কফি কিংবা স্যারের গল্প

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৩, ১০:৫৩ পিএম

মদিনা জাহান রিমি শ্রাবণ মাসের আকাশে বিভিন্ন রঙের মেঘ। বৃষ্টি নামাবে কি নামাবে না এই নিয়ে মেঘগুলো জুম মিটিং করছে। এরকম একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে আনিসের ঘুম ভেঙে গেল। সে প্রায়ই ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে এবং বেশির ভাগগুলোই এমন যে, সে বিপদে পড়ে চিৎকার করছে কিন্তু তার কণ্ঠস্বর কেউ শুনতে পাচ্ছে না। সেই তুলনায় মেঘের জুম মিটিং করা কিছুই না। ফ্রেশ হয়ে সে তাড়াহুড়ো করে কিচেনে ঢুকল কফি বানাতে। তার হাউজমেট শামীম একটা চুলা খালি করে দিল। আনিসের মধ্যে কুকুর স্বভাব আছে প্রবলভাবে। এই স্বভাবের কারণে অল্পতেই সে কৃতজ্ঞতায় অস্থির হয়ে যায়। সে হাউজমেটের ওপর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। 

কদিন হয়ে গেল, চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে আনিস থাকছে চাকরি সূত্রে। ওর অফিস মুরাদপুর, যেতে ৩০ মিনিটের মতো সময় লাগে। কিন্তু অফিস যাওয়া-আসার ক্লান্তিটাও, ওর এখানে মধুর লাগছে। ঢাকার মতো পেরেশানির ছাপ নেই এই শহরের কারও চেহারায়। আনিস নিজেও সুখী মানুষ, তার প্রধান এবং একমাত্র দুশ্চিন্তা, ‘জীবনে স্থির হতে হবে’। সে তার জীবনটা সাপলুডু খেলার মতো করে ফেলেছে। সারাক্ষণ উত্থান-পতন চলছে। এখন সমতলে তখন পাহাড়ে, কখনো উত্তরে কখনো দক্ষিণে, এই ঢাকা এই চট্টগ্রাম! ওর একটা ‘শান্তা’ নামের প্রেমিকা ছিল। এরকম অশান্ত জীবনযাপন দেখে ঐ মেয়েও ভেগে গেছে। সব মেয়ে তো আর নিজে প্রতিষ্ঠিত না। অধিকাংশ মেয়ে পরগাছা হয়ে বেঁচে থাকে। কখনো বাবা ভাত খাওয়ায়, কখনো স্বামী ভাত খাওয়ায়। এজন্য আনিসের মতো প্রেমিক দিয়ে ওদের চলে না। যদিও সব মেয়েরই পেশাগত স্থানেই প্রতিষ্ঠা পেতে হবে এরকম কোনো কঠিন থিওরি নেই। পরিবার সামলে রাখার দায়িত্ব পালন করার জন্যও তো কাউকে লাগবে!   

আনিসের জীবন আগাগোড়া যন্ত্রণা জর্জরিত। আজ আনিসের জীবনে নতুন যন্ত্রণা এসেছে, সেই উপলক্ষে সে হাটহাজারী থানায় বসে আছে। পুলিশ অফিসার চা খেতে খেতে বললেন -যে ব্যক্তি ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করল, সে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আচরণ করেছে আপনার সঙ্গে এটা কিন্তু অবিশ্বাস্য!

-আমি প্রতিদিনের মতো সকালে উঠে এক কাপ কফি আর ওমলেট করতে কিচেনে ঢুকি, শামীমও সে সময় চা-নাস্তা তৈরি করে নিজের জন্য। এরপরে ও ওর ঘরে নাস্তা করে আমি অফিসের জন্য বেরিয়ে পড়ি। ‘শুভ সকাল’ ছাড়া আমাদের মধ্যে সাধারণত কোনো কথা হয় না। 

পুলিশের লোকজন দীর্ঘদিন খারাপ লোকদের সঙ্গে ডিল করতে করতে সাধারণভাবে আর কথা বলতে পারেন না। কেউ হয়তো অভিযোগ করতে গেলেন যে ‘মোবাইল ছিনতাই হয়ে গেছে’,  অফিসার এমনভাবে তাকাবে যেন ঐ মোবাইল ছিনতাইকারী লোকটা নিজে এবং নিজেই নিজের মোবাইল ছিনতাই করে এখন উনার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে! অফিসার ওরকম দৃষ্টিতে আনিসের দিকে তাকিয়ে বললেন -আপনি তো ঢাকায় ভালো প্রতিষ্ঠানেই কাজ করতেন, চাকরি ছেড়ে এখানে এলেন কেন। এখানে তো আপনার পরিবারের কেউও থাকে না? 

-চাকরি ছেড়ে যেকোনো খানেই যেতে পারতাম, এখানে আসার কারণ, চাকরির আবেদন করি এবং চাকরিটা হয়ে যায়। ঢাকায় তো আবেদনে চাকরি হয় না, ঢাকার চাকরিদাতারা খুবই অদ্ভুত। তারা ঠিক কাকে চাকরি দেয় কে জানে!

-আগের চাকরি ছাড়ার কারণ? 

-বস পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে, নতুন বস অদ্ভুত প্রজাতির প্রাণী। যেকোনো সুস্থ মানুষ তার সঙ্গে কাজ করলে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাবে। প্রতিটা মানুষের একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর কাজকর্ম থেকে চিরবিদায় নেওয়া উচিত। বাগানে বসে কফি খাওয়া আর আকাশ দেখা উচিত। নাহলে অসহায় কর্মচারীদের জন্য অত্যাচার। আফটার অল, মানুষ কাজ করে সুন্দর জীবনের আশায়।

-অত্যাচার, কী অত্যাচার করত?

-না না! অত্যাচার বলতে শারীরিক কোনো অত্যাচার-নির্যাতন না। ধরেন, একই কাজ পাঁচবার নিয়ে গেলে পাঁচবার ভিন্নরকম উপদেশ দেয়। কেউ তো কারও মস্তিষ্কে ঢুকে তার পছন্দ অনুলিপি করতে পারবে না। প্রত্যেককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া জরুরি। নাহলে তো একটা সামান্য কাজ শেষ হতে অহেতুক এই ডেস্ক ঐ ডেস্ক ছোটাছুটি করা লাগবে। অনেক কাজ করার একটা ভান ধরা লাগবে। অথচ একই পরিমাণ কাজ অন্যান্য অফিসে বসে আমারই বন্ধুরা দশ মিনিটে ডান করে। তাহলে এটা তখন এক ধরনের মানসিক...

অফিসার হাত ইশারায় থামাল। বলল

- আপনি তো অতিরিক্ত কথা বলেন, আমি আপনার বস হলে তো আরও অসুবিধা হতো, আমার বেশি কথা বলা পছন্দ না। যতটুকু প্রশ্ন ততটুকু উত্তর। বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন শুনতে চাইনি আপনার কাছে!

অফিসারের বজ্রকণ্ঠ শুনে আনিস মুষড়ে পড়ল, মনে হলো তার আর স্থির হওয়া হলো না। ব্যথাহত হৃদয় নিয়ে ঢাকা ছেড়েছিল। ব্রেকআপটাও কাবু করে দিয়েছিল। ভিন্ন গ্রহে চলে যেতে পারলে আরাম পেত। অস্বাভাবিক পার্সোনালিটির অধিকারী কি আনিস নিজেই নাকি অন্যরা!

দীর্ঘক্ষণ থানার জীর্ণ চেয়ারে বসে থেকে আবার উঠে গেল অফিসারের কাছে। জিজ্ঞেস করল

-আমাকে কি এখানেই থাকতে হবে রাতে? 

-আপনি এখনো এখানে কী করছেন? 

-আপনি তো যেতে বলেননি আমাকে! 

-আপনি এক তো কথা বেশি বলেন, দুই মহানির্বোধ। আপনাকে কি এখন ইমেইলের মাধ্যমে জানাব যে আপনি চলে যেতে পারেন! আপনি থানার যেই চেয়ারে বসেছিলেন, সেখান থেকে যে কেউ যখন তখন যেতে পারে। যান যান, বাসায় চলে যান।

-বাসায় না, একবারে ঢাকায় ফিরে যাব।

-হ্যাঁ যেতে পারেন। তবে ফোন করা হবে, যেই নম্বর দিয়েছেন সেটা যেন অ্যাক্টিভ থাকে। 

আনিস কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করল, বাতিঘর থেকে কয়টা চমৎকার থ্রিলার বই কিনল। তারপর তল্পিতল্পা নিয়ে ঢাকায় ফেরত এলো। ফিরে এসে বুঝতে পারল যে শহরে সারা জীবন উদ্বাস্তুর মতো থেকেছে সেই শহরটার প্রতি তার অপরিসীম মায়া তৈরি হয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়া প্রিয় বসের সামনে পা ধরে বসে পড়ল। এছাড়া উপায় কি! বস

-পাগল নিয়ে মহাযন্ত্রণা! এক দৌড়ে গিয়ে সিভির প্রিন্ট আউট নিয়ে এসো। পা ছাড়ো গাধা ছেলে। 

তিনি আরও কিছু বলবেন সে সময় দেখলেন আনিসের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। সে মাথা নিচু করে রেখেছে। বললেন

-মাথা নিচু করে অশ্রু বর্ষণের মতো কিছু নেই। তুমি এসে পা ধরে বসে আছো বলে নিয়োগপত্র পাচ্ছ, এরকমও না ব্যাপারটা। তুমি ভালো কর্মী, অসম্ভব বুদ্ধিমান। এখন ভাগো। 

-অথচ নতুন বসকে গালি দেওয়ায় চাকরি চলে গেছিল আপনি তো জানেন!

-হ্যাঁ, তুমি নাকি ‘চুপ থাক টাকলা, তুই কি ফায়ার করবি আমিই করব না তোর বালের চাকরি’ এরকম বলেছিলা, হা হা হা! ওয়ান্ডারফুল।

-আপনি হাসছেন? ওয়ান্ডারফুল বলছেন! আপনার সঙ্গে যদি কখনো এরকম আচরণ করে ফেলি?

-আমার ঐ আত্মবিশ্বাস আছে, তুমি, তুমি কেন কেউই আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলবে না।  

তিনি মৃদু হাসলেন এবং আনিসের হন্তদন্ত হয়ে কাগজপত্র নিয়ে ছোটাছুটি দেখছেন। পরবর্তী কয়েক বছর আনিসের জীবনে এই ব্যক্তি আর সাপলুডু খেলা আসতে দেননি, আনিস স্থির হয়েছে। আনিস মনে মনে বারবার বলেছে, আলহামদুলিল্লাহ! পৃথিবীর সব আলহামদুলিল্লাহর চেয়ে, একটা মানুষ যখন জীবনঘনিষ্ঠ পথে থিতু হয় সেই ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বিশেষ। প্রায় বারো বছর পর প্রিয় স্যারের সঙ্গে একদিন কফি খেতে খেতে আনিস বলল

-স্যার আপনার কাছ থেকে কেয়ারফ্রি স্বভাব ছাড়াও আরও কিছু অনুকরণ করেছি।

-সর্বনাশ! আর কী কী অনুকরণ করেছ?

-জুনিয়রকে মোটিভেট করা। জুনিয়রকে তার ছোট ছোট ইন্টারেস্টিং আইডিয়ার জন্য এমনভাবে ক্রেডিট দেওয়া যেন সে বিশ্বজয় করে ফেলেছে। এছাড়া, আপনি কাউকে পাবলিকলি উঁচু গলায় শাসন করেন না, কফি খেতে খেতে শাসন করেন। এবার বলেন তো স্যার, আজকের মূল এজেন্ডা কি আমার সঙ্গে কফি খাওয়ার? হা হা হা! 

আনিসের প্রিয় বস শব্দ করে হাসলেন। স্বাভাবিক গলায় বললেন

-চট্টগ্রামে যে ছেলেটি মারা গিয়েছিল তাকে তুমি কতদিন চিনতে?

-ব্যাপারটা আপনাকে কবে বললাম?

-তুমি বলোনি। তোমার ফোন নম্বর বন্ধ পেয়ে তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে পুলিশ আমাকে কল দিয়েছিল। তারা নাকি এত বছর পর ঐ ইনভেস্টিগেশন আবার করছে। এবং বলল, ছেলেটি তোমার পূর্বপরিচিত। ছেলেটি যে তোমার পূর্বপরিচিত সেটা নাকি সে সময় তুমি গোপন করেছিলে! 

আনিস চুপ করে থাকে, সে বলে না যে শামীম অনেক গুছানো জীবনযাপন করে এবং ও শান্তার ‘জাস্ট ফ্রেন্ড’ ছিল। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত