লোপিডিয়ার যে কোনো একটা খন্ড। ওর মধ্যে অনেক লেখা পাওয়া যাবে, তবে সত্যিকারের এনসাইক্লোপিডিয়া নয়। কারণ সত্যিকারের এনসাইক্লোপিডিয়াগুলো পরামর্শমূলক বই, আমি বরং ১৯১০ বা ১১ সালের দিকে প্রকাশিত এনসাইক্লোপিডিয়া চাই, ব্রোখাস মেয়ারের কোনো খ- বা এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার কোনো খ- অর্থাৎ এনসাইক্লোপিডিয়াগুলো তখনো পর্যন্ত ছিল পাঠ করার মতো বই। তো চারটা বই পেলাম। এরপর  শেষটার ক্ষেত্রে একটা চাতুরী করা যাক, এমন একটা বই নিয়ে যাব, যেটা নিজেই একটা গ্রন্থাগার অর্থাৎ আমি বাইবেল নিয়ে যাব। এবার কবিতা প্রসঙ্গ, যেহেতু এই তালিকার মধ্যে এটা অনুপস্থিত; অতএব, এর দায়িত্ব আমি নিজের ওপর চাপিয়ে দেব। সুতরাং কবিতা পড়ার দরকার হবে না। তা ছাড়া আমার স্মৃতিভা-ার কবিতা দ্বারা এতটাই সমৃদ্ধ যে, মনে হয় কবিতার বইয়ের আর দরকার পড়বে না। আমি নিজে নানা ধরনের সাহিত্যের একটা সংকলনের মতো। যে আমি নিজের জীবনের ঘটনাবলি স্মরণ করার ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য নই, সে-ই আমি অসংখ্য কবিতা একঘেয়েভাবে বলতে পারব লাতিন, স্পানঞল, ইংরেজি, প্রাচীন ইংরেজি, ফরাসি, ইতালীয়, পর্তুগিজ ভাষায়।’ এ রকম অজস্র হৃদয়গ্রাহী কথোপকথন রয়েছে আলাপ পরস্পরে। রাজু আলাউদ্দীন অসম্ভব পরিশ্রমী একজন লেখক। আমি চেষ্টা করি তার সব লেখাই মোটামুটি পড়ার জন্য। তবে বিষয়গত আগ্রহের জায়গা থেকেই রাজু আলাউদ্দীনের বইটি সংগ্রহ করা। যাদের বোর্হেস এবং যোসা সম্পর্কে আগ্রহ আছে, তারা নির্দ্বিধায় বইটি সংগ্রহ করতে পারেন। পাঠক সমাবেশের সমাবেশ প্রকাশনা এটি। বইটির বিক্রয়মূল্য পাঠক সমাবেশের অন্যান্য বইয়ের মতোই বেশি।

আজকের লেখকরা যখন কে মহান আর কে কালোত্তীর্ণ, আর কে ছোট আর কে তুচ্ছ এসব বাগ-সংলাপে মত্ত সে সময় বইমেলা-২০২৩-এ প্রকাশ হলো এই অনন্য সাক্ষাৎকার গ্রন্থ। অগ্রজ লেখক সম্পর্কে একজন অনুজ লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি জানার এক অনন্য সুযোগ এই ছোট্ট বইটি। আমাদের সময়ে অশ্রাব্য আলাপে পরস্পর লেখকরা কিন্তু অনেক সময়ক্ষেপণ করেন। পরস্পর পরস্পরকে অতিক্রম করার প্রচেষ্টার, এসব কথা চালাচালি যে পাঠক মনকে আহত করে, তা হয়তো তারা বুঝতে চান না। সাধারণের মনে প্রশ্ন জাগে শিল্পজনরা কি মহৎ আর আলোকময় কিছু আলাপ করতে জানে না! অনুজ লেখকরা কি অগ্রজদের ভালোবাসতে জানে না!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত